সম্পাদকীয়

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা কখনোই সবচেয়ে স্মার্ট ছিলেন না

Share
Share

ড. মশিউর রহমান

আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি গবেষণার সাফল্যকে মাপতে সিভির পাতায়। কোন বিশ্ববিদ্যালয়, কত জিপিএ, কত ফান্ডিং, কোন জার্নাল। এই তালিকায় একটি শব্দ অনুপস্থিত থেকে যায় প্রায়শই, সেটি হলো প্যাশন। অথচ বাস্তবতা হলো, গবেষক তৈরি হয় আগ্রহ থেকে, আর আগুন ছাড়া আগ্রহ টেকে না। পৃথিবীর বড় গবেষণাগারগুলো ভালোভাবে দেখলে বোঝা যায়, সেখানে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দেয় না কে কতটা মেধাবী, বরং কে কতটা জেদি।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, ডক্টরাল (পিএইচডি) ছাত্রদের মধ্যে যারা গবেষণাপথ মাঝপথে ছেড়ে দেন, তাদের সিংহভাগই ছাড়েন বিষয়ের কঠিনতার কারণে নয়, বরং মানসিক ক্লান্তি, অনুপ্রেরণার অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার চাপের কারণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর যারা পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হন, তাদের প্রায় অর্ধেক শেষ করতে পারেন না। এই পরিসংখ্যান বলে দেয়, বিষয় জানলেই গবেষণা টেকে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বিশাল গবেষণা সমীক্ষায় দেখা গেছে, গবেষণায় ব্যর্থ স্টার্টআপ প্রকল্পের প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ ভেঙে পড়ে ফান্ড শেষ হয়ে যাওয়ার আগে, অর্থাৎ সমস্যা ছিল না টাকায়, সমস্যা ছিল নেতৃত্বে আগ্রহ ও ধৈর্যের অভাবে। প্রযুক্তি খাতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের উপর করা মার্কিন জরিপে দেখা গেছে, সফল গবেষণা উদ্যোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিষ্ঠাতার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি, যেখানে বুদ্ধিমত্তা ও প্রাথমিক তহবিল ছিল গৌণ উপাদান।

বিশ্বের বৃহত্তম গবেষণা তহবিল ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর রিপোর্ট বলছে, একটি গবেষণা প্রকল্পকে বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে গড়ে দশবার ব্যর্থ হতে হয়। একটি ওষুধ বাজারে আনতে প্রায় দশ থেকে পনেরো বছর সময় লাগে এবং হাজার হাজার ব্যর্থ যৌগের ভিড় থেকে একটি সফল অণু উঠে আসে। এই দীর্ঘ যাত্রায় যদি গবেষকের ভেতরে আগুন না থাকে, তবে আধপথেই খেলার শেষ ঘোষণা হয়ে যায়।

পরিসংখ্যান আরও কঠিন কথা বলে। যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর যেসব প্রস্তাবনা তাদের কাছে জমা পড়ে, তার প্রায় আশি শতাংশই তহবিল পায় না। অর্থাৎ অধিকাংশ গবেষক প্রথম ধাক্কায় বাদ পড়েন। কিন্তু যারা সফল হন, তারা মূলত তারাই যারা একবার না শুনে দশবার চেষ্টা করেন।

প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জগতে এই সত্য আরও স্পষ্ট। বিশ্বের শীর্ষ এক শত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠাতার উপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের গড় আইকিউ জাতীয় গড়ের তুলনায় খুব বেশি নয়। তারা অতি প্রতিভাবান ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন অস্বাভাবিক পরিশ্রমী। তাদের অধিকাংশই তাদের প্রথম উদ্যোগে ব্যর্থ হয়েছিলেন, অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার গিয়ে সাফল্য পেয়েছেন। অর্থাৎ মেধা নয়, প্রতিশ্রুতিই শেষ কথা।

শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা হলো, আমরা ছাত্রদের শেখাই কীভাবে উত্তর লিখতে হয়, শেখাই না কীভাবে ব্যর্থতা সহ্য করতে হয়। আমরা সেরা হওয়াকে পুরস্কৃত করি, টিকে থাকাকে নয়। ফলে গবেষণায় গিয়ে তারা বুঝতেই পারে না, দীর্ঘদিন কাজ করেও কোনো ফল না পাওয়া মানে ব্যর্থতা নয়, বরং প্রক্রিয়ার অংশ।

ফান্ড অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি প্রাথমিক জ্বালানি মাত্র। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, বড় অর্থ বরাদ্দ পেয়েও গবেষণা ভেঙে পড়েছে, কারণ প্রকল্পের নেতৃত্বের মধ্যে দিশা ছিল না। আবার ক্ষুদ্র তহবিল থেকে জন্ম নিয়েছে বৈপ্লবিক আবিষ্কার, কারণ সেখানে ছিল অটুট আগ্রহ। ইতিহাসের দিকে তাকালেই দেখা যায়, বহু যুগান্তকারী আবিষ্কার এসেছে ছোট ল্যাব, অস্থায়ী কাঠামো ও সীমিত সম্পদ থেকে।

আজকের বাংলাদেশি বাস্তবতায় এই বার্তাটি আরও জরুরি। আমাদের তরুণ গবেষকেরা প্রায়ই বলেন, সুযোগ নেই, টাকা নেই, যন্ত্র নেই। কথাগুলো মিথ্যা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাধা পেয়ে কে থামে, আর কে লড়াই চালায়। কারণ যদি আগ্রহ ফুরিয়ে যায়, তবে বড় ল্যাবও জঞ্জাল হয়ে যায়।

গবেষণায় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ টাকা নয়, মানুষ। বিশেষ করে মানুষটি যদি হাল না ছাড়ে। প্যাশন মানে উন্মাদনা নয়, প্যাশন মানে প্রতিদিন নিজেকে কাজে ফেরানো। ফল না এলেও ফিরে আসা। অনিশ্চয়তার মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকা।

আমরা যদি গবেষণায় সাফল্য চাই, তবে আমাদের ছাত্রদের আগে শেখাতে হবে ভালোবাসতে, দায় নিতে এবং জেদের সঙ্গে স্বপ্ন দেখতে। ডিগ্রির পেছনে দৌড়ানো দিয়ে গবেষক তৈরি হয় না। স্মার্টনেস দিয়ে একদিন জেতা যায়, প্যাশন দিয়ে জেতা যায় এক যুগ।

শেষ পর্যন্ত গবেষণার ইতিহাস একটি কথাই বলে, আগুন ছাড়া আলো জ্বলে না। ডিগ্রি কাগজে থাকে, টাকা ফুরিয়ে যায়, স্মার্টনেস ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু প্যাশন থাকলে, গবেষণা বেঁচে থাকে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org