হলের ছাদে ঝুলে থাকা পুরোনো ফ্যানটা কাঁপতে কাঁপতে ঘুরছে। নিচে টেবিলের কোণে বসে থাকা একটি ছাত্রী তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে বহুক্ষণ। একটা এক্সেল ফাইল খোলা, হাজার হাজার সারি। প্রতিটি সারিতে একটি করে মানুষের গল্প, কিন্তু সে শুধু সংখ্যাই দেখতে পাচ্ছে। তার মাথায় প্রশ্ন—আমি সমাজ নিয়ে পড়ছি, এখানে এত কোড, এত ডেটা, এত হিসাব কেন? সমাজ তো অনুভূতি, সম্পর্ক, রাজনীতি, ক্ষুধা আর স্বপ্নের জগৎ। এটা কি এক্সেলের ঘরে বন্দী হতে পারে?
এই প্রশ্নই আজকের তরুণ গবেষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজা। সমাজ আর ডেটা, এই দুইয়ের মিলনে নতুন এক শাখা জন্ম নিচ্ছে—সোশ্যাল সায়েন্সে ডেটা সায়েন্সের প্রয়োগ। বাইরে থেকে দেখলে বিষয়টা প্রযুক্তির, ভেতর থেকে দেখলে এটি মানুষের। কারণ আজ মানুষের কণ্ঠস্বর ধরা পড়ে সার্ভে ফর্মে, মোবাইল ডেটায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে, অনলাইন কেনাকাটার রেকর্ডে। আমরা কথা বলছি না শুধু মুখে, আমরা প্রতিদিন কোটি কোটি তথ্যের মাধ্যমে নিজেদের চিহ্ন রেখে যাচ্ছি। প্রশ্ন হলো, এই চিহ্নগুলো কে পড়ছে, আর কীভাবে?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও গভীর। আমাদের উন্নয়ন মানেই কেবল রাস্তা বানানো নয়, আমাদের উন্নয়ন মানে মানুষের জীবন বদলানো। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে এখনো প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যরেখার কাছাকাছি বাস করে, আবার একই সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তদের ব্যয়হারে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই দুই চিত্র একসঙ্গে বোঝার জন্য কেবল সাক্ষাৎকার বা প্রশ্নপত্র যথেষ্ট নয়, দরকার বড় ডেটার বিশ্লেষণ। UNESCO দেখাচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামাজিক নীতিনির্ধারণে ডেটা ব্যবহার বাড়ালে কার্যকর সিদ্ধান্তের হার প্রায় ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হয়। সংখ্যাটা শুধু সংখ্যা নয়, এই সংখ্যার মানে, আরও সঠিক সিদ্ধান্ত, আরও কম ভুল, আর কিছুটা কম কষ্ট।
একসময় সমাজবিজ্ঞান মানেই ছিল নোটবুক আর কলমের গবেষণা, লম্বা সাক্ষাৎকার, গ্রাম থেকে গ্রামে হাঁটা। আজ সেই হাঁটার সঙ্গে যোগ হয়েছে সার্ভারের আলো, লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্লাউড। কিন্তু লক্ষ্য বদলায়নি। লক্ষ্য একটাই—মানুষকে বোঝা। ডেটা সায়েন্স এখানে হাতিয়ার, আর সোশ্যাল সায়েন্স হলো দিকনির্দেশনা। এই হাতিয়ার যদি হৃদয়হীন হয়, তবে তা বিপজ্জনক। আবার হৃদয় যদি অন্ধ হয়, তবে তা দুর্বল। ভবিষ্যৎ গবেষক হিসেবে তোমার কাজ এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা।
