বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে “গবেষণা” শব্দটা এখনো দূরের কোনো পৃথিবীর নাম—যেখানে ঢুকতে গেলে নাকি খুব উঁচু নম্বর, বড় বিশ্ববিদ্যালয়, আর অসাধারণ প্রতিভা লাগে। কিন্তু ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করা সানজিদা আফরিনের পথচলা সেই ভুল ধারণাটাকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়। তাঁর গল্পটা জাঁকজমক নয়; বরং পরিকল্পনা, ধৈর্য, নিজের ভয়কে বোঝা, আর বারবার চেষ্টা করে যাওয়ার গল্প। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন থেকে ইউরোপের গবেষণাগার—তারপর যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ পিএইচডি যাত্রা—সবখানে তিনি বারবার দেখেছেন, “ভালো গবেষক” হওয়া মানে শুধু মেধাবী হওয়া নয়; মানে প্রশ্ন করতে শেখা, সমালোচনা নিতে শেখা, আর ব্যর্থতার ভেতরেও কাজ চালিয়ে যেতে পারা।
বিসিএস থেকে ল্যাবরুম: সিদ্ধান্ত বদলে যাওয়ার মুহূর্ত
সানজিদা আফরিন নিজেই বলেছেন, অনার্স জীবনের প্রথম তিন বছর পর্যন্ত তাঁর লক্ষ্য ছিল অন্য পথে। তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন—যেমন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীই করে থাকে। কিন্তু অনার্সের শেষ বছরে যখন বাধ্যতামূলক একটি প্রজেক্ট ওয়ার্ক শুরু হলো, তখনই তাঁর জীবনে প্রথমবার গবেষণার স্বাদ আসে। ল্যাবের কাজ, গবেষণার নিয়ম-কানুন, প্রশ্নের পেছনে ছোটা—এসব তাঁকে টানতে থাকে। সেই সময় তিনি বুঝতে শুরু করেন, বিসিএসের লম্বা দৌড়টা তাঁর নিজের সঙ্গে ঠিক মানাচ্ছে না; তাঁর আগ্রহ ধীরে ধীরে গবেষণার দিকে স্থির হচ্ছে।
এরপর আসে কোভিড-১৯। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, ফিরে যেতে হয় গ্রামে—দুই বছরের মতো দীর্ঘ এক সময়, যখন ক্লাস নেই, নিয়মিত একাডেমিক ব্যস্ততা নেই। অনেকে এই সময়টাকে “থেমে যাওয়ার সময়” ভাবে; কিন্তু সানজিদা সেটাকে বানিয়েছিলেন “দিক বদলানোর সময়”। ঘরে বসেই তিনি গবেষণা বিষয়ক লেখা পড়েন, জার্নাল পেপার দেখেন, স্কলারশিপের সুযোগগুলো খোঁজেন, LinkedIn–এ বিভিন্ন মানুষের গল্প পড়েন। এভাবেই তাঁর সিদ্ধান্ত দৃঢ় হয়—সরকারি চাকরির পথে নয়, তাঁকে যেতে হবে গবেষণার পথে। সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না, বিশেষ করে পরিবারকে বোঝানো, স্কলারশিপ ম্যানেজ করা—সবই ছিল চ্যালেঞ্জিং। তবু তিনি এগিয়েছেন, কারণ একবার লক্ষ্য ঠিক হলে তিনি সেটাকে “ফুললি ডিটারমাইন্ড” করে ফেলেছিলেন।
একজন শিক্ষক-গবেষকের অনুপ্রেরণা, আর “বাইরের জীবন” দেখার তাগিদ
সানজিদার এই পথচলায় বড় ভূমিকা রেখেছেন তাঁর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সুপারভাইজার—যিনি নিজে সুইজারল্যান্ডে মাস্টার্স করেছেন, জাপানে শিক্ষকতাও করেছেন, এবং এখনও গবেষণার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। এই শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের বারবার বোঝাতেন—দেশে যে চাকরির জন্য তিন-চার বছর ধরে লড়াই করা হয়, সেই তিন-চার বছরে কেউ চাইলে বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসতে পারে। আর গবেষণায় আগ্রহ থাকলে বাংলাদেশের সীমিত রিসোর্স একটা বাস্তব সমস্যা—সেটাও তিনি খোলামেলা বলতেন। এই কথাগুলো সানজিদার ভেতরে এক ধরনের সাহস জাগিয়ে দেয়: “বাইরের জীবনটা দেখা দরকার”—এই ধারণাটা তাঁর কাছে কেবল ভ্রমণ নয়; এটা ছিল শেখার এক নতুন পরিসর।

