সম্পাদকীয়

অবহেলার অন্ধকার থেকে কালজয়ের উপাখ্যান

Share
Share

তখন আমি অনার্সে পড়ি। আমার বিষয় ছিল রাসায়নিক প্রকৌশল, কিন্তু কেন জানি জীববিজ্ঞানের প্রতি আলাদা একটি টান অনুভব করতাম। সেই আগ্রহ থেকেই কুষ্টিয়ার একটি স্বনামধন্য স্কুল, স্কুল অব লরিয়েটস ইন্টারন্যাশনাল, এ রসায়নের ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছুদিন জীববিজ্ঞানের ক্লাসও নিয়েছিলাম। এমনই একটি ক্লাসে পাঠদানের জন্য হাজির হতেই শিক্ষার্থীরা হঠাৎ গল্প শোনার আবদার করে বসল। সাধারণত ক্লাসে গল্প বলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল, তবে আমি এটাও বুঝতাম যে মাঝেমধ্যে গল্প ক্লাসের একঘেয়েমি কাটাতে ক্যাফেইনের মতো কাজ করে। তাই আমি একটি অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলাম, শিক্ষার্থীরা আবদার করলেই পাঠের সঙ্গে সম্পর্কিত গল্প বলতাম। সেদিনও শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কী গল্প শুনতে চায়। তারা জানাল, একদিন আমি তাদের বলেছিলাম যে আমার জীবনের লক্ষ্য গবেষণা সেক্টরে কাজ করা। এখন তারা জানতে চায়—কেন?

আমি বললাম, “এই পৃথিবীতে বিজ্ঞানীদের জীবন আমার কাছে সবসময়ই এক ধরনের রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় মনে হয়। তাঁরা রাতদিন নিরলস পরিশ্রম করে পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তুলতে এবং আমাদের জীবনকে সহজ করতে কাজ করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক বিজ্ঞানীই তাঁদের প্রাপ্য স্বীকৃতি পান না। কালের গর্ভে হারিয়ে যায় তাঁদের নাম। অথচ তাঁদের আবিষ্কৃত পথ অনুসরণ করেই হয়তো অন্য কেউ চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেন, আর আমরা সেই মানুষটিকেই চিনি। আবার অনেক সময় সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের প্রতিযোগিতায়ও অনেকে পিছিয়ে পড়েন।”

উদাহরণ হিসেবে আমি বললাম, “রেডিওর প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, কিন্তু সময়মতো গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে না পারায় ‘রেডিওর জনক’ হিসেবে পরিচিতি পান গুলিয়েলমো মার্কনি। আবার নিকোলা টেসলা এসি (AC) কারেন্টের মতো বিপ্লবী ধারণা দিলেও বাস্তবায়নে পিছিয়ে পড়েন টমাস আলভা এডিসন-এর খ্যাতি ও ব্যবসায়িক কৌশলের কারণে। ফলশ্রুতিতে তাঁর নাম অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়। আবার এমনও বিজ্ঞানী আছেন, যারা জীবদ্দশায় তাদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি পাননি, যেমন আমেদেও অ্যাভোগাদ্রো বা গ্রেগর জোহান মেনডেল।”

এই পর্যন্ত বলে আমি কিছুক্ষণ থামলাম। শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তারা এখন অন্তত এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে একজনের গল্প শুনতে আগ্রহী। আমার মধ্যেও ততক্ষণে গল্প বলার নেশা কাজ করতে শুরু করেছে। তাই আর দেরি না করে শুরু করলাম জিনতত্ত্বের জনক গ্রেগর জোহান মেনডেল-এর গল্প, কারণ এই সম্পর্কিত একটি অধ্যায় তাদের বইয়েও আছে।

সাল ১৮২২-শুরুর গল্প

অস্ট্রিয়ার একটি গ্রামে (বর্তমান হিনচিৎসে, চেক প্রজাতন্ত্র) বাস করতেন মেনডেল দম্পতি, আন্টন ও রোজিনে মেনডেল। তারা মেনডেল পরিবারের মালিকানাধীন প্রায় ১৩০ বছরের পুরোনো একটি খামারে বসবাস করতেন এবং সেখানেই কাজ করতেন। তাদের একটি কন্যাসন্তান ছিল। এই বছর তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান, যার নাম রাখা হয় জোহান মেনডেল। পরবর্তীতে তার আরেকটি বোনের জন্ম হয়। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের স্নেহে বেড়ে ওঠা মেনডেল বাগানে কাজ করতেন এবং পাশাপাশি মৌমাছি প্রতিপালন সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করেন, যা পরবর্তীতে তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মেনডেলের বাসস্থান। Hynčice, Czech Republic (সূত্র: সংগৃহীত)

সাল ১৮৪৩-সংগ্রামের পথচলা

মেনডেলের শিক্ষাজীবন মোটেও সহজ ছিল না। ১৮৪০ থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি অলোমোউৎস বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Olomouc) দর্শন ও পদার্থবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তাকে এক বছর বিরতি নিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় পড়াশোনার খরচ চালানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তিনি একই বছর যাজকত্ব গ্রহণ করেন। ধর্মীয় জীবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে নিজের নামের আগে “গ্রেগর” যুক্ত করেন এবং এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন গ্রেগর জোহান মেনডেল।

জীনতত্ত্বের জনক গ্রেগর জোহান মেনডেল (১৮২২-১৮৮৪ খ্রিঃ) (সূত্র: সংগৃহীত)

