ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অস্ত্র হচ্ছে একটি প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র — ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব হেলসিংকিতে নিরলস গবেষণা করে চলেছেন ড. মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান
ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিতে শীতের রাত দীর্ঘ। ছয় মাস ধরে বরফে ঢাকা থাকে চারপাশ। কিন্তু সেই শীতার্ত দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরিতে এক বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর অনুসন্ধান থামে না। ক্রিস্টালের মধ্যে আটকানো প্রোটিনের দিকে এক্স-রের আলো ছুড়ে দিয়ে তিনি খুঁজে চলেছেন একটি রহস্যময় অণুর গঠন — যে গঠন একদিন হয়তো ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন দরজা খুলে দেবে।
ড. মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান। পিএইচডি করেছেন এনজাইম স্ট্রাকচার বিষয়ে, ইউনিভার্সিটি অব হেলসিংকি থেকে। বর্তমানে সেখানেই গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার বিষয় — স্ট্রাকচার-বেসড ড্রাগ ডিজাইন, অর্থাৎ প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বিশ্লেষণ করে নতুন ওষুধ আবিষ্কারের পথ খোঁজা। বিজ্ঞানী ডট অর্গের একটি অনলাইন সেশনে তিনি তাঁর গবেষণার কথা, জীবনের চ্যালেঞ্জের কথা এবং বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য দিকনির্দেশনা ভাগ করে নিয়েছেন সাবলীল ভাষায়।
কোলাজেন, ক্যান্সার এবং একটি এনজাইমের গল্প
মানবশরীরে কোলাজেন একটি অত্যন্ত পরিচিত প্রোটিন। ত্বকের দৃঢ়তা, হাড়ের মজবুতি, রক্তনালির গঠন — সবকিছুতেই কোলাজেনের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু এই উপকারী প্রোটিনটিই যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তখন তা ভয়াবহ রূপ নেয়।
ড. মোমিনুরের গবেষণা মূলত কেন্দ্রীভূত হয়েছে একটি বিশেষ এনজাইমকে ঘিরে, যার নাম কোলাজেন প্রোলিল ৪-হাইড্রক্সিলেজ (Prolyl 4-hydroxylase)। এই এনজাইমটি কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। কোলাজেনের মধ্যে থাকা একটি বিশেষ অ্যামিনো অ্যাসিড — প্রোলিন — এর সাথে এটি একটি হাইড্রক্সিল মূলক যুক্ত করে। এই রাসায়নিক পরিবর্তনের পরেই কোলাজেন তার কার্যকর, তন্তুময় (ফিব্রিলার) রূপ ধারণ করতে পারে এবং শরীরে স্থিতিশীল থাকে। এনজাইমটির কার্যক্রম না ঘটলে কোলাজেন ভেঙে পড়ে।
সমস্যাটা শুরু হয় যখন ক্যান্সার কোষে এই এনজাইমটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘আপ-রেগুলেশন’ — অর্থাৎ ক্যান্সার কোষে এই এনজাইমের জিনটি অতিরিক্ত মাত্রায় সক্রিয় থাকে, ফলে উৎপন্ন হয় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি এনজাইম। সেই অতিরিক্ত এনজাইম তৈরি করে অতিরিক্ত কোলাজেন। আর এই অতিরিক্ত কোলাজেনই ক্যান্সারকে আরও ভয়ঙ্কর করে তোলে।
“অতিরিক্ত কোলাজেন জমা হলে টিউমারের চারপাশে একটি শক্ত আবরণ তৈরি হয়,” ব্যাখ্যা করেন ড. মোমিনুর। এই ঘন কোলাজেনের স্তর ক্যান্সার কোষগুলিকে দ্রুত বাড়তে সাহায্য করে, টিউমারকে কঠিন ও সংহত (সলিড) রূপ দেয়, এবং মেটাস্টাসিস — অর্থাৎ ক্যান্সারের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া — সহজ করে দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই কোলাজেনের পুরু স্তর কেমোথেরাপির ওষুধকে ক্যান্সার কোষ পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা দেয়, ফলে চিকিৎসার কার্যকারিতা কমে যায়।
তাহলে সমাধান কী? ড. মোমিনুরের গবেষণাদলের লক্ষ্য হলো এই প্রোলিল ৪-হাইড্রক্সিলেজ এনজাইমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে কোলাজেনের মাত্রাকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা। এর জন্য দরকার একটি ইনহিবিটর — এমন একটি যৌগ বা অণু, যা এনজাইমের সাথে যুক্ত হয়ে তার কাজকে থামিয়ে দিতে বা কমিয়ে দিতে পারবে। মূলত, এনজাইমটিকে তার কাজ থেকে বিরত রেখে ক্যান্সারের বিস্তারের শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়াই এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য।
এই এনজাইমের তিনটি ভিন্ন রূপ বা আইসোফর্ম রয়েছে। তিনটির কাজ মোটামুটি একই — কোলাজেনকে পরিবর্তিত করা — কিন্তু এই তিনটি ঠিক কোথায়, কখন এবং কীভাবে কাজ করে, তা এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, কোলাজেনই এদের মূল সাবস্ট্রেট বা কর্মক্ষেত্র, কিন্তু তিনটি আইসোফর্মের নির্দিষ্ট কাজের পার্থক্য উদঘাটন এখনও গবেষণার বিষয়।
প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র — কেন এত জরুরি?
