আজকের তরুণদের সামনে পৃথিবী যেন একদিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, আবার অন্যদিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান দেখলে ছবিটি পরিষ্কার হয়। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে পাঁচ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পড়তে যায়, গত দুই দশকে সংখ্যাটি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এদের একটি বড় অংশ উন্নয়নশীল দেশের তরুণ, যারা উন্নত বিশ্বে পা রেখে স্বপ্ন দেখে ভিন্ন ভবিষ্যতের। অথচ এই যাত্রা শেষ হয় না ডিগ্রি হাতে পাওয়া পর্যন্ত, শুরু হয় তার পরেই সংগ্রামের আসল অধ্যায়।
এই বাস্তবতা আবার সামনে আসে যখন বাংলাদেশ থেকে এক তরুণ আমার কাছে ক্যারিয়ার পরামর্শ চাইতে আসে। সে চীনের মতো একটি প্রযুক্তি–উন্নত দেশে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ে দেশে ফিরে এসেছে, অথচ চাকরির বাজারে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই গল্পটি কোনো ব্যতিক্রম নয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদেশফেরত তরুণদের বড় একটি অংশ দেশে ফিরে প্রথম বছরেই কাঙ্ক্ষিত চাকরি পায় না। ভেতরে জমে ওঠা হতাশা তখন প্রশ্ন তোলে, বিদেশে গিয়ে পড়াশোনার সিদ্ধান্তটি কি ভুল ছিল।
তরুণটি বলেছিল, দেশে চাকরি খোঁজার সময় সে টের পায়, নিয়োগকারীদের চোখে তার বিদেশি ডিগ্রি সবসময় বাড়তি সুবিধা হয়ে ওঠে না। অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামই প্রথম ফিল্টার। নিয়োগ–সংক্রান্ত একাধিক জরিপ বলছে, উন্নয়নশীল দেশের অনেক কোম্পানিতে প্রার্থীর দক্ষতার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ডের ওজন এখনও বেশি। এই প্রবণতার কারণে অসংখ্য যোগ্য প্রার্থী কাগজেই হারিয়ে যায়, সাক্ষাৎকারের টেবিলেই পৌঁছাতে পারে না।
অন্যদিকে, সে যখন আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে নিজেকে তুলে ধরতে চায়, তখন দেখা যায় আরেক চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক নিয়োগ পোর্টালগুলোর তথ্য বলছে, বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপনের অন্তত ৭০ শতাংশেই প্রাধান্য পায় বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, কেবল ডিগ্রি নয়। সদ্য পাশ করা একজন গ্র্যাজুয়েট সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে এমন এক ম্যাচে, যেখানে প্রতিপক্ষরা অনেকেই পাঁচ–ছয় বছরের অভিজ্ঞতার মালিক। ফলাফল হিসেবে, আবেদন পাঠানো হয় শত শত, কিন্তু উত্তর আসে হাতে গোনা কয়েকটি।
এখানেই বোঝা যায়, সমস্যা শিক্ষায় নয়, সমস্যা রূপান্তরে। বিদেশি ডিগ্রি থাকলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খুলে যাবে, এই ধারণাটি একধরনের রোমান্টিক কল্পনা। বাস্তবে দরকার নিজের অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে নিয়োগকারী বুঝতে পারে, এই প্রার্থী কী আলাদা মূল্য নিয়ে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, যারা নিজেদের দক্ষতা ও অর্জন উপস্থাপনে কৌশলী, তাদের সাক্ষাৎকারে ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ প্রার্থীর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বাংলাদেশের চাকরির বাজারে সুযোগ তৈরি করার আরেকটি বড় চাবিকাঠি হলো নেটওয়ার্কিং। বৈশ্বিক ক্যারিয়ার গবেষণায় বলা হয়, প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরির সুযোগ আসে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও পরিচয়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ, আপনি কাকে চেনেন, সেটিও অনেক সময় ঠিক করে দেয় আপনি কোথায় পৌঁছাবেন। এই বাস্তবতা তরুণদের জন্য একদিকে হতাশার, অন্যদিকে সম্ভাবনার। হতাশার, কারণ শুধু যোগ্যতা থাকলেই সব হয় না; সম্ভাবনার, কারণ মানুষ তৈরি করলে পথও তৈরি হয়।