তুমি যদি এই পথে হাঁটতে চাও, প্রথমেই তোমাকে জানতে হবে সমাজের কোন প্রশ্নটি তোমাকে কাঁদায় বা রাগায় বা অস্থির করে। দারিদ্র্য, শিক্ষাবৈষম্য, শ্রমিকের মজুরি, নারীর নিরাপত্তা, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শহরায়ন, জলবায়ু উদ্বাস্তু—এই প্রশ্নগুলোই তোমার গবেষণার মূলধন। তারপর তোমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, এই সমস্যার পাশে কী ধরনের ডেটা ঘুরে বেড়াচ্ছে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট, DHS সার্ভে, বিশ্বব্যাংকের ওপেন ডেটা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড, মোবাইল ফোন ব্যবহারের পরিসংখ্যান—সবই দরজা, যদি তুমি খোলা চোখে তাকাও।
এই ডেটার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গিয়ে তুমি বুঝবে, কোড কোনো শত্রু নয়। বরং Python, R কিংবা SQL ধীরে ধীরে তোমার ভাষা হয়ে উঠবে, যার মাধ্যমে তুমি মানুষের না বলা কথাগুলো শুনতে শিখবে। হয়তো প্রথম দিকে গ্রাফগুলো ঝাপসা লাগবে, মডেলগুলো ধাঁধার মতো মনে হবে। কিন্তু একদিন তুমি দেখবে, কোনো একটি লাইন চার্টে ধরা পড়ছে একটি শহরের রাতের নিঃসঙ্গতা, কোনো ম্যাপের রঙে ধরা পড়ছে গ্রামের ক্ষুধা। তখন তুমি বুঝবে, সংখ্যা আসলে নির্দয় নয়, বরং খুব নির্বাক।
সোশ্যাল সায়েন্সে ডেটা সায়েন্সের সবচেয়ে কঠিন জায়গা হলো নৈতিকতা। এই ডেটার ভেতর মানুষ লুকিয়ে আছে, তাদের নাম, বয়স, পছন্দ, ভয়। OECD-এর একটি নীতিমালা মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহারে সামান্য অবহেলাও মানুষের জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই তোমাকে শিখতে হবে অনুমতি, গোপনীয়তা আর সম্মানের মানে। গবেষণা মানে কেবল প্রকাশনা নয়, গবেষণা মানে আস্থা অর্জন। মানুষ যদি তাদের জীবন তোমার ডেটায় তুলে দেয়, তবে তোমার দায়িত্ব সেই জীবন বিনা দরদে ব্যবহার না করা।
বিশ্বপরিসরে এই ক্ষেত্রটি বদলে দিচ্ছে নীতিনির্ধারণের ভাষা। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটার আচরণ বিশ্লেষণে ডেটা মডেলিং নির্বাচনী কৌশলের দিক বদলেছে। আফ্রিকায় মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণ করে মহামারি ছড়ানোর গতি আগেভাগে ধরা পড়ছে। সিঙ্গাপুর শহর পরিকল্পনা করে নাগরিক গতিবিধি বুঝে। আর ইউরোপে শ্রমবাজারের পরিবর্তন পড়া হচ্ছে রিয়েল-টাইম অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন থেকে। ডারউইন যেমন প্রকৃতিতে বিবর্তনের ছাপ খুঁজেছিলেন, আজকের গবেষক সমাজে পরিবর্তনের ছাপ খুঁজছে ডেটার ভাঁজে।
