সম্পাদকীয়

গবেষণায় সহানুভূতি: ল্যাবকে বদলে দিতে পারে যে মানবিক নেতৃত্ব

Share
Share

ড. মশিউর রহমান

বিজ্ঞান ও গবেষণার জগৎকে আমরা সাধারণত যুক্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডেটা, আর নিরপেক্ষতা—এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা পরিবেশ অনেক বেশি জটিল। ল্যাবে দলগত কাজ, মেন্টর–শিক্ষার্থী সম্পর্ক, গ্রান্টের চাপ, প্রকাশনার উদ্বেগ, প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা—এসব মিলেই গবেষণা এখন মানবিক হিসেবে যতটা, বৈজ্ঞানিক হিসেবেও ততটাই। তাই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি দক্ষতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যেটি আমরা অতীতে খুব কমই গুরুত্ব দিতাম—সহানুভূতি

গবেষণা-ভিত্তিক নেতৃত্বে সহানুভূতি কখনোই দুর্বলতার প্রকাশ নয়। বরং নতুন গবেষণা বলছে, এটি ল্যাবের উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, মানসিক স্বাস্থ্য, এমনকি প্রকাশনার হার—সব কিছুর ওপরই দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞানীরা যেমন জ্ঞানের নতুন সীমানা আবিষ্কার করেন, তেমনি একটি স্বাস্থ্যকর বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সহানুভূতি অপরিহার্য।

বিষণ্ণতা, স্ট্রেস এবং বিজ্ঞানীদের মানসিক ক্লান্তি

আজকের দিনে গবেষকদের মানসিক চাপ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। Qualtrics-এর বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪২ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যে অবনতি অনুভব করছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশের স্ট্রেস বেড়েছে, ৫৭ শতাংশ বেশি উদ্বিগ্ন, আর অর্ধেকেরও বেশি মানসিকভাবে ক্লান্ত। এই বাস্তবতা গবেষণা জগতেও কম নয়—ল্যাবে ফান্ডিং নিয়ে অনিশ্চয়তা, প্রোজেক্টের ডেডলাইন, পরীক্ষার ব্যর্থতা, এবং “publish or perish” চাপ মানসিক ক্লান্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের জায়গার রূঢ়তা, নেতিবাচকতা বা অবজ্ঞা শুধু উৎপাদনশীলতাই কমায় না, বরং পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি ল্যাবের টক্সিক পরিবেশ তরুণ গবেষকদের আত্মবিশ্বাস, শিক্ষার আনন্দ এবং ভবিষ্যত গবেষণা-উদ্দীপনাকে নষ্ট করতে পারে।

সহানুভূতি ল্যাব-সংস্কৃতি বদলে দেয়

Catalyst-এর সাম্প্রতিক একটি গবেষণা জানাচ্ছে, যেসব কর্মী মনে করেন তাদের নেতারা সহানুভূতিশীল, তারা—

৬১ শতাংশ বেশি উদ্ভাবনী

৭৬ শতাংশ বেশি যুক্ত ও মনোযোগী

এবং ৮৬ শতাংশ বেশি সফলভাবে কাজ–জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম

ল্যাবের ভাষায় বললে—একজন সহানুভূতিশীল সুপারভাইজার থাকলে শিক্ষার্থীর গবেষণামূলক ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা বাড়ে, নতুন আইডিয়া তৈরি হয়, এবং টিম আরও সমন্বিতভাবে কাজ করে।

PhD সুপারভিশনে সহানুভূতির ভূমিকা

PhD যাত্রাকে কেউ কেউ ম্যারাথন বলেন, আবার কেউ বলেন পাহাড় টপকানোর মতো। এই দীর্ঘ যাত্রায় সহানুভূতিশীল সুপারভাইজার মানে—

ছাত্রছাত্রীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বোঝা,

চাপ মোকাবিলায় সাপোর্ট দেওয়া,

ব্যর্থ পরীক্ষাকে লজ্জার নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা,

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপদ একটি গবেষণা-পরিবেশ তৈরি করা।

একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশে শিক্ষার্থীরা ভুল করতে ভয় পায় না, প্রশ্ন করতে সংকোচ করে না, আর নিজের সীমা অতিক্রম করতে চেষ্টা করে।

সহানুভূতি কীভাবে গবেষণায় উদ্ভাবন তৈরি করে

উদ্ভাবন কখনও চাপের পরিবেশে জন্মায় না। এটি জন্মায় তখন, যখন একজন গবেষক আত্মবিশ্বাসের সাথে ঝুঁকি নিতে পারেন, ব্যর্থ হলেও ভেঙে পড়েন না, আর টিম তাকে সমর্থন করে। গবেষণা বলছে, সহানুভূতি দলগত সহযোগিতা বাড়ায় এবং “collaborative intelligence” শক্তিশালী করে। এই সমন্বিত বুদ্ধিমত্তাই আজকের বিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় শক্তি।

