একটা সময় ছিল, পথ খুঁজতে মানুষ কাগজের মানচিত্রে আঙুল বুলাতো, লিখতে বসে কলমের নিবে খুঁজত অনুপ্রেরণা, আর মোবাইল ফোন খোলার আগে তালার চাবি থাকত গলায় ঝোলানো। আজকের দিনে এসব দৃশ্য প্রায় অচিন্তনীয়। এখন ঢাকার রাস্তায় যানজট এড়াতে পথনির্দেশনা চাইলে, ফোন হাতে নিয়েই ভরসা করতে হয় গুগল ম্যাপের ওপর। কোনো ফাইল লেখার সময় বানান ঠিক রাখতে বা মুখের কথা লেখায় রূপ দিতে ভয়েস-টু-টেক্সট সুবিধাই ভরসা। আর ফোনের স্ক্রিন আনলক করতে পাসওয়ার্ডের প্রয়োজন নেই—মুখ চিনে নেয়ার প্রযুক্তিই যথেষ্ট। এসব সুবিধার পেছনে যে শক্তি, তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
প্রথমে হয়তো মনে হয়েছিল, এআই কেবল প্রযুক্তি কোম্পানির খেলার মাঠ। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি শিল্পখাতের জন্যই এটি ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সুযোগ। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যাকসেনচারের বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে, ২০২১ সালে বিশ্বের দুই হাজার বৃহত্তম কোম্পানির নির্বাহীরা যখন তাদের আয়-সংক্রান্ত আলোচনায় এআই উল্লেখ করেছেন, তখন তাদের শেয়ারমূল্য গড়ে ৪০ শতাংশ বেশি বেড়েছে। ২০১৮ সালে এ হার ছিল মাত্র ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ, যেসব প্রতিষ্ঠান এআই-কে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করছে, বাজারও তাদের প্রতি আস্থার ভোট দিচ্ছে।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত আলোচনা-পর্যালোচনার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ১২ শতাংশ প্রকৃত অর্থে “এআই অর্জনকারী” বা AI Achievers। এরা তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশই এআই-নির্ভর উদ্যোগ থেকে অর্জন করছে। তুলনায় বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হবে—১২ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২৭ শতাংশে।
ঢাকার ব্যবসায়ী রাকিবুল হাসান এই প্রসঙ্গে বললেন, “আজকের দিনে এআই নিয়ে কথা না বললে ব্যবসা যেন অচল মনে হয়। কিন্তু কেবল মুখে বললেই হবে না, বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা সাহস নিয়ে আগাচ্ছে, তারাই এগিয়ে থাকবে।”
গবেষণা বলছে, যেসব প্রতিষ্ঠান ‘অর্জনকারী’ হিসেবে পরিচিত, তারা কেবল খরচ কমানোর জন্য এআই ব্যবহার করে না। বরং তারা নতুন বাজার ধরতে, গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবসা চালাতে এআইকে কাজে লাগায়। উদাহরণস্বরূপ, মাদ্রিদের পুরোনো মেট্রো রেল ব্যবস্থা এআই-চালিত ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ খরচ ২৫ শতাংশ কমিয়েছে। আবার একটি খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিপ লার্নিংয়ের মাধ্যমে ড্রাইভারদের জন্য সর্বোত্তম ডেলিভারি রুট ঠিক করছে—ফলে সময় বাঁচছে, গ্রাহক সন্তুষ্টিও বাড়ছে।
অ্যাকসেনচারের তথ্য বলছে, এআই-তে বিনিয়োগ করা প্রত্যেক ১০টি উদ্যোগের মধ্যে অন্তত তিনটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি লাভ মেলে। এর মানে, এআই কোনো দূরস্বপ্ন নয়, বরং এখনকার বাস্তব অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক খাতে আইনগত জটিলতা, ডেটা সুরক্ষার অভাব এবং দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশিষ্ট প্রযুক্তি বিশ্লেষক প্রফেসর আনিসুজ্জামান এ নিয়ে সতর্ক করে বলেন, “এআই ব্যবহার মানেই কেবল অগ্রগতি নয়। এটি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে করতে হবে। নইলে যে প্রযুক্তি আজ সমাধান দিচ্ছে, কাল সেটিই সমস্যা তৈরি করবে।”
সবশেষে বলা যায়, এআই আর “হবে কি হবে না” সেই প্রশ্নে আটকে নেই। এটি এখন সময়ের প্রশ্ন—কে আগে এগিয়ে যাবে, কে পিছিয়ে পড়বে। বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্যও বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করছে। যারা আজ সাহস নিয়ে এআই-কে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করবে, তারা আগামী দিনের ব্যবসা ও সমাজে নেতৃত্ব দেবে। আর যারা দ্বিধায় থাকবে, তারা হয়তো কেবল দর্শকের আসনেই বসে থাকবে।
ভবিষ্যৎ তাই স্পষ্ট: এআই-ই হবে নতুন প্রতিযোগিতার মাপকাঠি। প্রশ্ন শুধু—আপনি কি সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে প্রস্তুত?

Leave a comment