চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

বাংলাদেশি খাবার খেয়েই কি সত্যিকারের balanced diet সম্ভব?

Share
ছবি: ‘'আনন্দবাজার পত্রিকা” থেকে নেয়া।
Share

টার্মের ছুটির পর একটু সময় হাতে পেয়েছি।
ব্যস্ততার ভেতরে জমে থাকা কিছু ভাবনা ছিল, আজ সেগুলোরই একটা খুলে বসা।

প্রশ্নটা খুব সাধারণ
“বাংলাদেশি খাবার খেয়েই কি সত্যিকারের balanced diet সম্ভব?”

কিন্তু এই সাধারণ প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের প্লেট, আমাদের অভ্যাস, আর অদৃশ্যভাবে আমাদের আচরণ।

দুপুরের একটা দৃশ্য কল্পনা করেন।

গরম ভাত থেকে ধোঁয়া উঠছে। পাশে ডাল, একটা মাছ, একটু শাক বা ভর্তা।
সবকিছু খুব চেনা। খুব স্বাভাবিক।
এমন একটা প্লেট, যেটা আমরা গুরুত্ব না দিয়েই খেয়ে ফেলি প্রতিদিন।

কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন
এই “সাধারণ” প্লেটটাই হয়তো একটা নিঃশব্দে সাজানো বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য?

ভাত দিয়ে শুরু করি।

ভাতকে আমরা অনেক সময় দোষ দিই।
“ভাত খেলেই মোটা হয়ে যায়” এই ধারণাটা এত বেশি ছড়িয়ে গেছে, যেন ভাতই সব সমস্যার মূল।

আসলে ভাত হচ্ছে শক্তি। সরাসরি, সহজলভ্য শক্তি।
আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত গ্লুকোজ ব্যবহার করছে। চিন্তা করা, মনে রাখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া সবকিছুর পেছনে এই জ্বালানিই কাজ করে।

সমস্যা ভাতে না।
সমস্যা হয় তখনই, যখন পরিমাণ, সময় আর শরীরের ব্যবহার এই তিনটার মধ্যে ভারসাম্য থাকে না।

একটা স্থির জীবন, আর তার সাথে অতিরিক্ত ভাত
এটাই ধীরে ধীরে বিপদ ডেকে আনে।

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য।

ভাত খাওয়া কি একেবারে বন্ধ
না। কিন্তু ভাতের সাথে সম্পর্কটা বদলাতে হবে।

ডায়াবেটিসে মূল সমস্যা হলো রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা।
সাদা ভাত দ্রুত হজম হয়, দ্রুত রক্তে গ্লুকোজ বাড়ায়, যাকে বলে high glycemic response।

তাহলে উপায়?

হয়তো ভাত পুরো বাদ না দিয়ে
ভাতকে একটু ধীরে করতে হবে।

যেমন
গরম সাদা ভাতের বদলে একটু ঠান্ডা বা আগের দিনের ভাত খাওয়া যেতে পারে, এতে resistant starch বাড়ে।
অথবা লাল চাল বা ব্রাউন রাইস।
অথবা ভাতের পরিমাণ কমিয়ে পাশে বেশি সবজি আর প্রোটিন যোগ করা।

কারণ যখন ভাত একা থাকে, তখন সে দ্রুত কাজ করে।
কিন্তু যখন তার সাথে ফাইবার আর প্রোটিন থাকে, তখন তার গতি ধীর হয়।

কেউ চাইলে ভাতের কিছু অংশ বদলে নিতে পারেন
ওটস, আটার রুটি, বা মিশ্র শস্য দিয়ে।

কিন্তু মূল কথা একটাই
খাবারটা যেন শরীরে ঢুকে হঠাৎ ঝড় না তোলে, বরং ধীরে ধীরে কাজ করে।