হাঙ্গেরি বনাম চেক রিপাবলিক: গবেষণা সংস্কৃতির বড় ফারাক
বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর সানজিদা একসঙ্গে দুই ধরনের গবেষণা অভিজ্ঞতা পান—একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক, অন্যদিকে পূর্ণকালীন গবেষণা ইনস্টিটিউট-ভিত্তিক। তিনি দেখেছেন, গবেষণার পরিবেশ শুধু দেশভেদে নয়; আপনি কোথায় কাজ করছেন—ইউনিভার্সিটিতে নাকি গবেষণা ইনস্টিটিউটে—সেটার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।
হাঙ্গেরিতে তাঁর মাস্টার্স ছিল বেশিরভাগই কোর্স-বেসড। মোট ১২০ ক্রেডিটের মধ্যে গবেষণার অংশ ছিল তুলনামূলক কম। পরীক্ষার ধরনও বাংলাদেশের মতো তিন-চার ঘণ্টার দীর্ঘ লিখিত পরীক্ষা নয়; বরং ৪০–৪৫ মিনিটের এমসিকিউ, অনলাইন মার্কিং, এবং অনেক কোর্সে প্রেজেন্টেশন বা শর্ট রিপোর্টের অ্যাসাইনমেন্ট। এই জায়গাটা তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন, কারণ প্রেজেন্টেশন মানে কেবল বক্তৃতা নয়—পেপারের ফলাফল ব্যাখ্যা করা, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, নিজের যুক্তি দাঁড় করানো—এক ধরনের “ডিফেন্স” অনুশীলন। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী গবেষণার কাজ করলেও সবার সামনে নিয়মিতভাবে এভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ পায় না—এই ব্যবধানটা তিনি স্পষ্টভাবে দেখেছেন।
চেক রিপাবলিকে এসে অভিজ্ঞতাটা আরও “ল্যাব-কেন্দ্রিক” ও “ফুল-টাইম” হয়ে যায়। তিনি সরাসরি চেক একাডেমি অফ সায়েন্সেস–এর একটি গবেষণা ল্যাবে যুক্ত হন, যেখানে সপ্তাহে অন্তত ৪০ ঘণ্টা ল্যাব ওয়ার্ক বাধ্যতামূলক। এখানে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রিএজেন্ট, ফান্ড—এসব নিয়ে চিন্তার সুযোগ কম; বরং আপনার কী লাগবে, সুপারভাইজারকে জানালেই অর্ডার হয়ে যায়। এই “ভালোভাবে সাপোর্টেড” পরিবেশ গবেষণাকে দ্রুত এগিয়ে দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে দায়বদ্ধতাও বাড়ায়: সময় দিতে হবে, ফল আনতে হবে, নিয়মিত কাজ করতে হবে।
আরেকটা বড় পার্থক্য তিনি দেখেছেন টিমওয়ার্কে। ইউরোপের গবেষণাগারে পোস্টডক, পিএইচডি শিক্ষার্থী, থিসিস স্টুডেন্ট, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট—সবাই মিলে কাজ ভাগ করে নেয়। আপনার প্রজেক্ট আপনারই, কিন্তু কাজের অংশগুলো ভাগ হয়ে যায়; তারপর আপনি সব ডেটা একত্র করে বিশ্লেষণ করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার—ক্রিয়েটিভ থিংকিং। কীভাবে প্রজেক্ট ডিজাইন করবেন, কোন পথে এগোবেন, কীভাবে সমস্যার সমাধান করবেন—এই সিদ্ধান্তগুলোতে আপনাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সুপারভাইজারের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলেও সাপ্তাহিক বা মাসিক রিপোর্টের কাঠামো থাকে, এবং সমস্যা হলে তখনই আলোচনা হয়। ফলাফল—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে ওঠে।