তবে বাংলাদেশে এসে এই স্বপ্ন বাস্তবতার সঙ্গে ধাক্কা খায়। এখানে ডেটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, মান একরকম নয়, অনেক সময় পুরোনো, অনেক সময় অসম্পূর্ণ। কিন্তু এই দুর্বলতাই তোমার সুযোগ। কারণ যে জায়গায় বিশৃঙ্খলা, সেখানেই দরকার গবেষক। তুমি যদি এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে প্রশ্ন করতে শেখো, তুলনা করতে শেখো, ভুল ধরতে শেখো, তবে তুমিই হয়ে উঠবে সেই মানুষ, যে নীতিনির্ধারকের টেবিলে নতুন আলো ফেলে।
তোমার প্রস্তুতির গল্পটি তাই শুরু হবে দ্বৈত পথে হাঁটায়। একপাশে সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা নৃবিজ্ঞান। অন্যপাশে পরিসংখ্যান, প্রোগ্রামিং, ভিজ্যুয়ালাইজেশন। এই দুই পথ একসময় এসে মিলবে। তখন তুমি কেবল গবেষক নও, তুমি হয়ে উঠবে ব্যাখ্যাকারী। তুমি সংখ্যাকে মানুষের ভাষায় অনুবাদ করবে, আর মানুষের যন্ত্রণাকে নীতির ভাষায় সাজিয়ে তুলবে।
হয়তো তোমার পথ একদিন তোমাকে আন্তর্জাতিক জার্নালে নিয়ে যাবে, হয়তো কোনো এনজিও অফিসে, হয়তো কোনো সরকারি দপ্তরে। জায়গা যাই হোক, কাজ একই। কাজ হলো সত্যকে কাছে আনা। মেরি কুরি যেমন অদৃশ্য রশ্মির কথা মানুষের কানে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তেমনই তোমার কাজ হবে অদৃশ্য বৈষম্য, অদৃশ্য ক্ষুধা, অদৃশ্য সম্ভাবনার কথা দৃশ্যমান করা।
গভীর রাতে, এই লেখাটা পড়তে পড়তে হয়তো তোমার মনে হচ্ছে—আমি কি পারবো এই দুই জগত সামলাতে? সমাজ একদিকে, ডেটা আরেকদিকে। উত্তরটা খুব সাধারণ, কিন্তু সহজ নয়। পারবে, যদি তুমি ধৈর্য ধরো। পারবে, যদি তুমি প্রতিদিন অল্প অল্প করে শেখো। পারবে, যদি তুমি ব্যর্থতাকে শত্রু না ভাবো। কারণ প্রত্যেকটি ভুল কোড তোমাকে শিখাবে নতুন কিছু, প্রতিটি ব্যর্থ বিশ্লেষণ তোমাকে নিয়ে যাবে আরও কাছের সত্যের দিকে।
এই পথের শেষ নেই, আছে কেবল গভীরতা। আর সেই গভীরতার নাম দায়িত্ব। যে দায়িত্ব বলে, জিপিএসের মতো শুধু পথ দেখালেই হবে না, মানুষের হাতও ধরতে হবে। সোশ্যাল সায়েন্সে ডেটা সায়েন্স তাই কোনো বিলাসিতা নয়, এটি এক ধরনের দেশসেবা। কারণ যে দেশ নিজের মানুষকে সংখ্যার ভেতর থেকে পড়ে নিতে পারে, সেই দেশ ভুল কম করে, আর ঠিক বেশি।
তুমি যদি আজ একটি লাইন কোড লেখো মানুষের ভালোর জন্য, তবে সেটি আর শুধু কোড থাকবে না, সেটি হবে এক টুকরো ভবিষ্যৎ। আর যদি আজ একটি ডেটাসেট খুলে কোনো অন্যায়ের ছাপ খুঁজে পাও, তবে সেটি আর শুধু আবিষ্কার হবে না, সেটি হবে নীরব প্রতিবাদ। এই পথেই জন্ম নেয় নতুন ধরনের বিজ্ঞানী—যাদের হাতে কীবোর্ড, আর হৃদয়ে সমাজ।
রাতের ফ্যানটা এখনো ঘুরছে। সেই ছাত্রী আবার স্ক্রিনের দিকে তাকায়। এবার সংখ্যাগুলো তাকে ভয় দেখাচ্ছে না। সে দেখতে পাচ্ছে মানুষের মুখ। সে বুঝে যাচ্ছে, সে একা নয়। তার সামনে খোলা শুধু একটি ফাইল নয়, খোলা একটি দেশ। আর সেই দেশে সে নিজের রেখাটি আঁকতে শুরু করেছে—ডেটার কালিতে, মানবতার কলমে।

Leave a comment