বাংলাদেশের গবেষক কমিউনিটিতে আমরা প্রায়ই “স্মার্ট ওয়ার্ক”, “ইনোভেশন”, “হাই–ইমপ্যাক্ট পেপার” নিয়ে কথা বলি। কিন্তু সে সবের মধ্যে একটিই দক্ষতা নীরবে কাজ করে, যা নিয়ে আমরা খুব কমই সরাসরি আলোচনা করি—সমালোচনামূলক চিন্তা বা critical thinking। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, প্রোডাক্ট ম্যানেজার, ডেটা সায়েন্টিস্টদের মতোই একজন গবেষকের জন্যও এটি আজকের দিনে প্রায় বেঁচে থাকার দক্ষতা। কারণ গবেষণার আসল চ্যালেঞ্জ কখনোই শুধু ডেটা সংগ্রহ বা কোড রান করানো নয়; আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সঠিক প্রশ্ন করা, সঠিক সমস্যাটা চিহ্নিত করা এবং প্রমাণ–ভিত্তিক একট সম্ভাব্য সমাধানে পৌঁছানো।
সমালোচনামূলক চিন্তা মানে শুধু নেগেটিভ হওয়া বা সবকিছুকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়। বরং এর মানে হচ্ছে—নতুন তথ্যকে গ্রহণ করার সময় একদিকে বিনয়ী কৌতূহল রাখা, অন্যদিকে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহও বজায় রাখা। আপনি ধরে নেবেন না যে আপনার অনুমানই শেষ কথা, আবার এমনও ভাববেন না যে সবকিছুই ভুল। গবেষণার ভাষায় বলতে গেলে, এটা হচ্ছে নিজের ধারণার উপরও “peer review” চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।
একজন গবেষকের দিন শুরুই হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে: আমি আসলে কোন সমস্যাটা সমাধান করতে চাই? আমরা অনেকে খুব দ্রুত পরীক্ষাগারে নেমে যাই, কোড লিখে ফেলি, সার্ভে ফর্ম বানিয়ে ফেলি; কিন্তু থেমে নিজেদের জিজ্ঞেস করি না—আমি কি সত্যিই সঠিক সমস্যাটা ধরেছি? একটা প্রকল্পে মাসের পর মাস কাজ করে পরে যদি দেখি, আসল যে সমস্যার জন্য ফান্ডিং পেলাম, সেটার টার্গেট গ্রুপই ঠিকমতো বোঝা হয়নি, তাহলে পুরো পরিশ্রমই আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ভুল জায়গায় চলে যেতে পারে। তাই প্রথম প্রশ্নটাই হওয়া উচিত: আমরা কি ঠিক সমস্যাটাই সমাধান করছি?
পরের প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্ম: আমরা কি সমস্যাটি সঠিক পদ্ধতিতে সমাধান করার চেষ্টা করছি? গবেষণায় সব সময় অতি–রিগোরাস হওয়া যেমন সম্ভব হয় না, তেমনি শুধু “দ্রুত ফল” পাওয়ার লোভে অতিরিক্ত শর্টকাট নেয়াও বিপজ্জনক। প্রকল্পের কনস্ট্রেইন্ট—সময়, বাজেট, যন্ত্রপাতি, জনবল—এসব মাথায় রেখে আমাদের বারবার ভাবতে হয়, কোন পর্যায়ে কতটা রিগর যথেষ্ট। একজন সমালোচনামূলক চিন্তাশীল গবেষক এই “rigor vs efficiency”–র সমন্বয়টা সচেতনভাবে করেন, আবেগে বা বাহ্যিক চাপের কারণে নয়।
অনেক ক্ষেত্রেই আমরা উপসর্গ (symptom) দেখে সমস্যার উৎস (root cause) নিয়ে ভাবি না। ধরুন, একটি হাসপাতাল–ভিত্তিক গবেষণায় আপনি দেখলেন কোনো নির্দিষ্ট ওষুধে পার্শ্ব–প্রতিক্রিয়া বেশি। আপনি যদি শুধু ওষুধের ডোজ কমিয়ে বা বদলে সাময়িক সমাধান দেন, তাহলে হয়তো আরো কিছুদিন পর অন্য উপসর্গ হিসেবে সমস্যা মাথা তুলবে। সমালোচনামূলক চিন্তা আপনাকে প্রশ্ন করতে শেখায়: এই পর্যবেক্ষণের পেছনে আসল কারণ কী? ডেটা–কলেকশন প্রক্রিয়ায় সমস্যা? স্যাম্পল–বায়াস? কনফাউন্ডিং ফ্যাক্টর? নাকি প্রকৃতই ওষুধের পার্শ্ব–প্রতিক্রিয়া?