সাল ১৮৫১-ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা

এই বছর তাকে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয় উচ্চশিক্ষার জন্য, যাতে তিনি আরও আনুষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। এর আগে তিনি চার্চের একটি হাইস্কুলে বদলি শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন কারণ ১৮৫০ সালে স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার মৌখিক অংশে তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

সাল ১৮৫৬-গবেষণার সূচনা

স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি আবারও মৌখিক অংশে ব্যর্থ হন যদিও এরই মধ্যে তিনি ১৮৫৩ সালে পদার্থবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তবে এই বছরটি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। কারণ, এই বছর থেকেই তিনি তার গবেষণা যাত্রা শুরু করেন। চার্চের প্রায় ৫ একর জমিতে তিনি একটি পরীক্ষামূলক বাগান তৈরি করেন। সেখানে প্রায় ৩৪ প্রজাতির ২৮,০০০ মটরশুঁটি গাছ চাষ করেন এবং তাদের মধ্যে সংকরায়নের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করেন। তার গবেষণার পথ কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। চার্চের প্রধান তার গবেষণার প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেননি; বরং অনেকটা উপেক্ষা করেছিলেন। তবে তাকে গুরুত্বপূর্ণভাবে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন পোলিশ প্রকৃতিবিদ আলেকজান্ডার জাওয়াদজকি।

আলেকজান্ডার জাওয়াদজকির (১) সাথে গ্রেগর জোহান মেনডেল (২)। (সূত্র: সংগৃহীত)

সাল ১৮৬৬-অবহেলিত আবিষ্কার

অবশেষে দীর্ঘ সাত বছরের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় Verhandlungen des naturforschenden Vereines in Brünn জার্নালে। এর আগে ১৮৬৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ও ৮ মার্চ তিনি তার গবেষণাপত্র “Experiments on Plant Hybridization” শীর্ষক কাজটি উপস্থাপন করেছিলেন। তবে এই যুগান্তকারী আবিষ্কার বিজ্ঞানীমহলে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। সে সময় অধিকাংশ জীববিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন ‘blending inheritance’ ধারণায়—অর্থাৎ পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য মিশ্রিত হয়ে সন্তানের মধ্যে প্রকাশ পায়। ফলে মেনডেলের কাজকে অনেকেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং বংশগতির পরিবর্তে কেবল সংকরায়ন হিসেবে বিবেচনা করেন। এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক, পরবর্তী ৩৫ বছরে তার গবেষণাপত্রটি মাত্র তিনবার উদ্ধৃত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তখনও DNA-এর গঠন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই মেনডেল তার গবেষণায় “ফ্যাক্টর” বা “বৈশিষ্ট্য” শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, যা পরবর্তীতে জিন হিসেবে পরিচিত হয়।

১৮৬২ সালে প্যারিস ও লন্ডনে ভ্রমণরত মেনডেল। (সূত্র: সংগৃহীত)

সাল ১৮৮৪-স্বীকৃতি ছাড়াই বিদায়

৬ জানুয়ারি—নিজের কাজের কোনো স্বীকৃতি না পেয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই মহান বিজ্ঞানী। দীর্ঘদিন কিডনি রোগে ভোগার পর তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি সেন্ট থমাস মঠের অ্যাবট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুঃখজনকভাবে, তার জীবদ্দশায় তার বৈজ্ঞানিক অবদান তেমন স্বীকৃতি পায়নি; তিনি মূলত একজন ধর্মযাজক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

বাগানে কর্মরত মেনডেল

সাল ১৯০০-যুগান্তকারী সূত্রের স্বীকৃতি

বসন্তকাল। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে তিনজন বিজ্ঞানী, হুগো দ্য ভ্রিস, কার্ল করেন্স এবং এরিখ ফন শেরমাক, স্বাধীনভাবে গবেষণা করে একই ধরনের ফলাফল পান। তারা প্রত্যেকেই মেনডেলের অগ্রাধিকার স্বীকার করেন। এমনও ধারণা করা হয় যে দ্য ভ্রিস নিজেও তার ফলাফলের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারেননি, যতক্ষণ না তিনি মেনডেলের কাজ পড়েন। এরপর ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক সমাজ উপলব্ধি করতে শুরু করে—মেনডেলই প্রথম বংশগতির সঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে উইলিয়াম বেটসন মেনডেলের তত্ত্বকে ব্যাপকভাবে প্রচার করেন এবং “genetics” শব্দটি চালু করেন। এভাবেই, মৃত্যুর প্রায় ১৬ বছর পর, মেনডেল “জেনেটিক্সের জনক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

হুগো দ্য ভ্রিস (১৮৪৮-১৯৩৫ খ্রিঃ)

এরিখ ফন শেরমাক (১৮৭১-১৯৬২ খ্রিঃ)

কার্ল করেন্স (১৮৬৪-১৯৩৩ খ্রিঃ)

বর্তমান সময়-শ্রেণীকক্ষ

দীর্ঘ গল্প বলা শেষে আমি শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালাম। তারা তখনও তন্ময় হয়ে বসে আছে। ক্লাসের সময় শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু যেন কেউ নড়ছে না। আমি নীরবে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। বের হওয়ার আগে এক ঝলক তাকিয়ে দেখলাম, শিক্ষার্থীদের চোখে মেনডেলের প্রতি শ্রদ্ধা, তার প্রতি সহমর্মিতা এবং বিজ্ঞানের রোমাঞ্চকর যাত্রার আহ্বান একসঙ্গে ফুটে উঠেছে। ঠিক সেই অনুভূতিই, যা একসময় আমার নিজের মধ্যেও জন্ম নিয়েছিল—২০০৮ সালে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org