গবেষণায় “সমালোচনা” মানে অপমান নয়, শেখার হাতিয়ার
বিদেশের গবেষণা পরিবেশে সানজিদা যে বিষয়টা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে বলে বলেছেন, তা হলো—ক্রিটিক্যাল থিংকিং, নিজের আইডিয়া তৈরি করা, এবং সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নেওয়া। ল্যাবের মাসিক মিটিংয়ে সবাইকে রেজাল্ট প্রেজেন্ট করতে হয়, আর সেখানে প্রশ্ন, আপত্তি, মন্তব্য—সবকিছু খোলাখুলি আসে। কেউ যদি বলে, “এই জায়গাটায় অসংগতি আছে,” সেটা অপমান নয়; বরং উন্নতির সুযোগ। এমন সমালোচনার মধ্য দিয়েই গবেষণা এগোয়।
এখানেই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় দুর্বলতার কথা তিনি তুলেছেন—আমরা প্রশ্ন করতে ভয় পাই। ক্লাস বা প্রেজেন্টেশনে কিছু না বুঝলেও অনেক শিক্ষার্থী সবার সামনে প্রশ্ন না করে পরে ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে প্রশ্ন করে। কিন্তু গবেষণার জগতে এই ভয় কাটানো জরুরি। কারণ আপনি প্রশ্ন করলে শুধু আপনি উপকৃত হন না; আপনার মতো আরও অনেকেই উপকৃত হয়, যাদের একই প্রশ্ন ছিল কিন্তু সাহস হয়নি জিজ্ঞেস করার।
সি. এলিগ্যান্স থেকে এমজিটি: ছোট প্রাণী, বড় প্রশ্ন
সানজিদার বর্তমান গবেষণা-জগৎ খুব আকর্ষণীয়, কারণ তিনি কাজ করছেন এক ধরনের “মডেল অর্গানিজম” নিয়ে। মডেল অর্গানিজম মানে এমন একটি জীব বা প্রজাতি, যাকে গবেষণার জন্য আদর্শ ধরা হয়—কারণ এর জেনেটিক তথ্য, জীবনচক্র, ও গবেষণা-ইতিহাস সমৃদ্ধ, এবং অন্য প্রাণীর জৈবপ্রক্রিয়া বোঝার জন্য এর ওপর পরীক্ষা করা তুলনামূলক সহজ।
তিনি বর্তমানে কাজ করছেন Caenorhabditis elegans (সেনোরাবিডিটিস এলিগ্যান্স) নামের এক ধরনের ক্ষুদ্র নেমাটোড—খুব ছোট কৃমির মতো প্রাণী। এই প্রাণীর সুবিধা হলো: এর জেনেটিক ডেটা ও বহু গবেষণার ফলাফল অনলাইনে সহজে পাওয়া যায়; অনেক কিছু আগেই “ওয়েল-স্ট্যাবলিশড।” তবে এর চ্যালেঞ্জও আছে। এর জীবনচক্র খুব ছোট—মোট দুই থেকে তিন সপ্তাহ, আর ডিম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হতে সময় লাগে প্রায় তিন দিন। ফলে ল্যাবের কাজগুলোকে খুব দ্রুত, খুব নিখুঁতভাবে সমন্বয় করতে হয়—কালচার মেইনটেনেন্স, সিঙ্ক্রোনাইজেশন, PCR, ওয়েস্টার্ন ব্লট—সবকিছু সময়মতো করতে না পারলে ফলাফলে ভিন্নতা চলে আসে। তাপমাত্রা ২০–২৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখতে হয়; সামান্য ওঠানামায় গ্রোথ নষ্ট হতে পারে। কালচার প্লেটে ফাঙ্গাল বা ভাইরাল সংক্রমণ হলেই পুরো কালচার ফেলে দিতে হয়। আর এইসব কারণেই অনেক সময় তিন-চারবার রিপ্লিকেশন যথেষ্ট হয় না; ১০–১১ বার পর্যন্ত রিপ্লিকেশন করতে হয়, যাতে পরিবেশগত প্রভাবের কারণে ফলাফল ভুল পথে না চলে যায়।
এই কাজের পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত কৌতূহলও আছে। হাঙ্গেরিতে পড়ার সময় তিনি দেখেছিলেন অটিজম নিয়ে কাজ করা এক প্রফেসরের ল্যাব—সেখান থেকে তাঁর ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজির আগ্রহ বাড়ে। তাঁর মাথায় আসে বাংলাদেশের বাস্তবতা—অটিস্টিক শিশুদের সংখ্যা, গর্ভাবস্থায় বা জন্মের পর জেনেটিক জটিলতা—এসব বোঝার জন্য জীবনের একদম শুরুটা বোঝা দরকার।
