জেনেটিকসবায়োটেকনলজি

“ধান কিংবা গমে যদি অ্যাপোমিক্সিস আনা যায়, উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে”—ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করলে অনেকেই আধুনিক যন্ত্রপাতি, সেচব্যবস্থা বা ডিজিটাল প্রযুক্তির কথা বলেন। কিন্তু উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভেতরে এমন কিছু মৌলিক গবেষণা চলছে, যা কৃষিকে আরও গভীরভাবে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তেমনই একটি ধারণা হলো ‘অ্যাপোমিক্সিস’। উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরীর ভাষায়, “ধান বা গমে যদি অ্যাপোমিক্সিস আনা যায়, উৎপাদন অনেক বেড়ে যাবে।” এই বক্তব্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের কৃষির এক সম্ভাব্য বিপ্লব।

অ্যাপোমিক্সিস কী? সহজ ভাষায় বোঝা যাক

সাধারণভাবে উদ্ভিদের বীজ তৈরি হয় ফুলের পুরুষ অংশের পরাগরেণু ও স্ত্রী অংশের মিলনের মাধ্যমে। এটি অনেকটা মানুষের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের মিলনে সন্তানের জন্মের মতো। কিন্তু প্রকৃতিতে এমন কিছু উদ্ভিদ আছে, যেখানে পুরুষ অংশের অংশগ্রহণ ছাড়াই বীজ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াই হলো অ্যাপোমিক্সিস।

সহজভাবে বললে, অ্যাপোমিক্সিসের মাধ্যমে উদ্ভিদ নিজেরই ‘কপি’ তৈরি করে বংশবিস্তার করতে পারে। এতে নতুন প্রজন্মের উদ্ভিদ জিনগতভাবে মা উদ্ভিদের মতোই হয়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—যদি কোনো গাছের জাত খুব ভালো ফলন দেয় বা রোগ প্রতিরোধী হয়, তাহলে সেই ভালো বৈশিষ্ট্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপরিবর্তিতভাবে বজায় থাকে।

কেন এটি কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

আধুনিক কৃষিতে হাইব্রিড জাতের ফসল খুব জনপ্রিয়, কারণ এগুলো সাধারণত বেশি ফলন দেয়। কিন্তু হাইব্রিড বীজের একটি সীমাবদ্ধতা হলো—একবার ফসল ফলানোর পর সেই ফসলের বীজ আবার ব্যবহার করলে একই মানের ফলন পাওয়া যায় না। ফলে কৃষককে প্রতিবছর নতুন বীজ কিনতে হয়। এতে কৃষকের খরচ বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে বীজের ওপর নির্ভরশীলতাও তৈরি হয়।

অ্যাপোমিক্সিস প্রযুক্তি যদি ধান বা গমের মতো প্রধান খাদ্যশস্যে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে কৃষক একবার ভালো মানের বীজ পেলে তা থেকে পরের বছরও একই মানের ফসল ফলাতে পারবেন। এতে বীজের খরচ কমবে, উৎপাদন স্থিতিশীল হবে এবং ছোট কৃষকদের জন্য এটি বিশেষভাবে লাভজনক হতে পারে।

গবেষণার অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা

ড. আবেদ চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মীরা উদ্ভিদের বীজ তৈরির সঙ্গে যুক্ত বিশেষ কিছু জিন নিয়ে গবেষণা করেছেন, যেগুলো অ্যাপোমিক্সিসের মতো প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, বীজ তৈরির ভেতরের জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো কতটা জটিল এবং সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত।

তবে এখনো পর্যন্ত ধান, গম বা ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যে পূর্ণাঙ্গভাবে অ্যাপোমিক্সিস প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। এটি এখনো গবেষণাগারের পর্যায়ে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে জিনগত নিয়ন্ত্রণের জটিলতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি। তবু বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগযোগ্য হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনা

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কৃষির ওপর বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন নির্ভরশীল, সেখানে অ্যাপোমিক্সিস প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে বিপ্লবাত্মক। বন্যা, খরা বা লবণাক্ততার মতো প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন উন্নত জাত যদি অ্যাপোমিক্সিসের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে কৃষকের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, এই ধরনের মৌলিক গবেষণার সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ বাড়ানো জরুরি। এতে আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে স্থানীয় বাস্তবতায় প্রয়োগের পথ তৈরি হতে পারে।

ভবিষ্যতের কৃষির পথে বিজ্ঞানভিত্তিক বিনিয়োগ

অ্যাপোমিক্সিসের মতো প্রযুক্তি শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের কৃষি ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য ভিত্তি। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ, বিজ্ঞানী তৈরির পরিকল্পনা এবং নীতিগত সহায়তা।

ড. আবেদ চৌধুরীর জীবন ও গবেষণা দেখায়, মৌলিক বিজ্ঞানচর্চা কখনো কখনো দীর্ঘ সময় নেয় ফল দিতে। কিন্তু একবার ফল দিতে শুরু করলে তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। বীজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই জৈবিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ ও টেকসই হতে পারে।


ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org