একটি প্রোটিনের গঠন বোঝার জন্য শুধু এটি কী কাজ করে তা জানলেই চলে না — জানতে হয় এটি দেখতে ঠিক কেমন। পরমাণুর স্তরে, প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিড কোথায় কীভাবে সজ্জিত আছে, তার একটি নির্ভুল মানচিত্র না থাকলে কার্যকর ওষুধ ডিজাইন করা প্রায় অসম্ভব। এই মানচিত্রটিকেই বলা হয় প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক স্ট্রাকচার।
ড. মোমিনুর এই ধারণাটি বোঝাতে একটি চমৎকার উদাহরণ দেন। “আমাদের হাতে পাঁচটি আঙুল আছে। কিছু শক্ত করে ধরতে হলে পাঁচটি আঙুলেরই ভূমিকা থাকে। একটি না থাকলে গ্রিপ কমে যায়।” ঠিক তেমনি একটি এনজাইমের সক্রিয় অংশে — যেখানে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে — প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিডের নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। কোনোটি হাইড্রোজেন বন্ধন তৈরি করে, কোনোটি আয়নিক মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেয়, কোনোটি পানি-বিরোধী (হাইড্রোফোবিক) পরিবেশ বজায় রাখে। ত্রিমাত্রিক স্ট্রাকচার জানা থাকলে বোঝা যায় — কোন অ্যামিনো অ্যাসিডটি কোন ভূমিকায় আছে, সক্রিয় স্থানের প্রকৃতি কী, এবং সেখানে ইনহিবিটর ডিজাইন করতে হলে কোন ধরনের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য দরকার।
স্ট্রাকচার না জানলে একটি ওষুধের অণুকে পরিমার্জিত করা সম্ভব হয় না। ড. মোমিনুরের ল্যাবে এখন পর্যন্ত মাইক্রোমোলার মাত্রায় কার্যকর একটি সম্ভাব্য ইনহিবিটর পাওয়া গেছে। কিন্তু এই মাত্রা ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট নয় — প্রয়োজন ন্যানোমোলার মাত্রার কার্যকারিতা, যা এক হাজার গুণেরও বেশি শক্তিশালী। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রোটিন-লিগ্যান্ড কমপ্লেক্সের ত্রিমাত্রিক স্ট্রাকচার অপরিহার্য — কোন জায়গায় ঋণাত্মক চার্জ যোগ করতে হবে, কোথায় মিথাইল গ্রুপ লাগাতে হবে, কোথায় ধনাত্মক চার্জ দরকার — এই প্রশ্নের উত্তর মেলে কেবল স্ট্রাকচার থেকেই।
ক্রিস্টালোগ্রাফি — বিজ্ঞানের সেই প্রাচীন ও অমোঘ হাতিয়ার
প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন নির্ধারণের জন্য বিজ্ঞানীরা মূলত তিনটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন — এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি, এনএমআর স্পেকট্রোস্কোপি এবং ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি। ড. মোমিনুর মূলত এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে বিশেষজ্ঞ, পাশাপাশি ক্রায়ো-ইএম পদ্ধতিও শিখছেন।
ক্রিস্টালোগ্রাফির ইতিহাস বিজ্ঞানের এক অসাধারণ অধ্যায়। ডিএনএর দ্বিসূত্রী কুণ্ডলী গঠনের — যা জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলির একটি — মূল প্রমাণ এসেছিল এই ক্রিস্টালোগ্রাফির মাধ্যমেই। রোজালিন্ড ফ্র্যাংকলিন নামের এক বিজ্ঞানী প্রথম এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ব্যবহার করে ডিএনএর বিচ্ছুরণ প্যাটার্ন সংগ্রহ করেছিলেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএর মডেল তৈরি করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে অকালমৃত্যুর কারণে রোজালিন্ড নোবেল পুরস্কার পাননি, যদিও বর্তমানে বিজ্ঞান সমাজ তাঁকে এই আবিষ্কারের প্রকৃত কৃতিত্ব দেয়।
এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে একটি প্রোটিনকে প্রথমে বিশুদ্ধ করে ক্রিস্টাল আকারে জমাট বাঁধাতে হয়। তারপর সেই ক্রিস্টালের ওপর এক্স-রে বিকিরণ ছুড়লে আলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি বিচ্ছুরণ প্যাটার্ন তৈরি হয়। সেই প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে গণনার মাধ্যমে প্রোটিনের পরমাণু-স্তরের গঠন নির্ধারণ করা যায়। বড় প্রোটিন বা ঝিল্লিযুক্ত (মেমব্রেন-বাউন্ড) প্রোটিনের জন্য ক্রায়ো-ইএম আরও উপযুক্ত, তবে সেই যন্ত্রপাতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সর্বত্র সুলভ নয়।
ড. মোমিনুরের টার্গেট এনজাইমটি ২৫৬ কিলোডালটন আকারের — তুলনামূলকভাবে বড় আণবিক ভর। এই আকারের প্রোটিনের কো-ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার — অর্থাৎ প্রোটিন ও ইনহিবিটর একসাথে ক্রিস্টালে বন্দী হয়ে তাদের মিলিত গঠন — পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ ক্রিস্টালাইজেশনের জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক পরিবেশ এবং বাইন্ডিং স্টাডির পরিবেশ ভিন্ন হলে কম্পাউন্ডটি ক্রিস্টালের মধ্যে স্থিতিশীল থাকে না। গবেষণাদলটি ফ্র্যাগমেন্ট স্ক্রিনিং পদ্ধতিও ব্যবহার করছে — যেখানে আগে থেকেই তৈরি করা ক্রিস্টালকে উচ্চমাত্রার ইনহিবিটরে ভিজিয়ে রেখে ধীরে ধীরে ইনহিবিটরটি ক্রিস্টালের ভেতর প্রোটিনের সক্রিয় স্থানে প্রবেশ করানো হয়।
সাবস্ট্রেট বাইন্ডিং ডোমেইন — যেখানে লুকিয়ে আছে চাবিকাঠি
যে কোনো এনজাইমকে বাধা দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার সক্রিয় স্থানে — যেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে — ইনহিবিটর ঢুকিয়ে দেওয়া। কিন্তু এখানে একটি জটিলতা আছে। মানবদেহে আরও কিছু এনজাইম আছে যাদের সক্রিয় স্থানের গঠন এই প্রোলিল ৪-হাইড্রক্সিলেজের সক্রিয় স্থানের মতোই। সেখানে ইনহিবিটর দিলে সেই সুস্থ এনজাইমগুলিও বাধাগ্রস্ত হবে, যা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করবে।
এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে একটি ভিন্ন অংশে — সাবস্ট্রেট বাইন্ডিং ডোমেইন বা পেপটাইড সাবস্ট্রেট বাইন্ডিং ডোমেইনে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোলাজেন প্রথমে এই অংশে এসে বাঁধে, এবং তারপর যে অ্যামিনো অ্যাসিডটি পরিবর্তিত হবে সেটি সক্রিয় স্থানে স্থির থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সাবস্ট্রেট বাইন্ডিং ডোমেইনে কোনো পরিবর্তন আনলে এনজাইমের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তার মানে, এই অংশটিই হতে পারে ইনহিবিটরের সর্বোত্তম লক্ষ্যস্থান — এবং যেহেতু অন্য এনজাইমগুলিতে এই নির্দিষ্ট সাবস্ট্রেট বাইন্ডিং ডোমেইন নেই, তাই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও অনেক কম।