আর এখান থেকেই আসে তাঁর মূল গবেষণা প্রসঙ্গ: MZT—Maternal-to-Zygotic Transition।
সোজা করে বললে, জীবনের শুরুতে ভ্রূণের “প্রথম ক’টা পদক্ষেপ” অনেকটা মায়ের দেওয়া প্রস্তুতি দিয়ে হয়—মায়ের দেহ থেকে আসা RNA, প্রোটিন, শক্তি—এগুলো ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ চালায়। তারপর একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে এসে ভ্রূণ নিজে নিজের “জেনেটিক ইঞ্জিন” চালু করে—নিজের RNA তৈরি শুরু করে, জিন এক্সপ্রেশন শুরু হয়। এই বদলে যাওয়ার সময়টাই MZT। ঠিক এই সময়েই অনেক জেনেটিক সমস্যার সূচনা হতে পারে—অটিজমের মতো জটিল অবস্থার ক্ষেত্রে যে জেনেটিক “মিসম্যাচ” বা ত্রুটি ঘটে, তার শিকড় বোঝার জন্য এই পর্যায়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।

পেপার, কনফারেন্স, ওয়ার্কশপ: “বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ” বানানোর পথ
সানজিদা বারবার জোর দিয়েছেন একটি কথায়—দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফান্ডিং বা পিএইচডি সুযোগ পেতে হলে শুধু “আমি আগ্রহী” বললেই হবে না। আপনাকে প্রমাণ দেখাতে হবে যে আপনি গবেষণার পরিবেশে কাজ করেছেন, আপনি শেখার জন্য প্রস্তুত, এবং আপনার কাজের একটা রেকর্ড আছে। সেই প্রমাণ তৈরি হয়—পাবলিকেশন, কনফারেন্স প্রেজেন্টেশন, পোস্টার প্রেজেন্টেশন, ওয়ার্কশপ ট্রেনিং—এইসবের মাধ্যমে।
তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, ইউরোপে EMBL/EMBO–র মতো প্রতিষ্ঠানের ১০–১২ দিনের দীর্ঘ ওয়ার্কশপে তিনি হাতে-কলমে ট্রেনিং পেয়েছেন। PCR বা ইমিউনোফ্লোরোসেন্সের মতো পদ্ধতি শেখার পাশাপাশি, সি. এলিগ্যান্স নিয়ে কাজের “প্রথম হাতেখড়ি”ও তাঁর হয়েছিল এই ধরনের আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপে। এই জায়গাটাকে তিনি “ব্লেসিং” বলেছেন—কারণ এখানে শুধু তত্ত্ব নয়, গবেষণার বাস্তব কৌশল শেখানো হয়।
আর এইসব জায়গার আরেকটা বড় লাভ—নেটওয়ার্কিং। নতুন গবেষক হিসেবে কারা কীভাবে কাজ করে, কোন পথে এগোয়, কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলে—এসব শেখার সবচেয়ে দ্রুত পথ হলো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ। তিনি বিজ্ঞানী ডট অর্গের কাজকেও এই কারণে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন—এখানে শিক্ষার্থীরা গবেষকদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে, প্রশ্ন করতে পারছে, ভাবনার খোরাক পাচ্ছে।
“নিজের সাবজেক্টের বাইরে কাজ করলে লাভ হবে?”—উত্তর হলো, অবশ্যই
বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী ভাবেন, নিজের সাবজেক্টের বাইরে গেলে গবেষণার লাভ নেই। সানজিদা এই ধারণাটাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর নিজের যাত্রাই তার প্রমাণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ক্রপ প্রোটেকশন ও টক্সিকোলজি—বায়োপেস্টিসাইড নিয়ে কাজ। এরপর হাঙ্গেরিতে তিনি পড়েছেন নিউরোসায়েন্স ও হিউম্যান বায়োলজি। তাঁর থিসিস ছিল প্রাণীর আচরণ ও কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের সংযোগ বিষয়ে। তারপর চেক রিপাবলিকে তিনি গেলেন ডেভেলপমেন্টাল বায়োলজিতে। আর এখন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর কাজ এভোলুশনারি বায়োলজি ও মলিকুলার বায়োলজির সংযোগে—MZT–এর মতো মৌলিক প্রসঙ্গে।
