চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

“শরীরের ভেতরের পানি আর চর্বির হিসাব না জানলে সঠিক চিকিৎসা অসম্ভব” – ড. আবু খালেদ

Share
Share

একজন রোগী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে সাধারণত তার জ্বর, রক্তচাপ, পালস বা শ্বাস-প্রশ্বাস মাপা হয়। কিন্তু শরীরের ভেতরে ঠিক কী ঘটছে—কতটুকু পানি কমেছে, কতটা চর্বি বা পেশির পরিবর্তন হয়েছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রায়ই থেকে যায় অজানা। ড. আবু খালেদের মতে, এই অজানা জায়গাটিই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তাঁর ভাষায়, “শরীরের ভেতরের পানি আর চর্বির হিসাব না জানলে সঠিক চিকিৎসা অসম্ভব।” এই উপলব্ধিই তাঁকে মানবপুষ্টি ও বডি কম্পোজিশন গবেষণায় গভীরভাবে যুক্ত করেছে।

মানবদেহকে যদি একটি যন্ত্র হিসেবে ভাবা হয়, তাহলে তার ভেতরের প্রতিটি অংশের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে যন্ত্রটি ঠিকমতো কাজ করে না। শরীরের মোট ওজনের একটি বড় অংশই পানি। এই পানি শুধু তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নয়—রক্ত চলাচল, পুষ্টি পরিবহন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সাথেই জড়িত। আবার শরীরের চর্বি শুধু শক্তির ভাণ্ডার নয়, অতিরিক্ত হলে তা ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ আমাদের দৈনন্দিন চিকিৎসায় শরীরের এই ভেতরের গঠন খুব কমই নিয়মিতভাবে পরিমাপ করা হয়।

ড. আবু খালেদ দেখিয়েছেন, রোগের সময় শরীরের ভেতরের ভারসাম্য দ্রুত বদলে যায়। যেমন ডায়রিয়া বা কলেরায় আক্রান্ত হলে শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইট খুব দ্রুত কমে যায়। আবার দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভুগলে শরীরের প্রোটিন ভেঙে পেশি ক্ষয় শুরু হয়। বাইরে থেকে রোগীকে দেখে অনেক সময় এই পরিবর্তন বোঝা যায় না। ফলে চিকিৎসা পরিকল্পনায় ভুল হতে পারে—কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় কম ফ্লুইড দেওয়া হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে বেশি দেওয়া হয়ে যায়। দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি থাকে।

এই জায়গায় ড. খালেদের গবেষণার বড় অবদান হলো শরীরের ভেতরের হিসাব বের করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি জনপ্রিয় করা। Bioelectrical Impedance Analysis (BIA) পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরের পানি ও চর্বির অনুপাত জানা যায়। খুব সামান্য বৈদ্যুতিক কারেন্ট শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে এই হিসাব করা হয়। পানি বিদ্যুৎ সহজে বহন করে, আর চর্বি বাধা সৃষ্টি করে—এই বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করেই শরীরের ভেতরের গঠন নির্ণয় করা সম্ভব। ফলে রোগীর প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় সংখ্যায়, অনুমানে নয়।

এই পদ্ধতি শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ওজন শুধু বাড়লেই যে তারা সুস্থ হচ্ছে—এমনটা সব সময় নয়। ওজন বাড়লেও তা যদি মূলত চর্বি থেকে আসে, আর পেশি বা প্রোটিন না বাড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ড. খালেদের কাজ দেখিয়েছে, বডি কম্পোজিশন মাপলে বোঝা যায় শিশুর বৃদ্ধি স্বাস্থ্যকর পথে যাচ্ছে কি না। এমনকি প্রিম্যাচিউর বেবিদের ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরের পানির ভারসাম্য দেখে তাদের ঝুঁকির মাত্রা আগেভাগেই আন্দাজ করা যায়।

ড. আবু খালেদের মতে, উন্নত বিশ্বে চিকিৎসা ক্রমেই ডেটা-নির্ভর হয়ে উঠছে। শুধু লক্ষণ দেখে নয়, সংখ্যায় মাপা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা অভিজ্ঞতা ও অনুমানের ওপর নির্ভরশীল। তিনি মনে করেন, শরীরের ভেতরের তথ্য সহজে মাপার প্রযুক্তি যদি সস্তা ও সহজলভ্য করা যায়, তাহলে আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও যদি রোগীর শরীরের ভেতরের পানি ও পুষ্টির অবস্থা দ্রুত জানা যায়, তাহলে চিকিৎসা হবে আরও নির্ভুল ও নিরাপদ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—ড. খালেদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার চিন্তাধারাকে বদলে দেওয়ার আহ্বান জানায়। অসুখকে শুধু বাহ্যিক লক্ষণ দিয়ে বিচার না করে, শরীরের ভেতরের ভারসাম্য বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই আধুনিক চিকিৎসার পথ। কারণ মানুষের শরীর একটি জটিল ব্যবস্থা—ভেতরের হিসাব না জানলে সেই ব্যবস্থার সঠিক যত্ন নেওয়া সম্ভব নয়।

ড. খালেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:


Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org