গবেষণাদল ইতিমধ্যে একটি সিন্থেটিক লিগ্যান্ড ডিজাইন করেছে যা সাবস্ট্রেটের অনুকরণে তৈরি — একে বলে সাবস্ট্রেট ফ্র্যাগমেন্ট। এই লিগ্যান্ডটি দিয়ে কো-ক্রিস্টাল তৈরি করে বাইন্ডিং মোড সনাক্তের চেষ্টা চলছে। রাসায়নিক গ্রন্থাগার (কেমিক্যাল লাইব্রেরি) পরীক্ষা করে কিছু প্রতিশ্রুতিশীল কম্পাউন্ডও পাওয়া গেছে। এখন এই কম্পাউন্ডগুলিকে মলিকুলার ডকিং পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে — কম্পিউটারে সিমুলেশনের মাধ্যমে দেখা হচ্ছে, এই অণুগুলি প্রোটিনের সক্রিয় স্থানে ঠিকঠাক ফিট করে কিনা।
মলিকুলার ডকিং — কম্পিউটারের মধ্যে ওষুধের পরীক্ষা
মলিকুলার ডকিং হলো একটি কম্পিউটেশনাল পদ্ধতি, যেখানে একটি প্রোটিন ও একটি সম্ভাব্য ওষুধের অণুকে ডিজিটালভাবে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রোটিনের সক্রিয় স্থানে অণুটি কীভাবে প্রবেশ করে, কতটা শক্তভাবে বাঁধে, কোন অ্যামিনো অ্যাসিডের সাথে কোন ধরনের মিথস্ক্রিয়া ঘটে — এই সবকিছু কম্পিউটারে অনুকরণ করা যায়।
ড. মোমিনুরের গবেষণায় ডকিং প্রমাণ করেছে যে, ল্যাবে পাওয়া প্রতিশ্রুতিশীল ইনহিবিটরটির মধ্যে দুটি অ্যারোমেটিক রিং আছে, আর প্রোটিনের সক্রিয় স্থানে দুটি হাইড্রোফোবিক পকেট রয়েছে — এই মিলটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ডকিং থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তারা সঠিক পথেই আছেন।
তবে ডকিং ফলাফল একা যথেষ্ট নয় — এটিকে অবশ্যই ওয়েট ল্যাবের পরীক্ষা দিয়ে যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশে এখন অনেকে শুধু ডকিং করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন, কিন্তু ডকিংয়ে যে কম্পাউন্ড চমৎকার ফলাফল দেখায়, সে কম্পাউন্ড ল্যাবে পানিতে গুলিয়েই যায় না — এমন ঘটনা ড. মোমিনুরের নিজের অভিজ্ঞতায় আছে। আটটি কম্পাউন্ড পাঠানো হয়েছিল, তিনি গুলোনোর চেষ্টা করলেন, ৩৭ ডিগ্রিতে ইনকিউবেট করলেন, তবুও তলানি পড়ে গেল। এমন কম্পাউন্ড দিয়ে কোষে পরীক্ষাও করা সম্ভব হয় না। শুধু ডকিং করে প্রকাশিত গবেষণাপত্র তাই বাস্তবে কোনো কাজে আসে না। কম্পিউটেশনাল ফলাফলকে অর্থপূর্ণ করতে হলে জৈব-রাসায়নিক পরীক্ষার সাথে মিলিয়ে নিতে হবেই।
ওষুধ আবিষ্কারের দীর্ঘ পথ — ধাপে ধাপে যাত্রা
ড. মোমিনুর স্পষ্টভাবে বলেন, তাঁরা এখনও ওষুধ আবিষ্কারের পথের শুরুতে আছেন — কিন্তু প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার বর্তমান পর্যায় হলো টার্গেট প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক স্ট্রাকচার নির্ধারণ করা এবং সম্ভাব্য ইনহিবিটর সনাক্ত করা। স্ট্রাকচার পাওয়া গেলে ও কার্যকর ইনহিবিটর পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে কাজটি যাবে সহযোগী গবেষকদের কাছে, যারা কোষ সংস্কৃতি (সেল কালচার) ও প্রাণী মডেলে (মাউস মডেল) পরীক্ষা করবেন। সেখানে দেখা হবে, টার্গেট ক্যান্সার কোষে এনজাইমটি সত্যিই বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে কিনা, এবং কোলাজেন সংশ্লেষণের পথে এর প্রভাব পড়ছে কিনা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো, এই এনজাইমটি কাজ করে কোষের এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামে — কোষের ভেতরের একটি নির্দিষ্ট অংশে। ওষুধের অণুকে প্রথমে কোষের বাইরের আবরণ ভেদ করতে হবে, তারপর এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে — প্রতিটি স্তর একটি বাধা। সেল পার্মেয়াবিলিটি, অর্থাৎ কম্পাউন্ডটি কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে কিনা, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে যাবে মাউস বা অন্য প্রাণী মডেলে। সেখানে সফল হলে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দিকে যাত্রা।
“২০১২ সালে আমি যখন পিএইচডি ছাত্র,” স্মরণ করেন ড. মোমিনুর, “তখন কম্পিউটার-এইডেড ড্রাগ ডিজাইনের একজন শিক্ষক বলেছিলেন, একটি ওষুধ সফলভাবে বাজারে আসতে ১৫ থেকে ২০ বছর লাগে। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল — মনে হয়েছিল, অবসরে যাওয়ার আগে কিছু দেখতেই পাব না।” কিন্তু এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা — গবেষণার গতি বাড়ছে
ওষুধ আবিষ্কারের দীর্ঘ পথকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন সংকুচিত করে আনছে। ড. মোমিনুর এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানান।
আগে একজন মেডিসিনাল কেমিস্ট একদিনে হয়তো কয়েকটি সম্ভাব্য অণু ডিজাইন করতে পারতেন। এখন এআই টুলের সাহায্যে একটি টেমপ্লেট অণু থেকে লক্ষাধিক পরিবর্তিত রূপ (অ্যানালগ) একই সময়ে তৈরি করা সম্ভব। ভি-টক্স বা ডিপ-ক্যাম-এর মতো এআই টুল ব্যবহার করে ভার্চুয়ালি একটি কম্পাউন্ডের বিষক্রিয়া (টক্সিসিটি) পরীক্ষা করা যাচ্ছে। শরীরের কোন অঙ্গ দিয়ে ওষুধটি যাবে, কোথায় ভেঙে পড়বে — ডিগ্রেডেশন পাথ অ্যানালাইসিস — সেটাও ভার্চুয়াল পরিবেশে করা সম্ভব হচ্ছে।
স্ট্রাকচারাল বায়োলজির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে আলফাফোল্ড। ডিপমাইন্ড নির্মিত এই এআই টুলটি শুধু প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড ক্রম থেকে এর ত্রিমাত্রিক গঠন পূর্বাভাস দিতে পারে, এবং সেই পূর্বাভাসের নির্ভুলতা ৯৮-৯৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর আগে এই কাজ করতে মাসের পর মাস ল্যাবে শ্রম দিতে হতো।
ড. মোমিনুর নিজেও এই টুল ব্যবহার করেন প্রোটিন গবেষণায়। “অনেক প্রোটিন সহজে দ্রবণীয় হয় না,” বলেন তিনি। “আলফাফোল্ড দিয়ে মডেল তৈরি করলে আগেই দেখা যায় কোন লুপ বা কোন অংশটি সমস্যাজনক। সেই অংশ বাদ দিয়ে ছাঁটাই করলে প্রোটিনটি স্থিতিশীল হয়। এটি ল্যাবে মাসের পর মাস নষ্ট হওয়া বাঁচায়।” এআই ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাবে, এবং এর সুফল সবচেয়ে বেশি পাবে ড্রাগ ডিসকভারির ক্ষেত্র।
তবু ক্রিস্টালোগ্রাফির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়নি। আলফাফোল্ড গঠনের পূর্বাভাস দিতে পারে, কিন্তু প্রোটিন-লিগ্যান্ড কমপ্লেক্সের প্রকৃত ত্রিমাত্রিক গঠন নির্ধারণে এখনও ল্যাবের ভূমিকা অপ্রতিস্থাপনীয়।
বায়োটেকনোলজির বিস্তৃত বিশ্বে ক্যারিয়ার — কোন পথে যাবেন?
বায়োটেকনোলজি একটি বিশাল মাঠ। কৃষি, চিকিৎসা, ফার্মাসিউটিক্যাল, শিল্প — প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রসার। তরুণ শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বিভ্রান্ত হন — কোন দিকে যাবেন?