অর্থাৎ গবেষণার ক্ষেত্র বদলাতে পারে, আগ্রহ বদলাতে পারে। আজ যে বিষয় শিখছেন, কাল অন্য বিষয় বেছে নিতেই পারেন। তাই শুরুটা যে কোনো জায়গা থেকে হতে পারে—উদ্দেশ্য হলো গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকা, শেখার অভ্যাস তৈরি করা, এবং পরিচয় তৈরি করা যে আপনি একজন গবেষণার পথে হাঁটছেন। এমনকি যে গবেষণাপত্র আপনার মূল আগ্রহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, সেটাও পরোক্ষভাবে কাজে লাগতে পারে—সাইটেশন বাড়ে, আপনার গবেষক পরিচয় শক্ত হয়, আবেদনপত্রে আপনার “প্রমাণের তালিকা” সমৃদ্ধ হয়।
“আমি আর পারবো না”—এই মুহূর্ত আসে, তবু থামতে নেই
গবেষণা জীবনের সবচেয়ে মানবিক অংশটা উঠে এসেছে যখন তিনি বলেছেন—একসময় মনে হয়, “আমি গবেষণাটা কেন নিলাম?” এই ভাবনা সাধারণত আসে তখন, যখন প্রত্যাশিত ফল আসে না। কখনো প্রথমবার ফল ঠিক আসে, কিন্তু পরের রিপ্লিকেশনগুলোতে ফল একদম উল্টো হয়ে যায়। তখন মনে হয়, হয়তো আমি ভুল পথে আছি, হয়তো আমার দ্বারা হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটা কঠিন বাস্তবতা—দেশের বাইরে একা থাকা। লোনলিনেস, পরিচিত মানুষ না থাকা, ভাষার সমস্যা—এসব মানসিক চাপকে বাড়িয়ে দেয়। এই জায়গায় সানজিদার “কাউন্টার মেজার” ছিল একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি: নেগেটিভ রেজাল্টও রেজাল্ট। অর্থাৎ, আপনার অনুমান সত্য হলো না—এটাও গবেষণার তথ্য। অনেক সময় নেগেটিভ ফলাফলও ধাপে ধাপে প্রকাশ করা যায়, কারণ এটা ভবিষ্যতের গবেষকদের বলে দেয়—এই পথে গেলে এটা হয় না। আর সমস্যা হলে নিজের ভুল ধরার জন্য তিনি বারবার চেষ্টা করেন, আরও রিপ্লিকেশন দেন, সহকর্মী ও সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করেন, সুপারভাইজারের সঙ্গে সাপ্তাহিক মিটিংয়ে সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করেন। গবেষণার মানে এখানেই—একজন মানুষ একা নয়; ল্যাবমেট, মেন্টর, সুপারভাইজার—এই যোগাযোগের ভেতরেই অনেক জট খুলে যায়।
সিজিপিএ কম হলে কি স্বপ্ন শেষ? সানজিদার উত্তর—না
অনেক শিক্ষার্থী একটি খারাপ সেমিস্টার বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সিজিপিএ কমে গেলে ভেঙে পড়ে। সানজিদা পরিষ্কারভাবে বলেছেন—রেজাল্ট বড় ফ্যাক্টর, কিন্তু সবকিছু নয়। তিনি উদাহরণ দিয়েছেন, ইরাসমাস মন্ডাসের মতো বড় স্কলারশিপেও তুলনামূলক কম সিজিপিএ নিয়ে সিলেক্ট হওয়ার নজির আছে। বিশেষ করে পিএইচডি পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করলে গ্রেডের চেয়ে গবেষণা অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, আর স্টেটমেন্ট অফ পারপাস বা মোটিভেশন লেটার অনেক বড় ভূমিকা রাখে। আপনার পেপার, রিসার্চ ইনভলভমেন্ট, ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স—এসব আপনার দুর্বল জায়গাকে শক্তিতে বদলে দিতে পারে।
