বাংলাদেশে শিশুর স্বাস্থ্য সমস্যা বলতে আমরা সাধারণত অপুষ্টি, ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ার কথা ভাবি। কিন্তু এর পেছনে এমন কিছু “নীরব সংক্রমণ” কাজ করে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে শরীরের ভেতরে থেকে নানা জটিলতার জন্ম দেয়। তেমনই একটি সংক্রমণ হলো এইচ.পাইলোরি Helicobacter pylori বা সংক্ষেপে H. pylori। ড. আবু খালেদের ভাষায়, “বাংলাদেশে জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু এইচ.পাইলোরি-তে আক্রান্ত হয়।” এই একটি তথ্যই আমাদের জনস্বাস্থ্যের বড় একটি দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে।
এইচ.পাইলোরি একটি ব্যাকটেরিয়া, যা সাধারণত পাকস্থলীতে বাসা বাঁধে। অনেকের ক্ষেত্রে এটি গ্যাস্ট্রিক, পেটে জ্বালাপোড়া বা আলসারের কারণ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই সংক্রমণকে শুধু ‘পেটের অসুখ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে থাকলে পাকস্থলীর ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়। এই প্রদাহ ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ড. আবু খালেদের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই সংক্রমণের সঙ্গে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা স্ট্রোকের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুখের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা অনুসন্ধান করা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন বোঝা যাচ্ছে, বহু দীর্ঘমেয়াদি রোগের মূল কারণ হিসেবে প্রদাহ একটি বড় ভূমিকা পালন করে। যেমন, দীর্ঘদিন ধরে শরীরের ভেতরে আগুন জ্বলতে থাকলে ধীরে ধীরে সেই আগুন আশপাশের কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়—ঠিক তেমনি ইনফ্লামেশন শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এইচ.পাইলোরি সংক্রমণের বিস্তারের পেছনে রয়েছে পরিষ্কার পানির অভাব, স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি এবং অল্প বয়স থেকেই দূষিত খাবার বা পানির সংস্পর্শে আসা। শিশুরা যখন অল্প বয়সেই এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়, তখন তা বছরের পর বছর শরীরে থেকে যায়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই সংক্রমণের হার ৮৫ শতাংশের বেশি হওয়ার তথ্যও ড. খালেদ উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, আমরা এমন একটি প্রজন্মের মুখোমুখি, যারা শৈশব থেকেই একটি দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ বহন করে বড় হচ্ছে।
এই সংক্রমণের আরেকটি গুরুতর প্রভাব হলো রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এইচ.পাইলোরি পাকস্থলীতে আয়রন শোষণে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে খাবার থেকে পর্যাপ্ত আয়রন পেলেও শরীর তা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না। ড. আবু খালেদ মনে করেন, যদি এই সংক্রমণ সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা করা যায়, তাহলে মায়েদের অ্যানিমিয়া কমানো সম্ভব। আশার কথা হলো—এইচ.পাইলোরি সংক্রমণ সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য।
তবে এই চিকিৎসার পথ সহজ নয়। অনেক সময় লক্ষণ না থাকায় মানুষ পরীক্ষা করাতেই আগ্রহী হয় না। আবার একবার অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স ঠিকভাবে সম্পন্ন না করলে ব্যাকটেরিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তাই ড. খালেদের মতে, এখানে দরকার জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ—স্কুলপর্যায় থেকে স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও খাবারের ব্যবস্থা, এবং প্রয়োজনে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করা।
ড. আবু খালেদের গবেষণা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে—শুধু উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা করব, নাকি নীরব সংক্রমণগুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে এগোব? উন্নত দেশগুলোতে এখন ধীরে ধীরে এই প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাপের মুখে, সেখানে শুরুতেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভবিষ্যতে হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের মতো ব্যয়বহুল রোগের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ড. আবু খালেদের এই কথাটি তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি একটি সতর্কবার্তা। শিশুকাল থেকেই যে সংক্রমণ শুরু হয়, তার প্রভাব পুরো জীবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই বাস্তবতা বুঝে যদি আমরা আগাম ব্যবস্থা নিতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সুস্থ ও শক্তিশালী করা সম্ভব।
ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment