বিজ্ঞানীদের জীবনীরসায়নবিদ্যা

“প্রবাসে থেকেও দেশের জন্য কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব” — ড. আবুল হুস্সাম

Share
Share

বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন বিদেশে পড়তে যান বা কাজ করতে শুরু করেন, তখন প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঠে আসে—দেশ কি তাঁদের হারিয়ে ফেলে? এই প্রশ্নের উত্তর ড. আবুল হুস্সামের জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, “প্রবাসে থেকেও দেশের জন্য কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব।” এই একটি বাক্য শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন নয়, বরং বাংলাদেশের হাজারো প্রবাসী বিজ্ঞানী ও গবেষকের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা।

ড. হুস্সাম যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রির প্রফেসর ও সেন্টার ফর ক্লিন ওয়াটার অ্যান্ড সাস্টেইনেবল টেকনোলজিস-এর পরিচালক। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা এসেছে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের একটি বাস্তব সমস্যা থেকে—আর্সেনিক দূষণ। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়লে অনেক বিজ্ঞানী বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেন। কিন্তু ড. হুস্সামের চিন্তা ছিল ভিন্ন। তিনি ভাবলেন, এই সমস্যা নিয়ে গবেষণাপত্র লেখা যেমন জরুরি, তেমনি মাঠপর্যায়ে কাজ করে এমন একটি সমাধান দরকার, যা গ্রামের সাধারণ মানুষও ব্যবহার করতে পারবে।

এই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় সোনো ফিল্টার। এটি এমন একটি পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই কাজ করে এবং স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করা যায়। ফলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটি ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি দেখিয়ে দেয়, ভৌগোলিক দূরত্ব কখনোই দায়বদ্ধতার দূরত্ব তৈরি করতে পারে না।

প্রবাসে থাকা অনেক বাংলাদেশি তরুণ গবেষক মনে করেন, দেশের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতে হলে দেশে থেকেই কাজ করতে হবে। বাস্তবে ড. হুস্সামের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডার ব্যবহার করে বিদেশে বসেও দেশের সমস্যার কার্যকর সমাধান বের করা সম্ভব। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা অবস্থায় প্রযুক্তিগত সুবিধা ও গবেষণার অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য আরও বড় অবদান রাখা যায়।

তবে এই পথটি সহজ নয়। প্রবাসে থাকা মানেই নিজের শিকড় থেকে দূরে থাকা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই দেশের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু ড. হুস্সাম নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করেছেন, স্থানীয় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যাকে নিজের গবেষণার কেন্দ্রে রেখেছেন। এতে বোঝা যায়, প্রবাসে থেকেও দেশের সঙ্গে মানসিক ও পেশাগত সংযোগ ধরে রাখা সম্ভব—যদি দায়বদ্ধতার জায়গাটি স্পষ্ট থাকে।

এই দৃষ্টান্ত তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বিশ্বে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ক্রমেই বৈশ্বিক হয়ে উঠছে। অনেক তরুণ বিদেশে পড়তে যাবেন—এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবেন, নাকি দেশের সমস্যাগুলোকেও গবেষণার অংশ করবেন? ড. হুস্সামের জীবন এই প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর দেয়। প্রবাস মানেই বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং এটি হতে পারে দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা।

এই কারণে, “প্রবাসে থেকেও দেশের জন্য কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব”—এই উক্তিটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য ভূগোল নয়, দরকার দায়বদ্ধতা, দূরদৃষ্টি ও মানবিক মনোভাব।

ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org