সহানুভূতি আসলে জন্মগত

Lund University-র গবেষণা বলছে, দুই বছরের শিশুরাও অন্যদের অনুভূতি আলাদা হতে পারে—এটি বুঝতে সক্ষম। মানুষের মস্তিষ্কে সহানুভূতির একটি জৈবিক ভিত্তি আছে। আর University of Virginia দেখিয়েছে, বন্ধুর কোনো হুমকি দেখলে মস্তিষ্ক সেইভাবেই প্রতিক্রিয়া করে, যেভাবে নিজের হুমকিতে করে। অর্থাৎ, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সহানুভূতিশীল।

যখন গবেষকরা এই মানবিক বৈশিষ্ট্যকে নেতৃত্বে যুক্ত করেন, তখন গবেষণা-পরিবেশ শুধু উৎপাদনশীলই হয় না—মানবিক, নিরাপদ এবং সৃজনশীল হয়।

সহানুভূতি মানে শুধু বোঝা নয়—কাজেও তা দেখানো

একজন গবেষণা-নেতা (PI, supervisor, senior scientist) সহানুভূতি দেখাতে পারেন—

শিক্ষার্থীর কথা সময় দিয়ে শোনা

তার চাপ বা সীমাবদ্ধতা বোঝার চেষ্টা করা

উপযুক্ত নির্দেশনা ও রিসোর্সে পৌঁছাতে সাহায্য করা

এবং নিজের কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য বজায় রেখে

বিজ্ঞানীরা সাধারণত বলেন—“People don’t remember what you said; they remember how you made them feel.”

একজন সহানুভূতিশীল গবেষণা-নেতা সেই অনুভূতির জায়গাটাই পরিবর্তন করেন।

পরিশেষ:

বিজ্ঞান মূলত মানুষের কাজ—মানুষই প্রশ্ন করে, পরীক্ষা চালায়, ব্যর্থ হয়, আবার উঠে দাঁড়ায়। তাই মানবিক অনুভূতি, বিশেষ করে সহানুভূতি, গবেষণা-সংস্কৃতিকে স্বাস্থ্যকর করে, গবেষককে আত্মবিশ্বাসী করে এবং ল্যাবকে আরও সৃজনশীল ও সহযোগিতামূলক করে তোলে।

সহানুভূতি নতুন দক্ষতা নয়। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক গবেষণা-পরিবেশে এটি একটি নতুন গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। ভবিষ্যতের বিজ্ঞান নেতৃত্ব গড়ে উঠবে সেই মানুষদের হাত ধরে, যারা মানুষকে বোঝে, শোনে এবং পাশে থাকে।

বিজ্ঞান ও গবেষণার জগৎকে আমরা সাধারণত যুক্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডেটা, আর নিরপেক্ষতা—এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা পরিবেশ অনেক বেশি জটিল। ল্যাবে দলগত কাজ, মেন্টর–শিক্ষার্থী সম্পর্ক, গ্রান্টের চাপ, প্রকাশনার উদ্বেগ, প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা—এসব মিলেই গবেষণা এখন মানবিক হিসেবে যতটা, বৈজ্ঞানিক হিসেবেও ততটাই। তাই নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি দক্ষতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যেটি আমরা অতীতে খুব কমই গুরুত্ব দিতাম—সহানুভূতি

গবেষণা-ভিত্তিক নেতৃত্বে সহানুভূতি কখনোই দুর্বলতার প্রকাশ নয়। বরং নতুন গবেষণা বলছে, এটি ল্যাবের উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, মানসিক স্বাস্থ্য, এমনকি প্রকাশনার হার—সব কিছুর ওপরই দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞানীরা যেমন জ্ঞানের নতুন সীমানা আবিষ্কার করেন, তেমনি একটি স্বাস্থ্যকর বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সহানুভূতি অপরিহার্য।

বিষণ্ণতা, স্ট্রেস এবং বিজ্ঞানীদের মানসিক ক্লান্তি

আজকের দিনে গবেষকদের মানসিক চাপ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। Qualtrics-এর বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪২ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যে অবনতি অনুভব করছেন। এর মধ্যে ৬৭ শতাংশের স্ট্রেস বেড়েছে, ৫৭ শতাংশ বেশি উদ্বিগ্ন, আর অর্ধেকেরও বেশি মানসিকভাবে ক্লান্ত। এই বাস্তবতা গবেষণা জগতেও কম নয়—ল্যাবে ফান্ডিং নিয়ে অনিশ্চয়তা, প্রোজেক্টের ডেডলাইন, পরীক্ষার ব্যর্থতা, এবং “publish or perish” চাপ মানসিক ক্লান্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের জায়গার রূঢ়তা, নেতিবাচকতা বা অবজ্ঞা শুধু উৎপাদনশীলতাই কমায় না, বরং পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি ল্যাবের টক্সিক পরিবেশ তরুণ গবেষকদের আত্মবিশ্বাস, শিক্ষার আনন্দ এবং ভবিষ্যত গবেষণা-উদ্দীপনাকে নষ্ট করতে পারে।

