লেখক: মো. মুবাশ্বির সালেহীন | সম্পাদকীয় পর্যালোচনায়: মো. মঞ্জুরুল ইসলাম | তথ্য যাচাই: মো. ইফতেখার হোসেন
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬| সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬
একটা প্রশ্ন করি –
আপনার ঘরের রান্নাঘরে এমন কোনো জিনিস আছে, যা একদিন “শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চিকিৎসা-আবিষ্কার” হয়ে উঠেছিল?
আছে।
একটু লবণ।
একটু গুড়।
আর এক গ্লাস জল।
কিন্তু এই গল্প শুরু হয়েছিল এক চিকিৎসকের একটা প্রশ্ন দিয়ে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে বাংলাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় বিশ বছর।
১৯৫৩: কলকাতার এক ডাক্তারের “বেয়াড়া” প্রশ্ন
তখন কলকাতা।
কলেরা বাংলার চিরচেনা মৃত্যুদূত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম তখন একটাই:
রোগী শুকিয়ে যাচ্ছে? শিরায় স্যালাইন দাও।
এই নিয়মের সামনে দাঁড়িয়ে হেমেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় নামের এক বাঙালি চিকিৎসক জিজ্ঞেস করে বসলেন:
“যে জল-লবণ শিরায় দিতে হয়, তা কি মুখ দিয়ে খাওয়ানো যায় না?”
প্রশ্নটা শুনতে সহজ।
কিন্তু সেই সময়ে এটা ছিল প্রায় বিদ্রোহ।
তিনি থেমে থাকলেন না। ১৮৬ জন কলেরা রোগীকে দিলেন লবণ আর গ্লুকোজের দ্রবণ।
মিশ্রণটা কেমন ছিল?
• এক লিটার জলে ৪ গ্রাম লবণ
• আর ২৫ গ্রাম গ্লুকোজ
আজকের খাবার স্যালাইনের প্রায় কাছাকাছি।
রোগী যাতে দ্রবণটা পেটে রাখতে পারে, সেজন্য বমি থামানোর আলাদা ওষুধও দিলেন।
১৯৫৩ সালের নভেম্বরে ফল ছাপা হলো ল্যানসেট পত্রিকায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে সম্মানিত মঞ্চে।
এবার নিশ্চয়ই সবাই হইহই করে ছুটে এল?
তারপর? কিছুই হলো না।
কেউ এগোল না।
কেউ আরেকটা পরীক্ষা সাজাল না।
কাজটা চুপচাপ ঝাপসা হয়ে গেল।
কেন?
কারণটা নিষ্ঠুর রকম সরল।
চট্টোপাধ্যায় জানতেন, কাজ করছে।
কিন্তু কেন করছে, তা কেউ জানত না।
তখনও অজানা ছিল একটা গোপন কথা:
অন্ত্রে গ্লুকোজ থাকলে লবণ আর জলের শোষণ বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানের দুনিয়ায় ব্যাখ্যাহীন ফলাফল প্রায়ই কৌতূহল হয়ে একপাশে পড়ে থাকে।
পরে যাঁরা এই চিকিৎসাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন, তাঁদেরই একজন রিচার্ড ক্যাশ বলেছেন, বিজ্ঞানভিত্তি ছিল না বলেই কাজটা ফেলে রাখা হয়েছিল।
আর পশ্চিমে? সেখানে শিরায় স্যালাইনই তখন একচ্ছত্র রাজা।
হেমেন্দ্রনাথের প্রশ্নটা হয়ে গেল অনাথ।
১৯৬০: ঢাকায় এক অপ্রত্যাশিত ল্যাব

ছবি: কাচের ফ্লাস্ক, অণুবীক্ষণ যন্ত্র আর কাঠের বেঞ্চে সাজানো এক সাদামাটা গবেষণাগার, খড়খড়ি গলে আসা সোনালি আলোয় গবেষকদের ছায়ামূর্তি। (প্রতীকী ছবি)
এবার গল্পের মঞ্চ বদলে গেল।
কলকাতা থেকে ঢাকা।
১৯৬০ সালে মার্কিন ও পাকিস্তান সরকারের চুক্তিতে ঢাকায় (তখন বানান “ডাক্কা”, আর দেশটা পূর্ব পাকিস্তান) গড়ে উঠল পাকিস্তান-সিয়াটো কলেরা গবেষণাগার।
সত্যি বলতে, এর পেছনে চিকিৎসার চেয়ে বেশি কাজ করেছিল ঠান্ডা যুদ্ধের ভূরাজনীতি।
তবে যুক্তিটা একেবারে অযৌক্তিকও ছিল না।
কলেরার আদি জন্মভূমিতেই তো কলেরা নিয়ে গবেষণা করা উচিত।
আর এই ল্যাবই হয়ে উঠল সেই জায়গা, যেখানে হেমেন্দ্রনাথের অনাথ প্রশ্নটা আবার ফিরে এল।
এবার একা নয়।
বিজ্ঞানের পায়ে ভর দিয়ে।
১৯৬৮: তাঁবুর নিচে এক তরুণ গবেষক