বৈশ্বিক চাকরির বাজারে আবার ভিন্ন ধরণের প্রস্তুতি দরকার। শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক কোম্পানির এইচআর নীতিমালায় ক্রস–কালচারাল কমিউনিকেশন, টিমওয়ার্ক ও অভিযোজনশীলতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক কর্মক্ষেত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশের বেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে সফট স্কিল এখন নিয়োগের অন্যতম বড় মানদণ্ড। অর্থাৎ, আপনি কত ভালো কোড লিখেন, তার পাশাপাশি আপনি কতটা ভালোভাবে মানুষকে বোঝেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গায় চীনের মতো দেশে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা একজন তরুণকে অনন্য করে তুলতে পারে। ভিন্ন সংস্কৃতিতে কাজ করা, ভিন্ন ভাষায় যোগাযোগ করা, কঠোর একাডেমিক পরিবেশে টিকে থাকা—এসবই এমন দক্ষতা, যা বই থেকে শেখা যায় না। অথচ, এই অভিজ্ঞতাগুলোকে সঠিক ভাষায় তুলে ধরতে না পারলে সেগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়ে। জরিপ বলছে, অনেক তরুণ নিজের অভিজ্ঞতাকে ঠিকমতো “অনুবাদ” করতে না পারায় আন্তর্জাতিক নিয়োগে পিছিয়ে যায়।
আমি যখন তাকে পরামর্শ দিচ্ছিলাম, তখন নিজের জীবনের কথাও মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমিও এমন সময় দেখেছি, যখন আমার পথ খুব সোজা ছিল না। কিন্তু আমি শিখেছিলাম, আমার গল্পটা আমাকে নিজেকেই লিখতে হবে। কে আমি, কোথা থেকে এসেছি, কী শিখেছি, কোথায় যেতে চাই—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি না থাকলে অন্য কেউ এসে আপনার জন্য সেই উত্তর তৈরি করে দেবে, এবং তা আপনার পক্ষে নাও যেতে পারে।
আজকের তরুণদের সামনে পথ জটিল, কিন্তু সুযোগ অভূতপূর্ব। ইন্টারনেট, রিমোট কাজের সুযোগ, আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে এক নতুন কর্মবিশ্ব তৈরি হয়েছে, যেখানে ভৌগোলিক সীমারেখা অনেকটাই ঝাপসা। বৈশ্বিক কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডিজিটাল ও রিমোট কাজের ক্ষেত্র দ্বিগুণেরও বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনি ঢাকায় বসেই আজ কাজ করতে পারেন সিঙ্গাপুর, বার্লিন বা টরন্টোর প্রতিষ্ঠানের জন্য।
তবু শেষ কথা একটাই, স্বপ্নের চেয়েও বেশি দরকার প্রস্তুতি। বিদেশফেরত হলেই আপনি আলাদা হয়ে যান না, আপনাকে আলাদা করে তুলতে হয় নিজেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আপনার পরিচয়ের একটা অংশ হতে পারে, কিন্তু পুরো পরিচয় নয়। পুরো পরিচয় আসে আপনার দক্ষতা, আপনার মানসিকতা আর আপনার গল্প থেকে।
তরুণদের বলব, দেশে থাকলে আপনি সীমিত নন, বিদেশে পড়লে আপনি অমূল্য নন, এমন কোনো সরল সমীকরণ নেই। আসল বিষয় হলো আপনি কী শিখছেন, কীভাবে নিজেকে তৈরি করছেন এবং পৃথিবীর সামনে কীভাবে নিজেকে তুলে ধরছেন। স্থানীয় বাস্তবতা আর বৈশ্বিক স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যারা দিশেহারা, তাদের জন্য একটাই কথা, নিজের গল্পটা নিজের হাতে নিন।
আপনার পথ হয়তো বাঁকানো, হয়তো ধুলোমাখা, কিন্তু সেটাই আপনার পথ। আর আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজের গল্পটি ঠিকভাবে বলতে পারা। কে জানে, আগামী দিনের কোনো তরুণ আপনার গল্প পড়েই সাহস পাবে নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটার।

Leave a comment