নদীর কথা মনে পড়ছে…
ছোটবেলায় দেখতাম, নদী কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। পাথরের গা ঘেঁষে, বাঁকের মোড় পেরিয়ে, সে বয়েই চলে — অবিরাম, অক্লান্ত। কখনো ভাবিনি তখন যে এই সাধারণ সত্যটাই একদিন আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে উঠবে। প্রকৃতি কোনো কিছুকে স্থির থাকতে দেয় না। যা থামে, তা-ই পচে। যা বহমান, তা-ই বেঁচে থাকে।
বিজ্ঞানী.org-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে ৬ ই মার্চে, একটা ছোট্ট স্বপ্ন নিয়ে — বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া। সেই স্বপ্নটা আজ অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে। কিন্তু আজকের এই লেখা স্বপ্নের গল্প বলার জন্য নয়। আজকের লেখাটা একটা সিদ্ধান্তের কথা জানাতে — একটা পরিবর্তনের কথা, যা আসলে কোনো পরিবর্তন নয়, বরং একটা ধারাবাহিকতার স্বাভাবিক পরিণতি।
আমি আজ বিজ্ঞানী.org-এর সম্পাদকীয় দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করছি আমাদের নতুন সম্পাদকের কাছে।
মহান দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন — “No man ever steps in the same river twice, for it’s not the same river and he’s not the same man.” একই নদীতে দুইবার পা রাখা যায় না, কারণ নদী প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে, আর মানুষটিও। স্থিরতার মধ্যে যে সত্তা আশ্রয় খোঁজে, সে আসলে অস্তিত্বের সবচেয়ে মৌলিক সত্যটিকেই অস্বীকার করে। পরিবর্তন মানে ক্ষতি নয়, পরিবর্তন মানে প্রমাণ — প্রমাণ যে আমরা এখনো জীবিত, এখনো প্রাসঙ্গিক, এখনো বহমান।
যে সংগঠন পরিবর্তনকে ভয় পায়, সে স্থবির হয়ে পড়ে। আর স্থবিরতা হলো ধীর মৃত্যু — হঠাৎ করে নয়, আস্তে আস্তে, নিঃশব্দে। বিজ্ঞানী.org সেই পথে হাঁটতে রাজি নয়।
প্রায় দুই দশক ধরে এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। কত রাত যে লেখা পড়েছি, সম্পাদনা করেছি, লেখকদের সঙ্গে তর্ক করেছি — তার হিসেব নেই। প্রতিটি প্রকাশিত লেখার পেছনে ছিল একটা দায়বোধ: বাংলাভাষী পাঠকের কাছে বিজ্ঞানকে সহজ, সুন্দর এবং আনন্দময় করে তুলে ধরতে হবে। বিজ্ঞান শুধু সূত্র আর পরীক্ষার বিষয় নয়, সে হলো এক জীবনদর্শন — কৌতূহলের, প্রশ্নের, সততার।
এই দর্শন নিয়েই বিজ্ঞানী.org দাঁড়িয়ে আছে। আর এই দর্শন বহন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এখন নতুন হাতে।
নতুন সম্পাদকের পরিচয়
আমাদের নতুন সম্পাদক মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম পার্থ একজন তরুণ গবেষক এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলো হলো প্লাস্টিক দূষণ ও পরিবেশগত প্রভাব, জৈবপ্লাস্টিকের ব্যবহার, এবং বর্জ্যপানি পুনর্ব্যবহার।
মঞ্জুরুলের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল বাংলাদেশেই — কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণার পথে এগিয়ে যান। দক্ষিণ কোরিয়ার হানিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সূচনা করে অবশেষে স্বপ্নের গন্তব্য অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর এই পথচলায় ছিল অসংখ্য বাধা, অনিশ্চয়তা এবং অদম্য জেদ। শতাধিক ইমেইল ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি — অধ্যবসায়ই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বিজ্ঞান বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে মঞ্জুরুল গভীরভাবে আগ্রহী এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে সঠিকভাবে উপস্থাপন করলে গবেষণার জটিল বিষয়বস্তুও সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করা সম্ভব। বিজ্ঞানী.org-এর মিশনের সঙ্গে এই বিশ্বাসের মিল যে কতটা গভীর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার সমন্ধে বিস্তারিত পাবেন তারই সাক্ষাৎকারে এইখানে।
নতুন সম্পাদককে আমি চিনি। তাঁর মধ্যে সেই আগুনটা আছে যেটা একজন ভালো সম্পাদকের সবচেয়ে বড় সম্পদ — পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা, জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা, আর সত্যের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তিনি শুধু একটি পদে বসছেন না, তিনি একটি উত্তরাধিকার বহন করছেন। আর সেই উত্তরাধিকার কোনো বোঝা নয় — এটা একটা আলো, যা নিয়ে হাঁটলে পথ দেখা যায়।
বিজ্ঞানী.org-এর পাঠক, লেখক এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আমার অনুরোধ: নতুন সম্পাদককে সেই একই ভালোবাসা দিন যা আপনারা এতদিন এই প্ল্যাটফর্মকে দিয়েছেন। আপনাদের পাঠ, আপনাদের মতামত, আপনাদের সমালোচনা — এগুলোই একটি জীবন্ত প্ল্যাটফর্মের প্রাণশক্তি।
লেগাসি বা উত্তরাধিকার বলতে আমরা প্রায়ই ভাবি কিছু একটা রেখে যাওয়ার কথা — স্থাপত্য, বইপত্র, স্মৃতিস্তম্ভ। কিন্তু সত্যিকারের উত্তরাধিকার হলো একটা ধারা, একটা প্রবাহ — যা রেখে গেলে অন্যরা বহন করে এগিয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানী.org সেই ধারাটুকুই রেখে যেতে চায়।
আজ থেকে সম্পাদনার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব আমার কাঁধ থেকে নামছে, কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি ভালোবাসা নামছে না। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আমি সবসময় পাশে আছি একজন উপদেষ্টা হিসাবে — একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে, একজন পাঠক হিসেবে, একজন বন্ধু হিসেবে।
নদী থামে না। বিজ্ঞানী.org থামবে না।
নতুন সম্পাদককে স্বাগত। নতুন অধ্যায়কে স্বাগত।
প্রবাহ অব্যাহত থাকুক।
— মাশিউর রহমান প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সম্পাদক, বিজ্ঞানী.org এপ্রিল ২০২৬, সিঙ্গাপুর

Leave a comment