ছবি: বর্ষায় জঙ্গলের ধারে খাটানো তাঁবুর হাসপাতাল, ভেতরে লণ্ঠনের আলো, দূরে ধাতব জগে পানীয় মেশাচ্ছেন এক তরুণ গবেষক। (প্রতীকী ছবি)
১৯৬৭ সালে ঢাকায় এলেন এক মার্কিন গবেষক, ডেভিড নালিন।
বয়স মাত্র ছাব্বিশ।
রেসিডেন্সির প্রথম বছর সবে শেষ হয়েছে।
পরের বছর, ১৯৬৮ সালে, চট্টগ্রামের কাছে মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল কলেরা।
নালিন আর তাঁর সহকর্মী রিচার্ড ক্যাশ সেখানে ছুটলেন।
কেমন ছিল সেই জায়গা?
• জঙ্গল কেটে বানানো একটা ছোট মিশনারি হাসপাতাল
• রোগীর ভিড় সামলাতে খাটানো তাঁবু
• হাতে সম্পদ প্রায় নেই
এই প্রতিকূলতার মধ্যেই চলল পরীক্ষা।
১৯৬৮ সালের এপ্রিলে নালিন গ্লুকোজ-লবণের দ্রবণ মুখে খাইয়ে রোগী সারালেন।
ক্যাশের সঙ্গে মিলে প্রায় দেড়শো রোগীকে চিকিৎসা করলেন।
প্রমাণ হলো:
সম্পদ কম থাকলেও মানুষ সুস্থ হয়ে ওঠে।
আগস্টে তাঁদের প্রতিবেদন ছাপা হলো ল্যানসেটে।
শিরোনাম: “প্রাপ্তবয়স্ক কলেরা রোগীর মুখে খাওয়ানো রক্ষণাবেক্ষণ চিকিৎসা।”
সেই গ্রীষ্মেই নালিন গেলেন কলকাতায়।
জনস হপকিন্সের গবেষণা কেন্দ্রে নিজের ফল জানাতে।
ঢাকার তাঁবু থেকে কলকাতার ল্যাব।
এই সংযোগটাই তিন বছর পর পৌঁছে যাবে এক শরণার্থী শিবিরে।
১৯৭১: যুদ্ধের মাঝখানে, বনগাঁয়

ছবি: ভোরের আলোয় শরণার্থী শিবিরের সারি সারি নিচু ছাউনি, পাতলা ধোঁয়া, আর ছোট কাপে পানীয় ঢালছেন এক স্বেচ্ছাসেবী। (প্রতীকী ছবি)
তারপর এল একাত্তর।
বনগাঁর শরণার্থী শিবিরে হাজার হাজার মানুষের ভিড়।
কলেরার ঢল থামছে না।
আর শিরায় দেওয়ার স্যালাইন ফুরিয়ে আসছে।
এমন সময় দিলীপ মহলানবীশ ও তাঁর দল হাতে তুলে নিলেন ঢাকা-কলকাতার সেই পুরোনো ধারণা:
লবণ, সোডা আর গ্লুকোজ মিশিয়ে বানানো পানীয়।
তাঁরা এর নাম দিলেন “মুখে খাওয়ানো স্যালাইন”।
নামটার মধ্যেও একটা বুদ্ধি ছিল।
মানুষ যেন বোঝে, এটাও সেই স্যালাইনই।
শুধু শিরায় নয়, মুখে।
কাগজে মিশ্রণ বানানোর নিয়ম লিখে সীমান্তজুড়ে বিলি করা হলো।
আর ঢাকার সেই গবেষণাগার?
যুদ্ধের ধাক্কায় সে নিজেই তখন বিপর্যস্ত।
• বিদেশি কর্মীরা চলে গেছেন
• অর্থ কমে এসেছে
• কাজ চলছে সংকুচিত আকারে
অথচ যে ধারণা এই ল্যাবের মাটিতে জন্মেছিল, সেটাই তখন যুদ্ধের শরণার্থীদের প্রাণ বাঁচাচ্ছে।
(এই গবেষণাগারই পরে পরিচিত হলো আইসিডিডিআর,বি নামে।)
কিন্তু গল্প এখানেও শেষ নয়
কারণ একটা সত্য আছে:
ল্যাবরেটরির আবিষ্কার আর মানুষের ঘরের অভ্যাস, এক জিনিস নয়।
আশির দশকে বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ ছিল ডায়রিয়া।
আর হাসপাতাল? অধিকাংশ গ্রাম থেকে অনেক দূরে।
এই ফাঁকটা ভরাট করতে এগিয়ে এল ব্র্যাক।
১৯৮০: ওষুধ বানানো হবে রান্নাঘরে
১৯৮০ সালে ব্র্যাক শুরু করল ওরাল থেরাপি এক্সটেনশন প্রোগ্রাম, সংক্ষেপে ওটেপ।
তাদের প্রস্তাবটা ছিল আশ্চর্য রকম সহজ:
প্যাকেটের স্যালাইনের অপেক্ষায় থেকো না। ওষুধ বানাও নিজের রান্নাঘরেই।
উপকরণ কী?
• লবণ
• গুড়
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই যা মেলে।
নাম হলো লবণ-গুড়ের স্যালাইন।
ব্র্যাকের কর্মীরা ঘরে ঘরে গেলেন।
মায়েদের হাতে ধরে শেখালেন:
• মাপ কেমন হবে
• কীভাবে মেশাতে হবে
• কখন খাওয়াতে হবে
আর শেখানোর ব্যাপারটা ছিল গুরুতর।
কর্মীর বেতন নির্ভর করত মায়েরা কতটা ভালো শিখলেন, তার ওপর।
কেবল বলে গেলেই দায়িত্ব শেষ, এমন নয়।

