কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাতথ্যপ্রযুক্তি

কেন ভবিষ্যতের সব ব্যবসার একটাই পথ—অটোমেশন, আর স্বাস্থ্যখাত কেন এখনো পিছিয়ে?

Share
Share

আজকের পৃথিবীতে কোনো ব্যবসা আর শুধু পণ্য বিক্রি বা সেবা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবসার মানে এখন ডেটা, গতি, নির্ভুলতা আর স্মার্ট সিদ্ধান্ত। এই চারটি শব্দের মাঝখানে যেটি কেন্দ্রে বসে আছে, সেটি হলো—অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। ব্যাংকিং থেকে শুরু করে ই–কমার্স, শিক্ষা থেকে শুরু করে লজিস্টিকস—প্রায় সব খাতেই অটোমেশন একপ্রকার বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। কারণ মানুষের হাতে সব কাজ থাকলে ভুল হয়, সময় লাগে, খরচ বাড়ে। আর সিস্টেম কাজ করলে, কাজ হয় দ্রুত, তথ্য থাকে সংরক্ষিত, সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।

কিন্তু এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও একটি খাত এখনো আশ্চর্যজনকভাবে পিছিয়ে—স্বাস্থ্যসেবা। যেখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন জড়িত, সেখানে তথ্য এখনো খাতায় লেখা হয়, রিপোর্ট হারিয়ে যায়, রোগীর ইতিহাস এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গেলে নতুন করে করতে হয়। যে সেক্টরটি সবচেয়ে বেশি ডেটা-নির্ভর হওয়া দরকার, সেই সেক্টরেই আজ সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা।

একটি স্টার্টআপ যদি আজ ই–কমার্স শুরু করে, তারা অটোমেটেড পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করবে, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালাবে, কাস্টমার সাপোর্টে চ্যাটবট বসাবে। কেউ আজ ম্যানুয়ালভাবে অর্ডার কপি করে রাখে না। অথচ একজন রোগীর প্রেসক্রিপশন, টেস্ট রিপোর্ট, ওষুধের হিসাব—এসব এখনো অনেক ক্ষেত্রে কাগজে লেখা হয়, আবার হারিয়ে যায়, আবার ভুল বোঝাবুঝি হয়।

স্বাস্থ্যখাতে অটোমেশন না থাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—মানুষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। একজন ডাক্তার ভালো না থাকলে সেবা কমে যায়, একজন নার্স ভুল করলে বিপদ হয়, একজন ডেটা অপারেটর ভুল ইনপুট দিলে গোটা রিপোর্ট অর্থহীন হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্যসেবা শুধু মানবিক হবার ক্ষেত্র নয়, এটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার নির্ভুলতা দাবি করে। এখানে ৯৯% ঠিক মানে ১% ভয়াবহ।

তাই এখন বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে—ডিজিটাল হেলথ, অটোমেটেড হাসপাতাল, এআই-ভিত্তিক রোগ নির্ণয়, ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, রিমোট মনিটরিং। এগুলো আর ভবিষ্যতের কল্পনা নয়—এগুলো বর্তমান বাস্তবতা। উন্নত দেশগুলোতে রোগীর রক্তচাপ মাপা হচ্ছে বাসায় বসেই, রিপোর্ট যাচ্ছে ক্লাউডে, ডাক্তার মোবাইলে দেখে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। প্রযুক্তি এখানে কোনো বিলাসিতা নয়—বরং জীবন বাঁচানোর হাতিয়ার।

এই পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে স্টার্টআপ কমিউনিটি। বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে চলে, কিন্তু স্টার্টআপ চলে দ্রুত। তারা সমস্যা দেখে সমাধান বানায়। স্বাস্থ্যখাতে সমস্যা যেমন বিশাল, এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় সুযোগ। যে স্টার্টআপ আজ হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অটোমেট করতে পারবে, বা রোগীর রিপোর্ট ডিজিটাল করতে পারবে, বা ডাক্তার–রোগীর যোগাযোগ সহজ করতে পারবে—সে আগামী দশকের ইউনিকর্ন হতে পারে।

কিন্তু শুধু অ্যাপ বানালেই হবে না। স্বাস্থ্যখাত মানে শুধু কোড নয়, আস্থা। এখানে ভুলের জায়গা নেই। ডেটা প্রাইভেসি মানতে হবে, মেডিকেল নিয়মকানুন বুঝতে হবে, ডাক্তারের ভাষা বুঝতে হবে। স্বাস্থ্যখাতের স্টার্টআপগুলোকে সাধারণ স্টার্টআপের চেয়েও দায়িত্বশীল হতে হয়।

একটি ব্যবসা যদি অটোমেট না হয়, সেটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে। আজকে যারা হিসাব খাতায় রাখে, কাল তারা বাজারে টিকতে পারবে না। আজ যারা কাগজে রিপোর্ট রাখে, কাল তারা রোগীর বিশ্বাস হারাবে। স্বাস্থ্যখাতও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং এখানে আরও দ্রুত পরিবর্তন দরকার, কারণ এখানে দাম দিয়ে কিনতে হয় জীবন।

অটোমেশন মানে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া নয়। অটোমেশন মানে মানুষকে ভুল থেকে মুক্ত করা। ডাক্তারের কাজ রোগ নির্ণয় আর সিদ্ধান্ত নেওয়া, ফাইল খোঁজা নয়। নার্সের কাজ রোগীর সেবা, ফর্ম ফিলআপ নয়। অটোমেশন ঠিক সেটাই করে—মানুষের কাঁধ থেকে যান্ত্রিক কাজ নামিয়ে এনে, মানবিক কাজের জায়গা করে দেয়।

এ কারণে আজ প্রশ্ন আর ‘অটোমেশন দরকার কি না’—না। প্রশ্ন হলো, কে আগে করবে, কে ভালো করবে, কে টিকবে। আর স্বাস্থ্যখাতের ক্ষেত্রে প্রশ্ন আরও গভীর—কে জীবন বাঁচাবে, আর কে পিছিয়ে পড়বে।

স্টার্টআপ কমিউনিটির জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ডাক হচ্ছে—স্বাস্থ্যখাতে যাওয়া। এই সেক্টর শুধু ব্যবসা নয়, এটি পরিবর্তনের জায়গা। এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে লাভ আর প্রভাব একসঙ্গে চলে। এখানে ব্যর্থ হলেও শেখা যায় অনেক কিছু, সফল হলে বদলে দেওয়া যায় হাজারো জীবন।

আগামী দিনের পৃথিবীতে ব্যবসা মানেই অটোমেশন। আর স্বাস্থ্যসেবায় অটোমেশন মানেই ভবিষ্যতের সুরক্ষা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—দর্শক হয়ে থাকব, না নির্মাতা হব?

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org