ড. মোমিনুরের পরামর্শ সহজ কিন্তু গভীর। “কোন ফিল্ড বেশি জনপ্রিয় — সেটা দিয়ে নয়, কোন ফিল্ডে আপনি ভালো করতে পারবেন, সেটা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।”
তিনি বলেন, দেশ ও সময়ভেদে সুযোগের তারতম্য হয়। নর্ডিক দেশে কৃষি বায়োটেকনোলজির প্রয়োগ কম — কারণ ছয় মাস বরফে ঢাকা থাকে, চাষাবাদের মাঠ সীমিত। সেখানে মেডিকেল ও ফার্মাসিউটিক্যাল বায়োটেকনোলজিতে বিনিয়োগ বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি বায়োটেকনোলজি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় যেকোনো ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়া ইউরোপের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজ। তাই শুধু বিষয় নয়, কোন দেশে কোন ক্ষেত্রে সুযোগ বেশি — সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
একাডেমিক ক্যারিয়ার না শিল্পকেন্দ্রিক ক্যারিয়ার — এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পে কাজ করতে গেলে উচ্চ-থ্রুপুট স্ক্রিনিং, রোবোটিক্স-ভিত্তিক পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা হয়তো একটি প্লেটে হাজারটি যৌগ পরীক্ষা করি — শিল্পে একই কাজ হয় কোটি কোটি যৌগে, রোবোটের সাহায্যে। তাই তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও শিল্পের চাহিদা বোঝা অপরিহার্য।
ড. মোমিনুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ — এলসি-এমএস, ম্যাস স্পেক্ট্রোমেট্রি, আইটিসি (আইসোথার্মাল টাইট্রেশন ক্যালোরিমেট্রি)-এর মতো বায়োকেমিক্যাল পদ্ধতির উপর ব্যবহারিক কোর্স করুন। শুধু কোর্সটি করলে বিশেষজ্ঞ হয়ে যাওয়া যাবে না — কিন্তু যন্ত্রপাতি কীভাবে কাজ করে, সেটা চোখে দেখা হলে পরবর্তীতে সমস্যা সমাধান ও ডেটা বিশ্লেষণ অনেক সহজ হয়। শিল্পে এই যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়, তাই এগুলোর পরিচিতি ক্যারিয়ারে সরাসরি কাজে আসে।
জিএমও ও ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান
বাংলাদেশে জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম বা জিএমও নিয়ে নানা ভুল ধারণা ও ভয় রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় — “জিএমও খেলে ক্যান্সার হয়”, “এতে ভারী ধাতু ঢোকানো আছে”, “এটা আমাদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।” ড. মোমিনুর এই বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য রাখেন।
“যারা বলে জিএমও মানে জীবাণু ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তারা জানেই না জিনিসটা আসলে কী। জীবাণু বলতে বোঝায় ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক — একটা সেলুলার সত্তা। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস।”
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে বোঝায়, একটি উদ্ভিদ বা প্রাণীতে অন্য কোনো উৎস থেকে আনা একটি জিন প্রতিস্থাপন করা। যে জিনটি বাড়তি উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ বা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী, সেটি চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট উদ্ভিদে ঢোকানো হয়। উদাহরণ হিসেবে ড. মোমিনুর বাংলাদেশে দেখা আপেল-কুলের কথা বলেন — আপেলের রঙের জন্য দায়ী জিনটি বরইয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তাই দেখতে আপেলের মতো দেখায়। এখানে কোনো ভারী ধাতু নেই, কোনো জীবাণু নেই।
তবে এটাও সত্যি যে কিছু ক্ষেত্রে জিএমও পণ্যে অ্যালার্জির সম্ভাবনা থাকতে পারে, কারণ নতুন প্রোটিন তৈরি হয় এবং কিছু মানুষ সেই প্রোটিনের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারেন। এই কারণেই প্রতিটি দেশে জিএমও পণ্য অনুমোদনের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা রয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা জিএমও পণ্য তৈরি করে, তারা বাজারে আসার আগে এই সুরক্ষা পরীক্ষাগুলি পার করেই আসে।
সমস্যা হয় যখন অন্য দেশের অনুমোদিত পণ্য সঠিকভাবে যাচাই না করে আমদানি করা হয়। সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু না জেনে জিএমও মানেই বিষ — এই ধারণা প্রচার করা বিজ্ঞানবিরোধী।
ড. মোমিনুর একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ দেন — আমরা যে কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্ট ব্যবহার করি, তাতে প্রোটিয়েজ ও লাইপেজ এনজাইম থাকে যা কাপড়ের দাগ ছাড়ায়। এই এনজাইমগুলি তৈরি হয় থার্মোফিলাস ব্যাকটেরিয়া থেকে — যেসব ব্যাকটেরিয়া উত্তপ্ত প্রস্রবণে ১৬০ ডিগ্রি তাপমাত্রায়ও বাঁচতে পারে। ওই ব্যাকটেরিয়ার জিন থেকে রিকম্বিনেন্ট পদ্ধতিতে তাপ-সহনশীল এনজাইম তৈরি করা হয় — এটিই জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি প্রয়োগ, যা প্রতিদিন আমরা অজান্তে ব্যবহার করছি।
