লেখক: মো. ইফতেখার হোসেন | সম্পাদকীয় পর্যালোচনায়: মো. মঞ্জুরুল ইসলাম | তথ্য যাচাই: মো. ইফতেখার হোসেন
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৪ | সর্বশেষ হালনাগাদ: ২২ অক্টোবর ২০২৬
বিকেল পাঁচটা।
অফিস ছুটির পর মোড়ের দোকানের ফ্রিজটা খুলতেই ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা।
ভেতরে সারি সারি বোতল।
হাতটা এক মুহূর্ত থেমে যায়।
লাল ক্যান, নাকি রুপালি ক্যান?
চিনি, নাকি “ডায়েট”?
ছোট্ট একটা আপস
বিকেলের আড্ডায়, ইফতারের টেবিলে বা রাস্তার মোড়ের দোকানে হাত বাড়িয়ে ঠান্ডা বোতলটা তোলার সময়, আমাদের অনেকেই মনে মনে একটা ছোট্ট আপস করে নিই।
“চিনি তো নেই, ডায়েট!”
পাশ থেকে কেউ হয়তো ভুরু কুঁচকে বলেন:
“ওসব কৃত্রিম মিষ্টি বিষের সমান, সোজা জল খাও।”

ছবি: দোকানের খোলা ফ্রিজের সামনে একটি হাত লাল আর রুপালি ক্যানের মাঝে দ্বিধায় থেমে আছে। (প্রতীকী ছবি)
একদিকে সুবিধার সান্ত্বনা।
অন্যদিকে বিশুদ্ধতার শাসন।
এই টানাপোড়েনে বহু বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মন।
আর তার পাশে চলছে বিজ্ঞানীদের নিরন্তর বিতর্ক।
সম্প্রতি এক দীর্ঘ পরীক্ষা সেই বিতর্কে নতুন একটি তথ্য যোগ করেছে।
১০৪ সপ্তাহের এক পরীক্ষা
পরীক্ষাটি চলেছে ১০৪ সপ্তাহ ধরে।
মানে পুরো দুই বছর।
এটি ছিল র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের এলোমেলোভাবে দুই দলে ভাগ করা হয়েছিল।
• এক দলকে বলা হলো কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয় খেতে
• অন্য দলকে বলা হলো জল

ছবি: কাটা-দাগ দেওয়া সাপ্তাহিক ক্যালেন্ডারের পাশে এক গ্লাস জল ও এক গ্লাস ডায়েট পানীয়, সঙ্গে খাতা-কলম। ছবির লেখা: “১০৪ সপ্তাহ। দুটি দল। একটি প্রশ্ন।” (প্রতীকী ছবি)
দুই দলই ছিলেন একটি আচরণগত ওজন-নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ।
দুই দলের ফল পাশাপাশি রাখলে ছবিটা প্রায় এক।
ডায়েট পানীয়ের দলের ওজন কমার ধরন জল-দলের প্রায় একই রকম।
পরীক্ষা শেষ করা মানুষদের মধ্যে ডায়েট পানীয়ের দলটি শুরুর ওজন থেকে গড়ে ৪.৮ কেজি কমিয়েছেন।
আর পানীয়ের তালিকা ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়:
• ডায়েট কোলা
• গ্যাসযুক্ত পানীয়
• ফলের স্বাদের পানীয়
• ফ্লেভার্ড ওয়াটার
যাতে মিষ্টি এসেছে অ্যাসপার্টেম, অ্যাসেসালফেম পটাশিয়াম বা সুক্রালোজ থেকে।
গল্পের আসল বাঁক
এই ওজন ঝরার গল্পের একটি আকর্ষণীয় বাঁক আছে।
বেশির ভাগ ওজন কমেছে প্রথম তিন মাসে।
যখন সাপ্তাহিক আচরণগত সেশনের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে ওজন কমানোর চেষ্টা চলছিল।
এই তিন মাসের উদ্যম ফুরোলে শুরু হয় আসল পরীক্ষা।
বাকি দুই বছরের লড়াইটা ছিল হারানো ওজন ফিরে না আসতে দেওয়ার।
যাঁরা ওজন কমানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁরা জানেন:
কমানোর চেয়ে ধরে রাখা কত কঠিন।
আর সেই দীর্ঘ পথে ডায়েট পানীয় তাঁদের কোনো পিছুটান হয়ে দাঁড়ায়নি।
সেটাই এই গবেষণার সবচেয়ে মূল্যবান বার্তা।
ডায়েট পানীয় জলের চেয়ে ভালো, এমন কথা এখান থেকে বেরোয় না।
যাঁরা আগে থেকেই ডায়েট পানীয় খেয়ে ওজন সামলাতে চান, তাঁদের জন্য দুই বছরে জলে ফিরে যাওয়া বাড়তি কোনো উন্নতি আনেনি।
কথাটা বরং এই যে, চিনিভরা পানীয় ছেড়ে ডায়েট পানীয়ে সরে এলে ওজন-নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন ভেঙে পড়ে না।
এবার আসি আমাদের উঠোনে
বাংলাদেশে চা মানেই চিনি, দুধ, কখনো কনডেন্সড মিল্ক।
ইফতারে লাল শরবত।
লাচ্ছি।
ঘোল।
বোতলের কোলা।
রাস্তার ধারের আখের রস।
সবই আমাদের পানীয়-সংস্কৃতির অংশ।
গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, বাংলাদেশে বেশির ভাগ মানুষ চা-কফিতে চিনি মিশিয়ে খেতেই অভ্যস্ত।
এই অভ্যাসের পেছনে আছে এক নীরব অঙ্ক।
তরল ক্যালরি আমাদের পেট ভরায় কম, অথচ শরীরে জমে বেশি।
এক বেলা ভাত খেয়ে আপনি যেমন তৃপ্ত হন, এক গ্লাস শরবত খেয়ে তেমন তৃপ্ত হন না।
অথচ ক্যালরির হিসাবে ফারাক হয়তো খুব কম।
সংখ্যাগুলো কী বলছে
আমাদের স্বাস্থ্যের পরিসংখ্যান এই হিসাবকে আরও জরুরি করে তোলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের স্টেপস জরিপে:
• প্রায় ২০.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক অতিরিক্ত ওজনের
• ৫.৫ শতাংশ স্থূলতায় ভুগছেন
• ডায়াবেটিসের হার প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি
আরেকটি গবেষণার তথ্য আরও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত দেয়।
২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নারীদের মধ্যে স্থূলতা প্রায় তিনগুণ হয়েছে।
পুরুষদের মধ্যে দেড়গুণ।
সংখ্যাগুলো ভিন্ন জরিপের, তাই সরাসরি মেলানো যায় না।
কিন্তু প্রবণতা একই দিকে।
দেশ ক্রমে এক নীরব মেটাবলিক বোঝার দিকে এগোচ্ছে।
রাষ্ট্রও টের পেয়েছে
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কার্বোনেটেড পানীয় উৎপাদকদের টার্নওভার করের ন্যূনতম হার ৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে তোলার কথা এসেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিনিযুক্ত পানীয় নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ছয় দেশের একটি বলেছে।
যদিও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখলে করের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও সতর্ক করেছে।
আর দাম বাড়লে সত্যিই কি মানুষ কম খায়?
বাংলাদেশের ঘরোয়া আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে:
সফট ড্রিঙ্কের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে ক্রয় প্রায় ১১.৭ শতাংশ কমতে পারে।
তবে শুধু কর দিয়ে অভ্যাস বদলানো যাবে না।
বিশেষজ্ঞেরাও বলেছেন, কেবল কর বাড়ানো যথেষ্ট নয়।
বদলাতে হবে মানুষের পছন্দ।
আর বিকল্পের সহজলভ্যতা।

ছবি: দোকানের তাকে সারি সারি ক্যানের ওপরে দামের ট্যাগ ও ঊর্ধ্বমুখী তীর, পেছনে ঢাকার অস্পষ্ট রাস্তা। ছবির লেখা: “দাম ১০% বাড়লে ক্রয় কমে ১১.৭%” (প্রতীকী ছবি)
এইখানেই ডায়েট পানীয়ের কথাটা আসে
ধরুন, একজন মানুষ রোজ অফিস থেকে ফেরার পথে দুই-তিনটি চিনিভরা বোতল শেষ করেন।
তাঁকে একদিনে সাদা জলে সরে যেতে বলা অনেক সময় অবাস্তব দাবি।
তাঁর জন্য শূন্য-চিনির বিকল্প একটি মধ্যবর্তী সেতু হতে পারে।
এবং এই গবেষণা বলছে, সেই সেতুটা ওজন-নিয়ন্ত্রণের পথ ভেঙে দেয় না।
তবে এটি সেতুই, গন্তব্য নয়।
আর জল যে সবচেয়ে নির্ভেজাল সঙ্গী, সে কথা আগের জায়গাতেই অটুট।
তবু বিজ্ঞানকে এক ঢোকে গিলে ফেলা ঠিক নয়
সতর্ক থাকার কয়েকটি কারণ আছে:
• এই মানুষেরা একটি নিয়ন্ত্রিত কর্মসূচির ভেতর ছিলেন, যেখানে নিয়মিত সেশন আর নজরদারি ছিল
• আমাদের জীবন তার চেয়ে ঢের এলোমেলো
• ডায়েট ড্রিঙ্ক মানেই স্বাস্থ্যকর, এমন প্রমাণও এখান থেকে মেলে না
• এই গবেষণা শুধু ওজন-নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি অন্য সব প্রশ্নের নয

ছবি: একটি পানীয়ের বোতলের লেবেলের ওপর আতশকাচ ধরে আছে একটি হাত, পাশে ল্যাবের খাতা। ছবির লেখা: “প্রমাণ আছে, তবে সীমা আছে” (প্রতীকী ছবি)
আর এর চেয়েও গভীর একটি কথা আছে:
ডায়েট বোতলের মোড়কে লুকানো থাকতে পারে আমাদের একটি পুরোনো বিশ্বাস।
যে সমস্যার সমাধান আছে কোনো একটি জাদুর বোতলে।
অথচ আসল সমাধান লুকিয়ে আছে:
• অভ্যাসের ধারাবাহিকতায়
• খাবারের পরিমাণে
• আর শরীরের নড়াচড়ায়
পরের বার বোতলের দিকে হাত বাড়ালে
আসলে, যখন আপনি বোতলের দিকে হাত বাড়াবেন, নিজেকে অপরাধী ভাবার দরকার নেই।
আবার ডায়েট লেবেল দেখে নিজেকে নিশ্চিন্ত ভাবারও দরকার নেই।
নিজেকে শুধু একটি প্রশ্ন করুন:
এই বোতলটি কি আমার অভ্যাসের শৃঙ্খল ভাঙছে, নাকি নতুন কোনো নামে সেটিকেই টিকিয়ে রাখছে?
তথ্যসূত্র
১। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস, স্টেপস জরিপ ২০১৮ ও চিনিযুক্ত পানীয়ের করনীতি প্রতিবেদন।
২। বিএমসি পাবলিক হেলথ (BMC Public Health), হক ও সহযোগীদের গবেষণা, ২০২৪।
৩। কোক্রেন লাইব্রেরি (Cochrane Library), চিনিযুক্ত পানীয়ের কর নিয়ে পর্যালোচনা।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২২ অক্টোবর ২০২৬

Leave a comment