লেখা:
ড. মশিউর রহমান
বাংলাদেশের মাটি থেকে উঠে এসে পৃথিবীর অন্যতম উন্নত গবেষণা-ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করা সহজ নয়। তবু অধ্যবসায়, কৌতূহল আর শেখার আগ্রহ থাকলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে—ড. কাজী হোসেনের জীবনপথ তারই উদাহরণ। বর্তমানে তিনি কানাডার আলবার্টা সরকারের অধীনে সিনিয়র রিসোর্স অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত। বন ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক সম্পদ পরিকল্পনা, ডেটা বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণে তার কাজ সরাসরি যুক্ত। গবেষক হিসেবে তার কাজ শুধু কাঠ উৎপাদনের হিসাব নয়; বরং জীববৈচিত্র্য, ইকোসিস্টেম, জলসম্পদ ও মাছের আবাসস্থল সংরক্ষণের মতো বহুস্তরীয় লক্ষ্যকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেয়।
শিকড় থেকে যাত্রা: অনুপ্রেরণার শুরু
ড. কাজী হোসেনের শিক্ষাজীবনের শুরু বাংলাদেশেই। শহরে বেড়ে ওঠা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কৃষিবিদ্যা ও বনবিজ্ঞানের মতো বিষয় তার কাছে প্রথমে খুব আকর্ষণীয় ছিল না। কিন্তু দেশের আর্থ–সামাজিক বাস্তবতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পরিবারের পরামর্শ তাকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে উৎসাহিত করে। পরবর্তীতে নতুন একটি বিষয় হিসেবে অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি—অর্থাৎ কৃষি ও বন ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ধারণা—তার সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। সীমিত ভূমিতে কৃষি ও বনকে আলাদা আলাদা না দেখে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থাপনার এই ধারণা বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে টেকসই উন্নয়নের একটি বাস্তবসম্মত পথ দেখায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শালবনের মাঠভ্রমণ, বনভূমির বাস্তব চিত্র কাছ থেকে দেখা—এসব অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, বনবিজ্ঞান কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়; এটি প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা: সাহসী সিদ্ধান্ত ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সাহসী, কিন্তু সহজ নয়। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত কানাডার একটি ফরেস্ট্রি প্রোগ্রাম তার জন্য পথ খুলে দেয়। নতুন দেশে এসে প্রথম ধাক্কা ছিল পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক। তীব্র শীত, নতুন ভাষা ও শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া ছিল কঠিন। তবু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে শেখেন, বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতার চেয়ে ধারণাভিত্তিক শেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন করা, মতভিন্নতা প্রকাশ করা এবং শিক্ষকের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক—এই সংস্কৃতি তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলে।
নিজের শেখার সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিনি খোলামেলা কথা বলেন। মুখস্থ করে শেখা তার জন্য কঠিন ছিল; বরং যুক্তি দিয়ে বুঝে নেওয়াই ছিল তার শক্তি। এই উপলব্ধি তাকে গবেষণার পথে আরও দৃঢ় করে।
ডেটা ও সিদ্ধান্ত: আধুনিক বন ব্যবস্থাপনার ভিত্তি
ড. কাজী হোসেনের গবেষণা ও পেশাগত কাজের কেন্দ্রে রয়েছে ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তার মতে, অভিজ্ঞতা বা অনুমানের ওপর নির্ভর করে বড় সিদ্ধান্ত নিলে ঝুঁকি বাড়ে। বন ব্যবস্থাপনায় কোন এলাকায় কত গাছ আছে, কীভাবে বন পুনর্জন্ম হচ্ছে, কোথায় জীববৈচিত্র্যের ঝুঁকি—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে নির্ভরযোগ্য তথ্য দরকার। এই তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সব জায়গায় সরাসরি মাপজোখ সম্ভব না হলে নমুনাভিত্তিক (স্যাম্পলিং) পদ্ধতিতে তথ্য নিয়ে তার অনিশ্চয়তা ও ত্রুটির সীমা নির্ধারণ করা হয়। এতে নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারেন কোন সিদ্ধান্ত কতটা নির্ভরযোগ্য।
প্রযুক্তির ব্যবহার: রিমোট সেন্সিং ও মেশিন লার্নিং
