অন্তর্দৃষ্টি আলাপনকৃষিবিজ্ঞান লেখক

“শুধু গবেষণা নয়, দেশের প্রয়োজনে দাঁড়ানোই বিজ্ঞানীর আসল দায়িত্ব”—ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

একজন বিজ্ঞানীর সাফল্য সাধারণত মাপা হয় তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্র, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ বা বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মাধ্যমে। কিন্তু এই একাডেমিক সাফল্যের বাইরে আরেকটি প্রশ্ন প্রায়ই অনালোচিত থেকে যায়—বিজ্ঞানীর সামাজিক দায়বদ্ধতা কোথায়? উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী মনে করেন, কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকা একজন বিজ্ঞানীর দায়িত্বের পূর্ণতা নয়। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “শুধু গবেষণা নয়, দেশের প্রয়োজনে দাঁড়ানোই বিজ্ঞানীর আসল দায়িত্ব।” এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানচর্চার এক মানবিক ও দায়িত্বশীল দর্শন।

একাডেমিক সাফল্য বনাম সামাজিক দায়

ড. আবেদ চৌধুরীর নিজের জীবনপথ এই দর্শনের একটি বাস্তব উদাহরণ। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করার সুযোগ তাঁর ক্যারিয়ারে অভাব ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের নামী গবেষণাগার থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থা—সবখানেই তাঁর গবেষণা স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু এই একাডেমিক সাফল্যের মাঝেও তিনি বারবার ফিরে তাকিয়েছেন বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার দিকে। বীজ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যখন তিনি দেখলেন, নিজের দেশেই ভালো মানের বীজের ঘাটতি কতটা ভয়াবহ, তখন তাঁর কাছে গবেষণার ফলাফল আর কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে একটি সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন।

অনেক সময় দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশের বিজ্ঞানীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পেয়ে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন, কিন্তু দেশের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে তাঁদের সংযোগ সীমিত থাকে। ড. আবেদ চৌধুরী এই প্রবণতাকে পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও মনে করেন, একজন বিজ্ঞানীর দায়িত্ব কেবল নিজের ক্যারিয়ার উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থাকলে সমাজ তার পূর্ণ সুফল পায় না। তাঁর মতে, যে সমাজ একজন বিজ্ঞানীকে গড়ে তোলে, সেই সমাজের প্রয়োজনে দাঁড়ানো নৈতিকভাবে বিজ্ঞানীর দায়িত্ব।

গবেষণা থেকে বাস্তব উদ্যোগের পথে

ড. আবেদ চৌধুরীর চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—গবেষণাগারে তৈরি জ্ঞান কীভাবে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানো যায়। বীজের জিনগত প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণা বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তিনি উপলব্ধি করেছেন যে বাংলাদেশের কৃষকের কাছে এই জ্ঞান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা ভালো মানের বীজ হিসেবে মাঠে পৌঁছাবে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বীজ সংকট সমাধানে বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগের কথা ভাবছেন। তাঁর ভাষায়, দেশের একটি মৌলিক চাহিদা আছে, আর সেই চাহিদার জায়গায় বিজ্ঞানীর কিছু করা উচিত।

এখানে বিজ্ঞানীর ভূমিকা কেবল গবেষক হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা বা পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবেও দেখা যায়। ড. আবেদ চৌধুরীর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞানী মানেই শুধু ল্যাবরেটরিতে বসে থাকা মানুষ নয়; বিজ্ঞানী সমাজের সমস্যাকে বোঝে এবং সমাধানের পথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে।

নৈতিক দায় ও ‘উদ্দেশ্যমূলক বিজ্ঞানচর্চা’

আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞানচর্চা অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে—কে বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করল, কে বড় প্রকল্পের তহবিল পেল—এসব সূচকে সাফল্য বিচার করা হয়। ড. আবেদ চৌধুরী এই সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞানচর্চার একটি উদ্দেশ্য থাকা জরুরি—মানুষের জীবনের মান উন্নত করা। বাংলাদেশের মতো দেশে কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশগত সমস্যাগুলো যেখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেখানে বিজ্ঞানীদের গবেষণার দিকনির্দেশনায় এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানকে কেবল জ্ঞানের চর্চা নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের একটি মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরে। এতে তরুণ বিজ্ঞানীদের কাছেও একটি ভিন্ন বার্তা পৌঁছে যায়—বড় গবেষণাগারে কাজ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দেশের বাস্তব সমস্যাকে বোঝা ও সমাধানে যুক্ত হওয়াও সমান মর্যাদার কাজ।

তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য দিকনির্দেশনা

ড. আবেদ চৌধুরীর বক্তব্য তরুণদের জন্য একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা। তিনি তরুণ বিজ্ঞানীদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দেন—বিশ্বমানের গবেষণা করা, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবে কাজ করা। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, নিজের দেশের প্রয়োজনকে ভুলে না যাওয়ার কথা। একজন বিজ্ঞানী যদি নিজের কাজের মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনে সামান্য হলেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন, তবে সেই বিজ্ঞানচর্চা আরও গভীর অর্থ পায়।

শেষকথা

“শুধু গবেষণা নয়, দেশের প্রয়োজনে দাঁড়ানোই বিজ্ঞানীর আসল দায়িত্ব”—এই বক্তব্য ড. আবেদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত দর্শন হলেও এর তাৎপর্য অনেক বিস্তৃত। এটি আমাদের বিজ্ঞানচর্চার দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। গবেষণাগারের অর্জন যখন মাঠের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, তখনই বিজ্ঞান সত্যিকার অর্থে সমাজের সম্পদে পরিণত হয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য এই দর্শন হতে পারে এক শক্তিশালী পথনির্দেশ।Dr. Abed Chaudhury emphasizes that a scientist’s true responsibility goes beyond research—serving society and addressing national needs is equally গুরুত্বপূর্ণ.

ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org