চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

স্বাস্থ্যসেবায় অ্যাপলের স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাক

Share
Share

প্রযুক্তির জগতে অ্যাপলের নাম মানেই এক ধরনের অটল বিশ্বাস। তারা যেখানেই হাত দিয়েছে, মনে হয়েছে সেখানেই নতুন এক বিপ্লব ঘটবে। ফোন থেকে ঘড়ি, ল্যাপটপ থেকে ট্যাবলেট—অ্যাপল যেন সবকিছুকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই যখন শোনা গেল যে অ্যাপল স্বাস্থ্যসেবায় নামছে, তখন অনেকেই ধরে নিলেন খেলার ইতি ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই হয়তো অ্যাপলের জন্য সবচেয়ে বড় ফাঁদ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবা কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। যদি কেবলমাত্র প্রযুক্তি দিয়েই এটি সমাধান করা যেত, তবে বহু আগেই আমরা এর জট ছাড়াতে পারতাম। বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্যসেবার মূল চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে আছে নীতিনির্ধারণ, পরিবেশগত ঝুঁকি, মানুষের আচরণগত ধরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও বিষাক্ত পরিবেশগত এক্সপোজারের ভেতরে। একটি স্মার্ট ড্যাশবোর্ড কিংবা মোবাইল অ্যাপ এই গভীর সমস্যাগুলো দূর করতে পারবে না।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া খবর বলছে, অ্যাপলের নতুন উদ্যোগ প্রজেক্ট মুলবেরি মূলত এক ধরনের এআই-ভিত্তিক স্বাস্থ্য কোচ। এটি ব্যবহারকারীর বায়োমার্কার বিশ্লেষণ করবে, খাবারের তালিকা নির্ধারণ করবে, ব্যায়ামের ধরন ও ভঙ্গিমা নির্দেশনা দেবে—সবকিছুই আপনার আইফোন থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে। প্রযুক্তির দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর শোনালেও মূল প্রশ্ন থেকে যায়: মানুষ আসলেই কি এরকম আরও নোটিফিকেশন, সতর্কবার্তা আর নির্দেশনার জন্য প্রস্তুত?

আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য অ্যাপ, ওয়াচ, ব্যান্ড আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে কখন হাঁটতে হবে, কখন ঘুমাতে হবে কিংবা কতটুকু পানি খাওয়া হলো। ফলাফল হলো আমরা ক্লান্ত, বিভ্রান্ত, এবং তথ্যের চাপে প্রায় অসাড় হয়ে যাচ্ছি। স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই তথ্যের ভিড় কমিয়ে প্রকৃত সংকেতগুলোকে স্পষ্ট করা—শুধু নতুন শব্দ যোগ করা নয়।

এখানেই কিছু বিকল্প প্রযুক্তি যেমন Ōura ring আমাদের ভিন্ন দৃষ্টান্ত দিয়েছে। এটি সবসময় উপস্থিত নয়, তবে প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক অন্তর্দৃষ্টি দেয় এবং বাকি সময়ে আড়ালে সরে যায়। প্রকৃত ভবিষ্যৎ সম্ভবত এই দিকেই—সংকেতকে বাড়ানো, শব্দকে নয়।

অ্যাপল যদি সত্যিই জিততে চায়, তবে তাদের মনোযোগ দিতে হবে স্বাস্থ্যকে স্বাভাবিক জীবনচর্চার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দিকে। কোটি কোটি মানুষের কাছে মৌলিক স্বাস্থ্য জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার মতো সক্ষমতা অ্যাপলের আছে। তারা চাইলেই এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে যেখানে স্বাস্থ্য ট্র্যাকিং হবে সাধারণ, কিন্তু তাতে লজ্জা বা অস্বস্তি থাকবে না।

কারণ, স্বাস্থ্যসেবার সত্যিকারের বিজয়ীরা কেবলমাত্র উপসর্গ গোনার যন্ত্র তৈরি করবে না। তারা আমাদের জীবনধারা পাল্টাতে সাহায্য করবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই পরিবর্তনের পেছনে থাকা সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থাকেও পরিবর্তন করতে অবদান রাখবে।

আজকের বড় প্রশ্ন হলো, কার হাতে আমাদের স্বাস্থ্যতথ্য জমা আছে তা নয়; বরং, কে আমাদের সেই তথ্য থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে। স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই রূপান্তর ঘটাতে পারার ওপর।

অ্যাপল হয়তো আগামী দিনে স্বাস্থ্যসেবায় বড় খেলোয়াড় হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই জয় প্রযুক্তির ঝলক নয়, বরং মানুষের আচরণগত বাস্তবতা, নীতিনির্ধারণী কাঠামো এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ বোঝার মধ্যেই নিহিত। প্রযুক্তি তখনই শক্তিশালী, যখন তা মানুষকে সত্যিকার অর্থে পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে—তথ্য জমা করে রাখার জন্য নয়, জীবনে পরিবর্তন আনবার জন্য।

বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে স্বাস্থ্যসেবা এখনো অনেকাংশে সংকটাপন্ন, সেখানে এই আলোচনার গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদেরও ভাবতে হবে, আমরা কি শুধু নতুন প্রযুক্তির মোহে ডুবে যাচ্ছি, নাকি সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনতে পারছি। অ্যাপল যদি তা পারে, তবে স্বাস্থ্যসেবার এই দৌড়ে তারা একদিন সত্যিই বিজয়ী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু না পারলে, তারা কেবল আরেকটি স্মার্ট ডিভাইস বিক্রেতা হিসেবেই থেকে যাবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org