কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারোবটিক্স

মানুষের হস্তক্ষেপ কমিয়ে রোবটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে শেখানোই এআই গবেষণার বড় লক্ষ্য —ড. আলিমুর রেজা

Share
Share

জাপানের রোবট-রেস্টুরেন্ট বা স্বয়ংক্রিয় ডেলিভারি রোবটের ভিডিও আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই দেখেন। রোবট ট্রে হাতে খাবার নিয়ে যাচ্ছে, নির্দিষ্ট টেবিলে থামছে, আবার ফিরে আসছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, রোবট বুঝি একাই সব করছে। কিন্তু ড. আলিমুর রেজা এই জায়গাটিতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনেন: এসব ব্যবস্থা অনেক সময় পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় নয়; এর মধ্যে মানুষের নির্দেশনা, পর্যবেক্ষণ, কিংবা সহায়তা কাজ করে। অর্থাৎ রোবট চলেছে ঠিকই, কিন্তু “নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে সব কাজ করা”—এই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

ড. আলিমুর রেজার ভাষায়, এআই গবেষণার বড় লক্ষ্য হলো এমন একটি কমপ্লিটলি অটোনমাস এজেন্ট তৈরি করা, যা ন্যূনতম মানব হস্তক্ষেপে নিজের কাজ নিজেই করতে পারবে। অটোনমাস এজেন্ট বলতে বোঝায় এমন একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা (রোবট বা সফটওয়্যার) যা পরিবেশকে বুঝে সিদ্ধান্ত নেয় এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করে। আপনি একে এমন একজন সহকারী হিসেবে ভাবতে পারেন, যাকে বারবার বলে দিতে হয় না “এখন এটা কর, তারপর ওটা কর”; বরং সে কাজের লক্ষ্য বুঝে নিজে নিজে পরিকল্পনা করে এগোয়।

এই লক্ষ্যটি কেন এত কঠিন, তা বোঝার জন্য একটি দৈনন্দিন তুলনা যথেষ্ট। ধরুন, আপনি কাউকে বললেন, “রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস পানি এনে দাও।” মানুষের জন্য এটি খুব সহজ—কারণ মানুষ জানে রান্নাঘর কোথায়, গ্লাস কেমন দেখতে, পানি কোথায় পাওয়া যায়, আর পথে যদি চেয়ার থাকে তাহলে পাশ কাটিয়ে যাবে। কিন্তু রোবটকে এই একই কাজ করতে দিলে তাকে বহু স্তরের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোন পথে যাবে, কোথায় বাধা আছে, সামনে যে বস্তুটা দেখা যাচ্ছে সেটা কি চেয়ার না টেবিল, গ্লাসটি কোন তাকের ওপর, গ্লাস ধরতে কতটা শক্তি লাগবে—এসব সিদ্ধান্তের জন্য রোবটকে দেখতে, বুঝতে, এবং কাজ করতে হয় একসাথে। একটি ছোট মানবিক কাজের পেছনেও রোবটের কাছে থাকে বিশাল “হিসাব-নিকাশ”।

এখানেই ড. আলিমুর রেজার গবেষণার মূল বিষয়গুলো এসে যুক্ত হয়। কম্পিউটার ভিশন (যন্ত্রকে ছবি/ভিডিও দেখে বুঝতে শেখানোর প্রযুক্তি) রোবটকে বলে দেয় পরিবেশে কী আছে। যেমন, সামনে মানুষ আছে কি না, দরজা কোথায়, দেয়াল কোথায়, পথ খালি কি না। সেমান্টিক সেগমেন্টেশন (ছবির প্রতিটি অংশকে ভাগ করে নাম দেওয়া) রোবটকে সাহায্য করে দৃশ্যকে মানচিত্রের মতো সাজাতে—এই অংশটি মেঝে, এই অংশটি দেয়াল, এই অংশটি বস্তু। আর ৩ডি রিকনস্ট্রাকশন (ছবি দেখে ত্রিমাত্রিক গঠন বের করা) রোবটকে দূরত্ব ও গভীরতা বুঝতে সহায়তা করে—কোন বাধা কত দূরে, কোথায় জায়গা ফাঁকা, কোন পথে গেলে ধাক্কা লাগবে না। এগুলো মিলে তৈরি হয় একটি ভিত্তি, যার উপর দাঁড়িয়ে স্বয়ংক্রিয় রোবট সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, পরিবেশ সব সময় একরকম থাকে না। আলো বদলায়, মানুষ চলাফেরা করে, বস্তু নড়াচড়া করে, নতুন বাধা আসে। মানুষ এসব পরিবর্তন খুব সহজে সামলে নেয়; রোবটের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই ড. আলিমুর রেজা যখন বলেন “মিনিমাম হিউম্যান ইন্টারভেনশন”, তিনি আসলে একটি মানদণ্ডের কথা বলেন—রোবটকে এমনভাবে তৈরি করা যাতে পরিস্থিতি বদলালেও সে বারবার থেমে না যায়, বারবার সাহায্য না চায়, এবং ভুল করলে নিজে সংশোধন করে সামনে এগোতে পারে।

এই আলোচনা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়, কারণ এতে বোঝা যায় রোবটিক্স কেবল যন্ত্র বানানো নয়; এটি একটি সমন্বিত বিজ্ঞান। এখানে গণিত লাগে, কারণ সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে হিসাব ও সম্ভাবনা। প্রোগ্রামিং লাগে, কারণ যুক্তি ও নির্দেশনা কোডে লিখতে হয়। ডেটা লাগে, কারণ মেশিন লার্নিং ডেটা থেকে শেখে। আর বাস্তব অনুশীলন লাগে, কারণ তত্ত্ব জানলেই হয় না—বাস্তব পরিবেশের জটিলতা সামলাতে হলে বারবার পরীক্ষা ও সংশোধন দরকার।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের দেশে ঘন জনবসতি, পরিবর্তনশীল পরিবেশ, এবং সীমিত অবকাঠামো—সব মিলিয়ে “বাস্তব দুনিয়ায় কাজ করতে পারে” এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি করা আরও চ্যালেঞ্জিং, আবার আরও প্রয়োজনীয়ও। ভবিষ্যতে হাসপাতাল, গুদাম, কৃষিক্ষেত, কিংবা দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় স্বয়ংক্রিয় রোবট সহায়তা দিতে পারলে মানুষের ঝুঁকি কমবে, কাজের গতি বাড়বে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ আসবে তখনই, যখন শিক্ষার্থীরা আজ থেকেই ‘দেখে বোঝা’, ‘পরিকল্পনা করা’, এবং ‘নিরাপদভাবে কাজ করা’—এই মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবতে শিখবে।

ড. আলিমুর রেজার কথায় তাই একটি স্পষ্ট পথনির্দেশ আছে: রোবটকে সত্যিকারের সহকারী বানাতে হলে তাকে মানুষের মতো করে “বুঝতে” শেখাতে হবে, আর সেই বোঝার ক্ষমতাকে বাস্তব পরিবেশে টেকসই করতে হবে। আপনি যদি আজ একটি ছোট প্রজেক্ট দিয়ে শুরু করেন—একটি সিমুলেটরে রোবটকে বাধা এড়িয়ে চলতে শেখানো, বা একটি ছবিতে মানুষ-দেয়াল আলাদা করা—তবেই ধীরে ধীরে বড় স্বপ্নের দিকে যাত্রা শুরু হবে।

পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org