আধুনিক বন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। উপগ্রহচিত্র, ড্রোন ও লাইডার প্রযুক্তি দিয়ে বনভূমির উচ্চতা, ঘনত্ব ও গাছের প্রজাতির ধারণা পাওয়া যায়। এগুলোকে বলা হয় রিমোট সেন্সিং—যেখানে দূর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই বিপুল ডেটা বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হচ্ছে মেশিন লার্নিং। যেমন, ‘র্যান্ডম ফরেস্ট’ বা ‘সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন’ নামের অ্যালগরিদম দিয়ে বনভূমির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুমান করা হয়। এতে দ্রুত বড় এলাকার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়, যদিও সরাসরি মাঠপর্যায়ের তথ্যের মতো নির্ভুল নয়। কোন তথ্য কোন কাজে ব্যবহারযোগ্য—সেটি নির্ধারণে ঝুঁকি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রযুক্তি শুধু কাঠ উৎপাদনের জন্য নয়; বরং বনভূমির ভেতরের ক্ষুদ্র জলপ্রবাহ, মাছের আবাসস্থল বা সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম শনাক্ত করতেও কাজে লাগছে। ফলে বন ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি আরও শক্তিশালীভাবে যুক্ত হচ্ছে।
কানাডার কর্মসংস্কৃতি: সহযোগিতা ও জবাবদিহি
কানাডার সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে সহযোগিতামূলক কর্মসংস্কৃতির মূল্য। এখানে সিনিয়র–জুনিয়র সম্পর্ক কর্তৃত্বনির্ভর নয়; বরং মতামত বিনিময়ের জায়গা আছে। জুনিয়র কর্মী বসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারে, আবার বসও ভুল স্বীকার করেন। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আবেগ নয়, কাজের গুণগত মানই মুখ্য। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়—কে কোন দায়িত্বে কী ফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন হয়। এই পরিবেশ কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে।
টেকসই বন ব্যবস্থাপনা: ভবিষ্যতের পথে
ড. কাজী হোসেনের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টেকসই বন ব্যবস্থাপনা। বনকে কেবল কাঠের উৎস হিসেবে না দেখে একটি জীবন্ত ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখা জরুরি। কানাডায় বনভূমির বড় অংশ সরকারি মালিকানাধীন; কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে সেখানে কাজ করে। এই পরিকল্পনায় জীববিজ্ঞানী, জলসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও গ্রোথ-অ্যান্ড-ইল্ড মডেলিংয়ের বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করেন। আগুনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বন কীভাবে পুনর্জন্ম নেয়—তা বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ও পরিসংখ্যানভিত্তিক মডেল ব্যবহার করা হয়। এতে ভবিষ্যতে কতটুকু কাঠ পাওয়া যাবে বা কোথায় সংরক্ষণ বাড়ানো দরকার—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
তরুণদের জন্য বার্তা
ড. কাজী হোসেনের পথচলা তরুণদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—শেখার আগ্রহ থাকলে সীমাবদ্ধতা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। ডেটা বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান, প্রযুক্তি—এই দক্ষতাগুলো ভবিষ্যতের গবেষণায় অপরিহার্য। একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রশ্ন করার সাহস ও ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, কেবল মুখস্থনির্ভর না হয়ে ধারণাভিত্তিক শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করা।
সাক্ষাৎকারটি ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থাপক ছিলেন বিজ্ঞানী অর্গ এর ভলেন্টিয়ার রনি ইসলাম এবং তাহসিনুর রাইয়ান।
ড. কাজী হোসেনের লিংকডইন: https://www.linkedin.com/in/kazi-hossain-70084252/
শেষ কথা
ড. কাজী হোসেনের জীবন ও কাজ প্রমাণ করে, বাংলাদেশ থেকে উঠে এসে বৈশ্বিক গবেষণার পরিসরে অবদান রাখা সম্ভব। তার পথচলা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি দেশের তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বন, ডেটা ও মানুষের কল্যাণকে একসঙ্গে ভাবার এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আগামী প্রজন্মের জন্যও এক মূল্যবান দিকনির্দেশনা।

Leave a comment