এখানেই আসে “বড় প্রশ্নকে ভেঙে ছোট ছোট প্রশ্নে ভাগ করে নেওয়া”–র দক্ষতা। একটি বড় গবেষণা প্রশ্নকে সরাসরি আক্রমণ করার চেয়ে সেটিকে ভেঙে উপ–প্রশ্ন বানিয়ে নেওয়া অধিক ফলপ্রসূ। যেমন, “বাংলাদেশে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব কেন বাড়ছে?”—এর বদলে আলাদা আলাদা করে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে: খাদ্যাভ্যাসের কী পরিবর্তন হয়েছে, শহর বনাম গ্রামে চিত্র কী, অর্থনৈতিক স্তরভেদে ঝুঁকি কেমন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ফাঁক কোথায়—ইত্যাদি। এই ভাঙা উপ–প্রশ্নগুলোর উপর ছোট ছোট স্টাডি, পাইলট বা ডেটা–অ্যানালাইসিস করলে মূল প্রশ্নের উপরও অনেক পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়।
যখন আমরা কিছু প্রাথমিক উত্তর বা ধারণা পাই, তখন সেগুলো আসলে হাইপোথেসিস—পরীক্ষাযোগ্য অনুমান। সমালোচনামূলক চিন্তার আরেকটি স্তর হচ্ছে: এই হাইপোথেসিসগুলো যাচাই করার মতো কাজ কীভাবে সাজাব? কোন পরীক্ষাগুলো আগে করব, কোন ডেটাসেট ব্যবহার করব, কোন স্ট্যাটিস্টিক্যাল টেস্ট যথাযথ—এগুলো কৌশলগতভাবে ঠিক করা। অনেক সময় সময়ের চাপ বা ফান্ডিংয়ের ডেডলাইনে আমরা বিকল্প ডিজাইনগুলো ভালোভাবে তুলনা করি না, যা পরে রিপ্লিকেশন ক্রাইসিস বা কনফ্লিক্টিং রেজাল্টের আকারে ফিরে আসে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো—প্রতিটি গবেষকই কোনো না কোনো সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেন। গ্রান্টের সময়সীমা, ছাত্রদের থিসিস জমা দেওয়ার ডেডলাইন, যন্ত্রপাতি–অ্যাক্সেস—এসবের কারণে অনেক সময় কিছু শর্টকাট নিতেই হয়। সমালোচনামূলক চিন্তা এখানে আপনাকে সাহায্য করে বুঝতে: কোন শর্টকাট নেওয়া যায়, আর কোনটা নেওয়া মানে ভবিষ্যতে পুরো ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতা ঝুঁকির মুখে ফেলা। “আমি কি প্রয়োজনীয় কন্ট্রোল ঠিকমতো করেছি?”, “অতিরিক্ত দুই সপ্তাহ সময় পেলে আমার কনক্লুশন কতটা শক্তিশালী হতো?”—এই ধরনের প্রশ্ন করে আপনি অন্তত নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করতে পারেন, যাতে পরবর্তী গবেষক আপনার কাজের সীমা বুঝে এগোতে পারে।
সমালোচনামূলক চিন্তার কেন্দ্রে আছে প্রমাণ এবং প্রমাণ–ভিত্তিক সিদ্ধান্ত। প্রশ্নটা খুব সোজা: আমাদের হাতে যে ডেটা আছে, তা কি আমাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী? শুধু স্ট্যাটিস্টিক্যাল সিগনিফিক্যান্স দেখেই কি আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি, নাকি ইফেক্ট সাইজ, কনফাউন্ডিং, স্যাম্পল রিপ্রেজেন্টেটিভনেস—এসবও খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে? একজন গবেষক হিসেবে আমাদের বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হয়, “আমি যা লিখছি, তা কি সত্যিই ডেটা থেকে অনুসরণ করছে, নাকি আমার কাঙ্ক্ষিত ফলাফলকে সমর্থন করার জন্য আমি অচেতনভাবে কিছু ব্যাখ্যা জোড়া লাগাচ্ছি?”
গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, “কখন আমার কাজ ‘যথেষ্ট ভালো’ হলো?” আমরা অনেকে পারফেকশনিজমের ফাঁদে পড়ে বছর বছর ধরে একটি পেপার নিয়ে বসে থাকি, আবার কেউ কেউ খুব তাড়াতাড়ি “minimum publishable unit” বের করে ফেলতে চাই। সমালোচনামূলক চিন্তা এখানে একটি ভারসাম্যের বোধ জোগায়—যেখানে আপনি সচেতনভাবে নির্ধারণ করেন, এই প্রশ্নের এই পর্যায়ের উত্তর এই পরিমাণ ডেটা এবং বিশ্লেষণ দিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবে দেওয়া সম্ভব কি না।
সমালোচনামূলক চিন্তার আরেকটি দিক হচ্ছে যোগাযোগ। শুধু নিজের মাথায় যুক্তি পরিষ্কার থাকলেই হবে না; সহ–লেখক, সুপারভাইজার, রিভিউয়ার, এমনকি নন–টেকনিক্যাল স্টেকহোল্ডারদের কাছে সেই সমাধানকে পরিষ্কার এবং যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। একটি প্রজেক্ট আপডেট, গ্রান্ট প্রপোজাল বা কনফারেন্স প্রেজেন্টেশন—সবখানেই আপনাকে দেখাতে হবে: কী প্রশ্ন করেছেন, কেন করেছেন, কীভাবে উত্তর খুঁজেছেন, কী সীমাবদ্ধতা আছে এবং সামনে কী করা দরকার।
সমালোচনামূলক চিন্তাশীল গবেষকের কিছু বৈশিষ্ট্য খুবই স্পষ্ট। তারা প্রশ্ন তোলে, কিন্তু প্রশ্নগুলো অস্পষ্ট বা আবেগপ্রসূত নয়; বরং নির্দিষ্ট ও পরিষ্কারভাবে ফ্রেম করে। তারা প্রাসঙ্গিক তথ্য ধৈর্য ধরে সংগ্রহ করেন, উৎসের বিশ্বস্ততা যাচাই করেন, আর ডেটা কীভাবে মূল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে তা ভেবে দেখেন। তারা তাড়াহুড়ো করে কনক্লুশন টানেন না; বরং যুক্তিসঙ্গত মানদণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করেন—অন্যান্য স্টাডির সঙ্গে তুলনা করেন, বিকল্প ব্যাখ্যা বিবেচনা করেন।
এ ধরনের গবেষকরা নিজেদের চিন্তার সিস্টেমকে একমাত্র সত্য বলে ধরে নেন না। প্রয়োজন হলে বিকল্প তত্ত্ব, ভিন্ন ডিসিপ্লিনের দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি নিজস্ব অনুমানের বিপরীত প্রমাণের সাথেও তারা বসে কথা বলেন। নিজেদের পূর্বধারণা, বায়াস, ইনসেনটিভ—এসবের প্রভাব তারা সচেতনভাবে খুঁজে দেখেন। আর সবশেষে, তারা দলগতভাবে ভাবতে জানেন—সহকর্মীদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনায় যান, দ্বিমতকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেন না, বরং হাইপোথেসিস শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখেন।
বাংলাদেশি গবেষকদের জন্য সমালোচনামূলক চিন্তা হয়তো কোনো নতুন তত্ত্ব নয়, কিন্তু আমাদের প্রাত্যহিক প্র্যাকটিসে এটি সচেতনভাবে আনা এখন সময়ের দাবি। আমরা যখন তড়িঘড়ি করে প্রজেক্ট লিখে ফেলি, দ্রুত “পেপার আউটপুট” বাড়ানোর চাপে থাকি, বা শুধু সুপারভাইজারের নির্দেশ পালন করে গবেষণা করি—তখনই সবচেয়ে বেশি দরকার হয় একটু থেমে যাওয়ার, নিজের কাছে কিছু কঠিন প্রশ্ন রাখার। সমালোচনামূলক চিন্তা মানে ঠিক সেটাই—উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করা, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত গড়ে তোলার চেষ্টা করা, আর কারণ–পরিণতি মাথায় রেখে ভবিষ্যতের সমস্যাকে আগেভাগে চিনে নেওয়া।
গবেষণার দুনিয়ায় প্রায়ই আমরা বলি, “গুড সায়েন্স ইজ গুড থিঙ্কিং।” সেই “গুড থিঙ্কিং”–এর কেন্দ্রেই আছে সমালোচনামূলক চিন্তা—যা আপনাকে শুধু ভালো গবেষকই বানাবে না, বরং দায়িত্বশীল নাগরিক এবং পরিণত মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে।

Leave a comment