বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। কিন্তু বিজ্ঞানী হওয়া মানে শুধু ল্যাব কোট পরা বা জটিল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা নয়। বিজ্ঞানী হওয়ার মূল জায়গাটা আসলে মাথার ভেতরে—কীভাবে আমরা পৃথিবীকে দেখি, কীভাবে প্রশ্ন করি এবং অজানাকে জানার চেষ্টা করি। বাংলাদেশি গবেষক ড. বাশার ইমন তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বিজ্ঞানীর এই মানসিকতার একটি সহজ কিন্তু গভীর সংজ্ঞা দিয়েছেন—“প্রশ্ন করতে হবে—কেন হলো, কীভাবে হলো।”
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কিছুই আমরা স্বাভাবিক ধরে নিই। কেন বৃষ্টি হয়, কেন কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়ে, কেন কোনো বস্তু শক্ত বা নরম হয়—এই প্রশ্নগুলো বেশির ভাগ সময় আমরা এড়িয়ে যাই। কিন্তু একজন বিজ্ঞানী এসব বিষয়কে ‘গিভেন’ হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। তাঁর কাছে প্রতিটি ঘটনাই একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। এই কৌতূহলই বিজ্ঞানের প্রথম ধাপ।
ড. বাশার ইমনের মতে, কেবল প্রশ্ন করলেই বিজ্ঞানী হওয়া যায় না; প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করাটাই আসল কাজ। স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে আমরা অনেক উত্তর পাই, কিন্তু গবেষণার জগতে ঢুকলে দেখা যায়—অনেক প্রশ্নের কোনো প্রস্তুত উত্তর নেই। তখন নিজেকে পথ তৈরি করতে হয়। তথ্য জোগাড় করা, অন্য গবেষণাপত্র পড়া, পরীক্ষা চালানো—এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একজন গবেষকের চিন্তাকে পরিণত করে।
এই মানসিকতার একটি বাস্তব উদাহরণ হলো ড. ইমনের নিজের পথচলা। প্রকৌশল পটভূমি থেকে এসে তিনি ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল—টিউমার কেন সময়ের সঙ্গে শক্ত হয়ে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর পাঠ্যবইয়ে ছিল না। তাই তাঁকে নিজেই গবেষণার পথ বেছে নিতে হয়েছে। এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে নতুন ধরনের যন্ত্র, নতুন ধরনের বিশ্লেষণ পদ্ধতি এবং ক্যান্সারকে বোঝার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।
বিজ্ঞানী হওয়ার মানসিকতা মানে ব্যর্থতাকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া। গবেষণায় অনেক সময় পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাশামতো আসে না। কোনো ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীর কাজ থেমে যায় না। বরং এই ব্যর্থতাই নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়—কেন কাজ করল না? কোথায় ভুল হলো? এই জায়গায় একজন বিজ্ঞানী আর সাধারণ শিক্ষার্থীর পার্থক্য তৈরি হয়।
ড. বাশার ইমন তরুণদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই নিজের ভেতরের এই অনুসন্ধিৎসু মনকে চিনতে হবে। পাঠ্যসূচির বাইরে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক বই পড়া, গবেষণামূলক লেখা দেখা, ল্যাবে কাজ করার সুযোগ খোঁজা—এসবের মধ্য দিয়েই বোঝা যায় গবেষণা আসলে আপনার জন্য কিনা। বিজ্ঞানী হওয়া মানে এক ধরনের জীবনধারা—যেখানে শেখা কখনো শেষ হয় না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই মানসিকতার গুরুত্ব আরও বেশি। সীমিত সুযোগের মধ্যেও যদি শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শেখে এবং নিজে নিজে শেখার অভ্যাস গড়ে তোলে, তাহলে দেশেই গবেষণার ভিত শক্ত হতে পারে। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে যারা কাজ করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকেও এই বার্তাই পাওয়া যায়—শুধু ভালো ফল করলেই বিজ্ঞানী হওয়া যায় না; প্রশ্ন করার সাহস ও উত্তর খোঁজার ধৈর্যই একজনকে সত্যিকারের গবেষক করে তোলে।
ড. বাশার ইমনের কথায়, বিজ্ঞান মানে মুখস্থ বিদ্যা নয়; বিজ্ঞান মানে পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখা। এই নতুন চোখে দেখার অভ্যাস যদি তরুণ বয়সেই গড়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের পথচলা আরও সমৃদ্ধ হবে।
🔗 পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Leave a comment