বাংলাদেশের গবেষণা পরিমণ্ডল — একটি হতাশাজনক চিত্র এবং সম্ভাবনার ডাক
বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে ড. মোমিনুর যে বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা তাঁকে বারবার ভাবিয়ে তোলে। ভারত থেকে প্রচুর গবেষক আসেন, পাকিস্তান থেকেও দেখা যায় — কিন্তু বাংলাদেশ থেকে প্রায় কেউ থাকেন না।
প্রোটিন ডেটা ব্যাংক বা পিডিবি — যেখানে বিশ্বের গবেষকরা তাদের সমাধানকৃত প্রোটিন স্ট্রাকচার জমা দেন — সেখানে বাংলাদেশ থেকে কোনো স্ট্রাকচার নেই। ভারত থেকে আছে প্রচুর। পাকিস্তান থেকেও আছে। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয় — এটি একটি দেশের গবেষণা সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি।
“বাংলাদেশে একটি ডায়াগনস্টিক কিটও নেই যা নিজেরা তৈরি করে বাজারে বিক্রি হচ্ছে,” বলেন ড. মোমিনুর। “এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। মাইক্রোবিয়াল সংক্রমণে শিশু ও বয়স্ক মানুষ মারা যাচ্ছেন, ডায়রিয়া থেকে সেপসিস পর্যন্ত — অথচ মৌলিক রোগ সনাক্তকরণ কিটটুকু আমরা তৈরি করতে পারিনি।” ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু কেমোথেরাপি দেওয়ার জন্যই কি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকবে? ক্যান্সারের মৌলিক গবেষণা, প্রাকৃতিক যৌগ থেকে থেরাপিউটিক সন্ধান — এদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
তবু তিনি হতাশ নন। স্পাইডার সিল্ক প্রোটিন দিয়ে বায়োম্যাটেরিয়াল তৈরির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, হাড়ের জয়েন্ট মেরামতের জন্য জেল ইনজেকশন তৈরিতে মাকড়সার জাল থেকে পাওয়া প্রোটিন ব্যবহার করা যায়। সম্প্রতি হংকং থেকে এ সংক্রান্ত একটি পেটেন্ট হয়েছে। ক্ষতস্থান বন্ধের জৈব টেপ তৈরিতেও এই উপাদান কাজে লাগতে পারে। এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল গবেষণা নয়। ইচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকলে বাংলাদেশেও এ ধরনের গবেষণা সম্ভব।
“আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য, নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য উদ্যোগ নেওয়া উচিত। শুধু কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ‘কোলাবোরেশন’ চুক্তি সই করলেই হয় না — মাঠ পর্যায়ে গবেষকদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যেতে হবে।”
খুলনা থেকে হেলসিংকি — একটি সংগ্রামের গল্প
ড. মোমিনুরের পথটা মসৃণ ছিল না। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন — তখন সেখানে আধুনিক গবেষণা সুবিধা তেমন ছিল না। দেশে কিছুটা সেলস মার্কেটিংয়ের কাজ করে দেড় বছরের পড়াশোনার বিরতির পর যখন সুইডেনে মাস্টার্স করতে গেলেন, সব কিছু নতুন মনে হলো। বায়োইনফর্মেটিক্স, স্ট্রাকচারাল বায়োলজির অ্যাডভান্সড বিষয় দেখে প্রথম দিকে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন।
সেই সংকটমুহূর্তে পাশে পেলেন কিছু দক্ষিণ ভারতীয় সহপাঠীকে — উদার, সহায়তাপরায়ণ। তাঁরা দেখিয়ে দিলেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই — নির্দেশিকা পড়ো, ধীরে ধীরে কাজ করো। একটি স্ট্রাকচার বিশ্লেষণের অনুশীলনে দুটি প্রোটিনের তুলনামূলক গঠনে পার্থক্য খুঁজতে গিয়ে কিছু পাচ্ছিলেন না। সহপাঠী দেখালেন — এই লুপটা একটু সরে গেছে, এই অংশটার কনফরমেশনাল চেঞ্জ হয়েছে। এটুকু বুঝতে পারার পর ভয় কাটলো।
তখন তিনি নিলেন ‘রিসার্চ ট্রেনিং ইন বায়োলজি’ নামের একটি বিশেষ কোর্স। দুই মাসের কঠোর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ — ক্লোনিং থেকে শুরু করে প্রোটিন পরিশোধন পর্যন্ত সব। প্রতিটি পদ্ধতির পেছনের যুক্তি — কেন এই বাফার, কেন এই তাপমাত্রা — সব নিজে বুঝে নিলেন। ওই দুই মাসে অক্লান্ত পড়াশোনা করলেন।
ফলাফল? দুই মাস পরেই এক মাসের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পেলেন, তারপর পুরো থিসিসটাই হলো বেতনভুক্ত গবেষণা সহকারী হিসেবে। আর সেই ভারতীয় বন্ধু — যাকে ড. মোমিনুর মনে করতেন নিজের চেয়ে অনেক বেশি জানে — একদিন স্বীকার করলেন, তিনিই ভয় পাচ্ছিলেন ড. মোমিনুরকে নিয়ে। কারণ প্রোটিন নিয়ে ড. মোমিনুরের অভিজ্ঞতা তাঁর চেয়ে বেশি।
এই গল্পের নীতিটি সহজ — সঠিক সময়ে সঠিক বিনিয়োগ, নিজের ভয়কে চিনে সেটাকে অতিক্রম করা এবং অন্যকে দেখে হীনমন্যতায় না ভোগা।
স্টাডি গ্যাপ — সত্যিই কি বাধা?
অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর মনে ভয় — পড়াশোনায় বিরতি হয়ে গেছে, এখন আর বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া যাবে না। ড. মোমিনুর এই বিষয়ে বলেন, স্টাডি গ্যাপ একটি বিষয়, কিন্তু সেটাই সব নয়।
মাস্টার্সে ভর্তির ক্ষেত্রে স্টাডি গ্যাপ খুব বড় বাধা নয়, যদি সেই সময়টা প্রাসঙ্গিক কাজে ব্যয় হয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করেছেন, ল্যাবে কাজ করেছেন — এই অভিজ্ঞতা স্টাডি গ্যাপের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়। সমস্যা হয় পিএইচডি পাওয়ার ক্ষেত্রে।
মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে কোথাও পদ পাওয়া না গেলে সুপারভাইজার ধীরে ধীরে স্মৃতি থেকে বিবর্ণ হয়ে যান। প্রতি বছর নতুন ব্যাচ আসে, নতুন শিক্ষার্থীরা পারফর্ম করে। তাই মাস্টার্সের থিসিস অর্ধেক শেষ হলেই পিএইচডির জন্য ব্যক্তিগত যোগাযোগ শুরু করুন, এপিয়ারেন্স সার্টিফিকেট দিয়ে আবেদন করুন — এটাই কৌশলী পথ।
একজন বিজ্ঞানীর স্বপ্ন
সেশনের শেষে ড. মোমিনুর যা বললেন, তা কেবল একজন বিজ্ঞানীর কথা নয় — একজন দেশপ্রেমিকের কথা।
“আমি চাই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গিয়ে বলতে পারি — ওই গবেষণাটা বাংলাদেশের অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের। এখন পর্যন্ত সেই সুযোগ হয়নি। কিন্তু এটা হওয়া উচিত।”
বাংলাদেশে প্রচুর মেধাবী গবেষক আছেন — দেশে ও বিদেশে। দরকার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং মৌলিক গবেষণায় বিনিয়োগ। একটি দেশের বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন মানে শুধু আইটি পার্ক বা গার্মেন্টস নয় — মানে হলো এমন মানুষ তৈরি করা যারা রোগের কারণ খুঁজবেন, ওষুধ আবিষ্কার করবেন, মানুষের জীবনমান উন্নত করবেন।
হেলসিংকির শীতার্ত ল্যাবরেটরিতে ডক্টর মোহাম্মদ মোমিনুর রহমান সেই কাজই করছেন — একটি প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র এঁকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একটি নতুন অস্ত্র তৈরির স্বপ্ন বুকে নিয়ে। তাঁর এই যাত্রা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান নয় — এটি প্রতিটি বাংলাদেশি তরুণ গবেষকের জন্য একটি বার্তা: সীমিত সুবিধা নিয়েও থামা যায় না, নিজের ভয়কে জয় করে এগিয়ে যেতে হয়, এবং একদিন না একদিন এই দেশের নামও বিশ্বের বিজ্ঞানের মানচিত্রে উজ্জ্বলভাবে জ্বলবে।
ড. মোহাম্মদ মোমিনুর রহমানের সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇

Leave a comment