আরেকটি বিষয় তিনি জোর দিয়ে বলেছেন—এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস। পড়াশোনার বাইরে আপনি কী করছেন—ক্লাবিং, অলিম্পিয়াড, স্কাউটিং, কনটেন্ট রাইটিং, স্বেচ্ছাসেবী কাজ—এসব দেখায় আপনি সময় ব্যবস্থাপনা করতে পারেন, আপনি অলরাউন্ডার, আপনি দায়িত্ব নিতে পারেন। অনেক প্রতিষ্ঠান “বুকওয়ার্ম” নয়, বরং ব্যালান্সড শিক্ষার্থী খোঁজে—এটাই তার যুক্তি।
শেষে তিনি যে বিষয়টাকে সবচেয়ে জরুরি বলেছেন—ইংরেজি দক্ষতা। ভালো জার্নাল পড়া, গবেষণার লেখা বোঝা, আবেদনপত্র লেখা, কনফারেন্সে কথা বলা—সবখানেই ইংরেজি লাগে। ইউরোপে থেকেও তিনি দেখেছেন, লোকাল ভাষা না জানলে ভাষার বাধা থাকবেই; তবু ইংরেজি জানা থাকলে অন্তত কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। তাই ইংরেজি না শিখে ভালো সুযোগ পাওয়ার পথটা সত্যিই কঠিন।
ভালো জার্নাল বনাম দ্রুত প্রকাশ: বাস্তব সিদ্ধান্তের শিক্ষা
একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করেছিলেন—পেপার কোথায় প্রকাশ করলে বেশি লাভ, আর ভালো জায়গায় না হলে কি ক্ষতি? সানজিদা বাস্তব কথাই বলেছেন: জার্নাল নির্বাচন কাজের মান, ফলাফল, এবং লেখার গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে। কিউ১, কিউ২, কিউ৩—এগুলো মূলত জার্নালের মান-সূচকের শ্রেণিবিন্যাস। সবচেয়ে উচ্চমানের জার্নালে (যেমন কিউ১) প্রকাশ পেতে সময় বেশি লাগে, যাচাই-বাছাই কঠোর হয়, রিভিউ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। তুলনামূলক মাঝারি জার্নালে দ্রুত প্রকাশ সম্ভব। মাস্টার্স পর্যায়ে “অন্তত গবেষণা অভিজ্ঞতা আছে”—এটাই বড় কথা। পিএইচডিতে ভালো আন্তর্জাতিক জার্নালে অন্তত একটি পেপার থাকলে সুবিধা হয়, কিন্তু কেউ সাধারণত “শুধু কিউ১” বাধ্যতামূলক করে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—সুপারভাইজারের সঙ্গে বসে লক্ষ্য ঠিক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া: দ্রুত প্রকাশ দরকার, নাকি উচ্চমানের জার্নালে দীর্ঘ অপেক্ষা?

গবেষণা ভয়ংকর নয়—কঠিন, কিন্তু সম্ভব
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি মানসিক বাধা হলো—গবেষণা মানে অসম্ভব কঠিন কিছু। সানজিদা বলেছেন, গবেষণা কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব নয়। পরিকল্পনা করলে, লক্ষ্য ঠিক করলে, ধাপে ধাপে পড়াশোনা শুরু করলে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী কাজ হয়েছে তা দেখলে—গবেষণার মানচিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। এখন আগের তুলনায় তথ্যও বেশি পাওয়া যায়—সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, অভিজ্ঞ মানুষের লেখা—সবকিছু হাতের কাছে। ভিসা-জটিলতা বা নানা বাধা থাকলেও প্রতি বছর বহু শিক্ষার্থী যাচ্ছে—মানে, পথটা খোলা আছে। দরকার শুধু একটা মানসিক প্রস্তুতি: রিজেকশন আসবে, সেটা স্বাভাবিক; এটাকে শেখার অংশ হিসেবে নিতে হবে। শর্টকাট নেই—লং টার্ম পরিকল্পনা করে সামনে এগোতে হবে।
স্ট্রেস, একঘেয়েমি, ভাষার বাধা: নিজেকে ঠিক রাখার কৌশল