সহানুভূতি ল্যাব-সংস্কৃতি বদলে দেয়

Catalyst-এর সাম্প্রতিক একটি গবেষণা জানাচ্ছে, যেসব কর্মী মনে করেন তাদের নেতারা সহানুভূতিশীল, তারা—

৬১ শতাংশ বেশি উদ্ভাবনী

৭৬ শতাংশ বেশি যুক্ত ও মনোযোগী

এবং ৮৬ শতাংশ বেশি সফলভাবে কাজ–জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম

ল্যাবের ভাষায় বললে—একজন সহানুভূতিশীল সুপারভাইজার থাকলে শিক্ষার্থীর গবেষণামূলক ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা বাড়ে, নতুন আইডিয়া তৈরি হয়, এবং টিম আরও সমন্বিতভাবে কাজ করে।

PhD সুপারভিশনে সহানুভূতির ভূমিকা

PhD যাত্রাকে কেউ কেউ ম্যারাথন বলেন, আবার কেউ বলেন পাহাড় টপকানোর মতো। এই দীর্ঘ যাত্রায় সহানুভূতিশীল সুপারভাইজার মানে—

ছাত্রছাত্রীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বোঝা,

চাপ মোকাবিলায় সাপোর্ট দেওয়া,

ব্যর্থ পরীক্ষাকে লজ্জার নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা,

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপদ একটি গবেষণা-পরিবেশ তৈরি করা।

একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশে শিক্ষার্থীরা ভুল করতে ভয় পায় না, প্রশ্ন করতে সংকোচ করে না, আর নিজের সীমা অতিক্রম করতে চেষ্টা করে।

সহানুভূতি কীভাবে গবেষণায় উদ্ভাবন তৈরি করে

উদ্ভাবন কখনও চাপের পরিবেশে জন্মায় না। এটি জন্মায় তখন, যখন একজন গবেষক আত্মবিশ্বাসের সাথে ঝুঁকি নিতে পারেন, ব্যর্থ হলেও ভেঙে পড়েন না, আর টিম তাকে সমর্থন করে। গবেষণা বলছে, সহানুভূতি দলগত সহযোগিতা বাড়ায় এবং “collaborative intelligence” শক্তিশালী করে। এই সমন্বিত বুদ্ধিমত্তাই আজকের বিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় শক্তি।

সহানুভূতি আসলে জন্মগত

Lund University-র গবেষণা বলছে, দুই বছরের শিশুরাও অন্যদের অনুভূতি আলাদা হতে পারে—এটি বুঝতে সক্ষম। মানুষের মস্তিষ্কে সহানুভূতির একটি জৈবিক ভিত্তি আছে। আর University of Virginia দেখিয়েছে, বন্ধুর কোনো হুমকি দেখলে মস্তিষ্ক সেইভাবেই প্রতিক্রিয়া করে, যেভাবে নিজের হুমকিতে করে। অর্থাৎ, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সহানুভূতিশীল।

যখন গবেষকরা এই মানবিক বৈশিষ্ট্যকে নেতৃত্বে যুক্ত করেন, তখন গবেষণা-পরিবেশ শুধু উৎপাদনশীলই হয় না—মানবিক, নিরাপদ এবং সৃজনশীল হয়।

সহানুভূতি মানে শুধু বোঝা নয়—কাজেও তা দেখানো

একজন গবেষণা-নেতা (PI, supervisor, senior scientist) সহানুভূতি দেখাতে পারেন—

শিক্ষার্থীর কথা সময় দিয়ে শোনা

তার চাপ বা সীমাবদ্ধতা বোঝার চেষ্টা করা

উপযুক্ত নির্দেশনা ও রিসোর্সে পৌঁছাতে সাহায্য করা

এবং নিজের কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য বজায় রেখে

বিজ্ঞানীরা সাধারণত বলেন—“People don’t remember what you said; they remember how you made them feel.”

একজন সহানুভূতিশীল গবেষণা-নেতা সেই অনুভূতির জায়গাটাই পরিবর্তন করেন।

পরিশেষ:

বিজ্ঞান মূলত মানুষের কাজ—মানুষই প্রশ্ন করে, পরীক্ষা চালায়, ব্যর্থ হয়, আবার উঠে দাঁড়ায়। তাই মানবিক অনুভূতি, বিশেষ করে সহানুভূতি, গবেষণা-সংস্কৃতিকে স্বাস্থ্যকর করে, গবেষককে আত্মবিশ্বাসী করে এবং ল্যাবকে আরও সৃজনশীল ও সহযোগিতামূলক করে তোলে।

সহানুভূতি নতুন দক্ষতা নয়। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক গবেষণা-পরিবেশে এটি একটি নতুন গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। ভবিষ্যতের বিজ্ঞান নেতৃত্ব গড়ে উঠবে সেই মানুষদের হাত ধরে, যারা মানুষকে বোঝে, শোনে এবং পাশে থাকে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org