ছবি: মাটির মেঝের এক গ্রামের ঘরে একজন স্বাস্থ্যকর্মী এক মাকে জলে লবণ আর গুড় মেশানো শেখাচ্ছেন, পাশে ছোট শিশু। (প্রতীকী ছবি)
ফলাফল?
এক দশকের মধ্যে কর্মসূচিটা পৌঁছে গেল এক কোটিরও বেশি মায়ের কাছে।
এ ধরনের কর্মসূচির মধ্যে এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বলে গণ্য হয়।
পরে একটা জরিপে দেখা গেল, নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়ও ৭০ শতাংশের বেশি মা নির্ভুলভাবে এই দ্রবণ বানাতে পারেন।
আর আরেকটা চমকপ্রদ তথ্য:
তাঁদের একটা বড় অংশ ওটেপের সময় নেহাতই কিশোরী ছিলেন।
মানে, জ্ঞানটা শুধু একটা প্রজন্মে আটকে থাকেনি।
এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে হেঁটে গেছে।
একটা বৃত্ত, যা শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হলো
একবার পথটা মনে মনে ফিরে দেখুন:
কলকাতা → ঢাকা → চট্টগ্রামের জঙ্গল → বনগাঁর শিবির → গ্রামের রান্নাঘর
পুরোটাই বাংলার পথ।
১৯৫৩ সালের সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এল কোনো বড় হাসপাতালে নয়।
এল সেই মায়েদের হাতে, যাঁরা একদিন কেবল ভাবতেন, কলেরা তাঁদের সন্তানকে নিয়ে যাবেই।
হেমেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় হয়তো কোনোদিন জানতেও পারেননি, তাঁর ফেলে-রাখা প্রশ্ন কীভাবে একটা দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল।
যে আবিষ্কার ভুল ছিল না, শুধু একটু বেশি আগে এসেছিল
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন অনেক আবিষ্কার ঘুরে বেড়ায়।
ভুল ছিল না।
শুধু বেশি আগে এসেছিল।
ল্যানসেট পরে এই চিকিৎসাকে ওই শতাব্দীর সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-অগ্রগতি বলে আখ্যা দিয়েছিল।
কিন্তু আমাদের কাছে এর আসল পরিচয় আরও সাধারণ।
এটা এক চিমটি লবণ আর এক মুঠো গুড়ের ইতিহাস।
যা মায়ের হাত থেকে সন্তানের ঠোঁটে পৌঁছেছিল।
তথ্যসূত্র
১. Chatterjee HN. Control of vomiting in cholera and oral replacement of fluid. Lancet. 1953;ii:1063.
২. Nalin DR, Cash RA, Islam R, Molla M, Phillips RA. Oral maintenance therapy for cholera in adults. Lancet. 1968;2:370–373.
৩. Mahalanabis D, et al. Oral fluid therapy of cholera among Bangladesh refugees. Johns Hopkins Medical Journal. 1973;132:197–205.
৪. “How icddr,b turned a Cold War laboratory into a global lifesaving institution.” The Business Standard
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬

Leave a comment