পরিশ্রম করতে করতে একসময় মন খারাপ হয়, কাজ একঘেয়ে লাগে—এটা তিনি অস্বীকার করেননি। বরং বলেছেন, একঘেয়েমি কাটাতে পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য কাজে যুক্ত থাকতে হবে। শুধু রুটিনমাফিক জীবন নয়—কখনো বিরতি, কখনো হাঁটাহাঁটি, কখনো গল্পের বই, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সিনেমা দেখা—সবই দরকার। লক্ষ্য ঠিক রেখে নিজের মতো করে সময়কে ব্যালান্স করতে হবে। অন্যের রুটিন হুবহু অনুসরণ করে নিজের জীবন চালানো যায় না; নিজের শরীর-মন বুঝে নিজেরই কৌশল বানাতে হয়।
সামনের পথ: পাঁচ বছরের গবেষণা, বড় স্বপ্নের বিস্তার
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সানজিদার পিএইচডির সময়কাল পাঁচ থেকে ছয় বছর। তাঁর গবেষণার মূল ফোকাস—Species barrier and maternal protein degradation during maternal-to-zygotic transition, যা মলিকুলার ও এভোলুশনারি বায়োলজির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। তিনি শুরু করেছেন নেমাটোডের দু’টি প্রজাতি নিয়ে, কিন্তু তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন—এই কাজ শুধু নেমাটোডে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর কাছে চেক রিপাবলিকের ম্যামালিয়ান স্পিসিস নিয়ে আগের কিছু রেজাল্ট আছে, এখানে ইনভার্টিব্রেট দিয়ে শুরু করেছেন, আর ভবিষ্যতে মলাস্কা, একাইনোডার্মার মতো উচ্চতর ফাইলাম পর্যন্ত বিস্তারের ইচ্ছে আছে। লক্ষ্যটা বড়—লোয়ার লেভেল থেকে ম্যামালিয়ান কর্ডেট পর্যন্ত বিবর্তনের ধারায় এই প্রোটিন ডিগ্রেডেশন ও জেনেটিক ফ্লো কীভাবে বদলায়, সেটার একটা বিস্তৃত ছবি তৈরি করা। কাজটা বড়, সময়ও লাগবে; প্রয়োজন হলে পোস্টডক পর্যায়েও এটি এগিয়ে নেওয়ার ইচ্ছে তিনি রাখছেন।
শেষ কথা: একজন গবেষকের পথে বাংলাদেশকে নতুনভাবে দেখা
সানজিদা আফরিনের গল্প আমাদের একটাই জোরালো শিক্ষা দেয়—গবেষণা কোনো “অলৌকিক প্রতিভার” একচেটিয়া মাঠ নয়; এটা নিয়মিত প্রস্তুতির মাঠ। এখানে সাহস লাগে—বিসিএসের পথ ছেড়ে অন্য পথে যাওয়ার সাহস। ধৈর্য লাগে—বারবার ব্যর্থ হলেও লেগে থাকার ধৈর্য। শৃঙ্খলা লাগে—ওয়ার্কশপ, কনফারেন্স, লেখালেখি, নেটওয়ার্কিং—সবকিছুকে একসঙ্গে সামলানোর শৃঙ্খলা। আর সবচেয়ে বেশি লাগে প্রশ্ন করার অভ্যাস—নিজের অজানা জায়গাকে স্বীকার করে, সবার সামনে প্রশ্ন করার অভ্যাস।
আজ যে শিক্ষার্থী ভয় পায়—“আমি কি পারবো?”—তার জন্য সানজিদার যাত্রা এক ধরনের আশ্বাস: পারা যায়। পথটা লম্বা, কখনো একা লাগে, কখনো রিজেকশন আসে, কখনো ফলাফল নেগেটিভ হয়—তবু পারা যায়। কারণ গবেষণার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটা মানুষের ভেতরের অধ্যবসায়কে বিজ্ঞান বানিয়ে দেয়। আর সেই বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়েই বাংলাদেশের তরুণেরা যদি বিশ্ব গবেষণার মঞ্চে দাঁড়ায়, সেটাই তো জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব—এবং আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
সাক্ষাৎকারটি ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি পরিচালনা করেছিল বিজ্ঞানী অর্গ এর ভলেন্টিয়ার জাকিয়া খাতুন তাকি এবং হাসনা বানু মুমু।
সানজিদা আফরিনের সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇

Leave a comment