তথ্যপ্রযুক্তিপদার্থবিদ্যা

“আলোকে সমান্তরাল প্রসেসর হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল আমার লক্ষ্য” – ড. আতাউল করিম

Share
Share

কম্পিউটার প্রযুক্তির বিকাশের ইতিহাস মূলত গতি বাড়ানোর ইতিহাস। একসময় যে কাজ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, আজ তা কয়েক সেকেন্ডেই সম্ভব হচ্ছে। তবু আধুনিক বিজ্ঞানীদের কাছে এই গতি এখনো যথেষ্ট নয়। ডেটার পরিমাণ বাড়ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিমুলেশনের প্রয়োজন বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিমের গবেষণা-অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি ভিন্নধর্মী পথের কথা তুলে ধরে। তাঁর ভাষায়, “আলোকে সমান্তরাল প্রসেসর হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল আমার লক্ষ্য।”

এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে একটি মৌলিক প্রযুক্তিগত উপলব্ধি। প্রচলিত কম্পিউটার বিদ্যুতের সিগন্যাল ব্যবহার করে কাজ করে, যেখানে তথ্য একটির পর একটি প্রক্রিয়াজাত হয়। এতে করে গতি বাড়ানোর একটি স্বাভাবিক সীমা তৈরি হয়। কিন্তু আলো বা ফোটন একসঙ্গে বহু পথে ছড়িয়ে যেতে পারে। একে ব্যবহার করে একই সময়ে অনেক তথ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব—যাকে বলা হয় সমান্তরাল প্রসেসিং। বিষয়টি সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, বিদ্যুৎ দিয়ে তথ্য পাঠানো যেন এক লাইনের রেলপথে ট্রেন চালানো, আর আলো দিয়ে তথ্য পাঠানো যেন একসঙ্গে বহু লাইনের রেলপথ ব্যবহার করা। এতে পরিবহন যেমন দ্রুত হয়, তেমনি তথ্য প্রক্রিয়াকরণও দ্রুত হয়।

ডক্টর করিমের গবেষণা-জীবনের এক পর্যায়ে এই ধারণা বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে। ইলেকট্রনিক প্রসেসরের সীমাবদ্ধতা তাঁকে ভাবতে বাধ্য করে—যদি আলোর বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানো যায়, তবে কম্পিউটিংয়ের গতি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এই চিন্তা থেকেই তিনি অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ের দিকে মনোযোগ দেন। তাঁর গবেষণায় আলোকে একমাত্রিকভাবে নয়, বরং দ্বিমাত্রিকভাবে ব্যবহার করার ধারণা উঠে আসে। অর্থাৎ, একটি মাত্র পথে আলো পাঠিয়ে কাজ না করে, আলোর বিস্তৃত ক্ষেত্র ব্যবহার করে একসঙ্গে বহু গণনা সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়।

এই গবেষণার প্রয়োগ ক্ষেত্রও ছিল বাস্তবসম্মত। অপটিক্যাল সিস্টেমে ছবি প্রক্রিয়াকরণ, দ্রুতগতির সেন্সর ডেটা বিশ্লেষণ এবং নাইট ভিশন ডিসপ্লের মতো প্রযুক্তিতে তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সামরিক বা উদ্ধার অভিযানে রাতের অন্ধকারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। সেখানে যদি ইমেজ প্রসেসিং ধীরগতির হয়, তবে বিপদের আশঙ্কা বেড়ে যায়। অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ের ধারণা এই ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নির্ভুল বিশ্লেষণের পথ দেখায়।

ডক্টর করিমের অভিজ্ঞতায় এই গবেষণা সহজ ছিল না। নতুন প্রযুক্তির পথে কাজ করতে গিয়ে তহবিল, অবকাঠামো ও আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। পদার্থবিজ্ঞান, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের সমন্বয়ে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কখনো একক বিষয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিভিন্ন শাখার মিলনেই নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

আলোকে সমান্তরাল প্রসেসর হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্য তাই শুধু একটি প্রযুক্তিগত কৌশল নয়; এটি ভবিষ্যৎ কম্পিউটিংয়ের প্রতি এক দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। ডক্টর করিমের গবেষণা-অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায়, প্রচলিত সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই নতুন পথের জন্ম হয়—যে পথে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি আরও দ্রুত, আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন: https://biggani.org/dr_ataul_karim/

ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org