কর্মক্ষেত্রে সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে পরিবেশের ওপরও। যেখানে মানুষ নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারে, সেখানে নতুন চিন্তার জন্ম হয়। ড. কাজী হোসেন কানাডায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে এমনই একটি কর্মসংস্কৃতির কথা বলেন, যা সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের কর্মপরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
কানাডার সরকারি প্রতিষ্ঠানে তার কাজের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, সিনিয়র–জুনিয়র সম্পর্ক কর্তৃত্বনির্ভর নয়। বসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা এখানে অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং মতভিন্নতা সিদ্ধান্তকে আরও পরিপক্ব করে তোলে। কেউ কারো সঙ্গে দ্বিমত করলে তা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখা হয় না; বরং কাজের স্বার্থে প্রয়োজনীয় আলোচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে কর্মীদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয় না, বরং দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
এই সহযোগিতামূলক পরিবেশের আরেকটি দিক হলো “ওপেন ডোর পলিসি”। অর্থাৎ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দরজা সবসময় খোলা—কোনো সমস্যা বা নতুন ধারণা থাকলে সরাসরি আলোচনা করা যায়। আনুষ্ঠানিকতা কম থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর হয়। ড. কাজী হোসেনের মতে, এতে কর্মীরা নিজেদের কাজের মালিকানা অনুভব করে এবং প্রতিষ্ঠানও লাভবান হয়।
তবে এই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও যুক্ত। কে কোন দায়িত্বে কী ফল দিচ্ছে—তার নিয়মিত মূল্যায়ন হয়। অর্থাৎ সহযোগিতা মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং দায়িত্বকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া। কর্মীরা জানেন, তাদের কাজের মান ও সিদ্ধান্তের প্রভাব প্রতিষ্ঠান ও সমাজে পড়বে। এই ভারসাম্যই কানাডার কর্মসংস্কৃতির অন্যতম শক্তি।
বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে অনেক সময় সিনিয়র–জুনিয়র সম্পর্ক অতিমাত্রায় আনুষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। জুনিয়ররা ভিন্নমত প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, আবার সিনিয়ররা প্রশ্নকে অনেক সময় ব্যক্তিগত আঘাত হিসেবে নেন। এতে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ কমে যায়। ড. কাজী হোসেন মনে করেন, মতভিন্নতা মানে অশ্রদ্ধা নয়। বরং যুক্তি দিয়ে আলোচনা করলে সিদ্ধান্ত আরও শক্তিশালী হয়।
এই সহযোগিতার সংস্কৃতি শিক্ষাব্যবস্থাতেও প্রযোজ্য। ক্লাসরুমে শিক্ষার্থী যদি প্রশ্ন করতে ভয় পায়, তবে শেখার গভীরতা কমে যায়। শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকলে শিক্ষার্থীর চিন্তার পরিধি বাড়ে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাঙ্গনে এই উন্মুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে সমাজে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি তৈরি হবে।
ড. কাজী হোসেনের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায়, সফল প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে কেবল নিয়মকানুন দিয়ে নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মতবিনিময় ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ে। এই শিক্ষা যদি আমরা নিজেদের কর্মপরিবেশে প্রয়োগ করতে পারি, তবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—দুয়েরই বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. কাজী হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment