বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতে আমরা প্রায়ই দেখি গভীর মনোযোগ দিয়ে নির্দিষ্ট একটি সমস্যার সমাধানে ডুবে থাকা গবেষকদের। কোনো জটিল সমীকরণ, কোনো অণুর গঠন, কিংবা কোনো অ্যালগরিদমের সূক্ষ্ম ত্রুটি ঠিক করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা মাসের পর মাস ব্যয় করেন। এই নিবিড় মনোযোগ ছাড়া গবেষণায় অগ্রগতি সম্ভব নয়। কিন্তু অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতেই সীমাবদ্ধ থাকলে গবেষণার প্রকৃত প্রভাব অনেক সময় অপূর্ণ থেকে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—“একজন বিজ্ঞানীকে বড় ছবিটা দেখতে জানতে হবে।”
‘বড় ছবি’ বলতে তিনি বোঝান গবেষণার সামাজিক, প্রযুক্তিগত ও মানবিক প্রেক্ষাপটকে একসঙ্গে দেখা। একটি গবেষণা প্রকল্প ল্যাবের ভেতরে সফল হলেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না। সেই গবেষণা সমাজে কী প্রভাব ফেলবে, কোন সমস্যার সমাধানে অবদান রাখবে, কিংবা ভবিষ্যতে কোন নতুন প্রশ্নের জন্ম দেবে—এসব বিষয় বিবেচনায় আনাই হলো বড় ছবি দেখা। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা। কোনো নতুন প্রযুক্তি যদি কেবল পরীক্ষাগারে কার্যকর হয়, কিন্তু বাস্তবে রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য না হয়, তবে তার মূল্য অনেকটাই কমে যায়। তাই গবেষণার শুরু থেকেই প্রয়োগের সম্ভাবনা মাথায় রাখা জরুরি।
বড় ছবি দেখার আরেকটি দিক হলো আন্তঃবিষয়ক চিন্তা। আধুনিক গবেষণা ক্রমেই একক বিষয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ চিকিৎসা, কৃষি, পরিবেশবিজ্ঞান—সবখানেই প্রভাব ফেলছে। একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানীর কাজের সঙ্গে একজন চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হয়। এই সমন্বয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করাই বড় ছবি দেখার অন্যতম অংশ। ডক্টর করিমের মতে, বিজ্ঞানীদের উচিত নিজের বিশেষায়িত ক্ষেত্রের বাইরে তাকিয়ে অন্য শাখার সঙ্গে সংযোগ খোঁজা।
বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় আমরা পরীক্ষার ফলাফল বা প্রকাশনার সংখ্যাকেই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে দেখি। কিন্তু গবেষণার প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন তার প্রভাব সমাজে দৃশ্যমান হয়। কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি এনে যদি কৃষকের জীবনমান উন্নত হয়, কিংবা পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় যদি দূষণ কমানোর বাস্তবসম্মত সমাধান পাওয়া যায়, তবেই গবেষণার অর্থপূর্ণতা পূর্ণতা পায়। তাই গবেষণার পরিকল্পনার সময় থেকেই স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বড় ছবি দেখার অর্থ এটাও বোঝায় যে বিজ্ঞানীকে দলগতভাবে কাজ করতে জানতে হবে। একটি বড় সমস্যার সমাধান একক ব্যক্তির পক্ষে প্রায়ই সম্ভব নয়। এখানে প্রয়োজন বিভিন্ন দক্ষতার মানুষকে একত্র করা, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং সমন্বিতভাবে এগিয়ে যাওয়া। এই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীকে শুধু গবেষক হিসেবে নয়, কখনো সংগঠক, কখনো সমন্বয়কারী হিসেবেও ভূমিকা রাখতে হয়।
শেষ পর্যন্ত “একজন বিজ্ঞানীকে বড় ছবিটা দেখতে জানতে হবে”—এই বাণীটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞান কেবল জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়া নয়; এটি সমাজের সঙ্গে যুক্ত এক জীবন্ত উদ্যোগ। গবেষণাগারের দেয়াল পেরিয়ে সমাজের বাস্তব সমস্যার দিকে তাকাতে পারলেই বিজ্ঞান তার পূর্ণ শক্তি ও অর্থ খুঁজে পায়।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment