এআই প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের অনুভূতি এখন দুই চরমে দুলছে—একদিকে বিস্ময়, অন্যদিকে ভয়। কেউ ভাবছেন, এআই সব সমস্যার সমাধান করবে; কেউ আবার ভাবছেন, এআই মানুষের জন্য ভয়ংকর হবে। ড. আলিমুর রেজা এই আলোচনাকে আবেগের জায়গা থেকে টেনে আনেন বাস্তবতার জায়গায়। তিনি বলেন, এআই অনেকটা প্যান্ডোরাস বক্সের মতো—একবার খুলে গেলে আর আগের মতো বন্ধ করে রাখা যায় না। অর্থাৎ “আমরা এআই বানানো বন্ধ করে দিলাম” —এটা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ আপনি থামলে আপনার প্রতিযোগী থামবে না। তাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হলো এআইকে দায়িত্বশীলভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া।
প্যান্ডোরাস বক্সের উপমাটি এখানে শুধু সাহিত্যিক অলংকার নয়—এটি প্রযুক্তির প্রকৃত স্বভাব বোঝায়। এআই হলো এমন এক ধরনের প্রযুক্তি, যা একবার তৈরি হয়ে গেলে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সফটওয়্যার কপি করা সহজ, প্রশিক্ষিত মডেল ছড়িয়ে দেওয়া সহজ, এবং নতুন নতুন ব্যবহারক্ষেত্র তৈরি করাও সহজ। ফলে কেউ একজন একটি শক্তিশালী টুল বানালে সেটি খুব দ্রুত নানা জায়গায় পৌঁছে যায়—ভালো কাজেও, খারাপ কাজেও। তাই ঝুঁকি কমাতে “প্রযুক্তি বন্ধ” নয়, “প্রযুক্তির ব্যবহারকে শৃঙ্খলায় আনা”—এই লক্ষ্যটিই বেশি জরুরি।
ড. আলিমুর রেজার বক্তব্যে নিয়ন্ত্রণ বলতে কোনো একক পুলিশি নিয়ন্ত্রণ বোঝায় না। বরং তিনি ইঙ্গিত দেন একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার দিকে—যেখানে প্রযুক্তি উন্নয়ন হবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে জবাবদিহিতা, নিরাপত্তা, এবং নৈতিক সীমারেখা। এই জায়গায় তিনি মানুষের “কনশাস” বা সচেতন হওয়ার কথাও বলেন। সচেতনতা মানে শুধু ব্যবহারকারীর সচেতনতা নয়; গবেষক, কোম্পানি, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাব্যবস্থা—সবার ভূমিকা আছে।
এই আলোচনা আরও গভীর হয় যখন তিনি এআই ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষকের ভিন্নমত উল্লেখ করেন। ড. আলিমুর রেজা জেফ্রি হিন্টনের কথাও টানেন—যিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তার কথা বলেন। তার মতে, সামনে কী ঘটবে তা অনেকটাই কুয়াশার মতো—আপনি কাছে না গেলে দূরটা দেখা যায় না। অর্থাৎ এআই দ্রুত বদলাচ্ছে, কিন্তু এই পরিবর্তনের শেষ গন্তব্য আমরা এখনও পরিষ্কারভাবে জানি না। আবার ইয়ান লেকুনের মতো গবেষকরা তুলনামূলক আশাবাদী—তারা মনে করেন এআইকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে ভবিষ্যতে তা মানুষের জন্য বড় উপকার আনতে পারে। ড. আলিমুর রেজা এই দুই মতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মূল কথাটি স্পষ্ট করেন: অনিশ্চয়তা থাকলেও দায়িত্বশীল পথ খোলা আছে, এবং সেই পথ হলো নিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন।
নিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন বলতে কী ধরনের কাজ বোঝায়, তা শিক্ষার্থীদের ভাষায় বলা যায় এভাবে। ধরুন আপনি একটি শক্তিশালী রাসায়নিক পদার্থ পেয়েছেন। আপনি সেটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করলে চিকিৎসায় ও শিল্পে উপকার হারাবেন; আবার নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ছেড়ে দিলে দুর্ঘটনা বাড়বে। তাই দরকার নিয়ম—কে ব্যবহার করবে, কীভাবে ব্যবহার করবে, কী নিরাপত্তা থাকবে, ভুল হলে কী ব্যবস্থা হবে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। মডেল তৈরি হবে, কিন্তু পরীক্ষা হবে; সীমা নির্ধারিত হবে; অপব্যবহার ঠেকাতে নিয়ম হবে; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানুষকে শেখানো হবে কীভাবে যাচাই করতে হয়, কীভাবে ভুল তথ্য ধরা যায়, কীভাবে প্রযুক্তির ওপর অন্ধ বিশ্বাস না রেখে যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কথাটি আরও জরুরি। আমাদের দেশে প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করা হয়, কিন্তু অনেক সময় সুরক্ষা, নীতিমালা, এবং ডিজিটাল সচেতনতা পিছিয়ে থাকে। ফলে এআই-ভিত্তিক প্রতারণা, ভুয়া কনটেন্ট, এবং ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মতো সমস্যা বড় হতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের অর্থ দাঁড়ায়—স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই এআই শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা ও নিরাপত্তা যুক্ত করা। আপনি যদি আজ এআই শিখতে শুরু করেন, তাহলে শুধু “মডেল চালানো” নয়—“দায়িত্ব নিয়ে চালানো”—এটাই হবে আপনার সবচেয়ে বড় দক্ষতা।
ড. আলিমুর রেজার এই বক্তব্য আসলে একটি পরিপক্ব দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়: প্রযুক্তিকে ভয় পেয়ে থামিয়ে দেওয়া নয়, আবার চোখ বন্ধ করে গ্রহণও নয়। বরং প্রযুক্তিকে বুঝে, ঝুঁকি চিনে, এবং সমাজের কল্যাণের জন্য নিয়ন্ত্রণ করে এগোনোই সবচেয়ে বাস্তব ও মানবিক পথ। আপনি যদি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথে হাঁটতে চান, এই ভারসাম্যবোধই আপনার যাত্রার সবচেয়ে জরুরি সঙ্গী।
পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Leave a comment