তারপর আসে ডাল।

ডাল খুব নীরব এক উপাদান।
চোখে পড়ে না, কিন্তু শরীরের ভেতরে গিয়ে অনেক কাজ করে।

ভাতের সাথে ডাল মিলে এমন একটা সমন্বয় তৈরি করে, যেটা আলাদা আলাদা থাকলে সম্ভব না।
প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করে, হজম ধীর করে, আর তৃপ্তির একটা অনুভূতি দেয়।

মাছ
এই দেশের পানিতে বড় হওয়া একটা সম্পদ।

প্রোটিনের পাশাপাশি এতে যে ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, সেগুলো শুধু শরীর না
মস্তিষ্কের সাথেও সম্পর্ক রাখে।

আপনার মুড, আপনার মনোযোগ
কখনো কখনো এগুলোও আপনার প্লেটের উপর নির্ভর করে।

শাক, সবজি, ভর্তা
যেগুলোকে আমরা সাইড ভাবি।

আসলে এগুলোই অনেক সময় প্লেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এগুলো শুধু ভিটামিন দেয় না
এগুলো আপনার শরীরের ভেতরের পরিবেশ বদলায়।

ফাইবার ধীরে ধীরে কাজ করে,
গাটের ব্যাকটেরিয়াগুলোকে প্রভাবিত করে,
আর সেই গাট আপনার মস্তিষ্কের সাথে নীরবভাবে কথা বলে।

একটা অদ্ভুত সংযোগ
আপনি কী খান → আপনার গাট কীভাবে কাজ করে → আপনি কেমন অনুভব করেন।

এত কিছু ঠিক থাকার পরও, সমস্যা কোথায় তৈরি হয়?

খাবারে না।
সমস্যা তৈরি হয় আমাদের অজান্তেই, আমাদের আচরণে।

একটা পরিচিত দৃশ্য।

আপনি খেতে বসেছেন।
প্লেট সামনে।
কিন্তু চোখ ফোনে।

ভিডিও চলছে, স্ক্রল চলছে
খাওয়া চলছে, কিন্তু খাওয়াটা আর অনুভব করা হচ্ছে না।

শেষে যখন প্লেট খালি
তখন মনে হয়, আমি এত দ্রুত খেয়ে ফেললাম কিভাবে?

কারণ তখন আপনি খাচ্ছিলেন না
আপনি শুধু হাত দিয়ে খাবার তুলছিলেন।

আপনার মস্তিষ্ক তখন অন্য কোথাও ব্যস্ত ছিল।

এভাবেই ধীরে ধীরে ভারসাম্য নষ্ট হয়।

খাবার ঠিক থাকে
কিন্তু খাওয়ার পদ্ধতি ভুল হয়ে যায়।

ভাত বেশি হয়ে যায়,
সবজি কমে যায়,
প্রোটিন উপেক্ষিত হয়,
সময় এলোমেলো হয়ে যায়।

তবুও, একটা কথা থেকে যায়।

আমাদের এই সাধারণ প্লেট
ভাত, ডাল, মাছ, শাক
এটা ভুল না।

বরং এই প্লেটটাই অনেক দিক থেকে সবচেয়ে বাস্তব, সবচেয়ে টেকসই, সবচেয়ে কাছের একটা balanced diet।

শুধু এটাকে বুঝতে হবে,
আর একটু যত্ন নিয়ে সাজাতে হবে।

শেষে একটা ছোট দৃশ্য রেখে যাই।

পরেরবার যখন আপনি খেতে বসবেন,
একটু থামবেন।

প্লেটের দিকে তাকাবেন।

হয়তো দেখবেন
এটা শুধু খাবার না,
এটা আপনার শরীর আর মনের জন্য সাজানো এক নিঃশব্দ সমন্বয়।

আর তখন প্রশ্নটা বদলে যাবে

আমি কী খাচ্ছি?
থেকে
আমি কীভাবে খাচ্ছি?

মো. ইফতেখার হোসেন 
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org