বাংলাদেশে প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে যে জনআলোচনা তৈরি হয়, সেখানে এক ধরনের পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন আছে। বহু বছর আগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্লাসে আমি হঠাৎ মন্তব্য করেছিলাম যে আমাদের দেশে বৈশ্বিক প্রযুক্তি আসে কমপক্ষে আট বছর দেরিতে। তখন এটি VoIP প্রযুক্তির প্রেক্ষিতে উদাহরণ হিসেবে বলেছিলাম। পরে একজন ছাত্র—যার নাম এখন মনে নেই, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে—হেসে বলেছিল, “স্যার, শুধু VoIP না, প্রায় সব প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই আট বছরের নিয়মটা ঠিকই খাটে।” আজ, এক দশক পর, বাংলাদেশের প্রযুক্তি–বাতাসে মাঝে মাঝে যে উত্তেজনা ওঠে, তা দেখলে মনে হয়—হ্যাঁ, সেই ছাত্রটি ঠিকই বলেছিল।
যে প্রযুক্তিগুলোকে আমাদের গণমাধ্যমে “অভূতপূর্ব আবিষ্কার” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তার বেশিরভাগই আসলে বহু আগেই বিশ্বজুড়ে ব্যবহারিক বাস্তবতায় পৌঁছে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, যা নিয়ে সাম্প্রতিক হইচই—IoT সেন্সর এবং সাধারণ মাইক্রোকন্ট্রোলার মডিউল—সেগুলো ২০১৩ সালে সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে সাংহাই পর্যন্ত সর্বত্র স্টার্টআপগুলো বানিয়ে ফেলেছিল। আলিবাবা বা আলিএক্সপ্রেসে পাঁচ ডলার থেকে পনের ডলারের মধ্যেই সেন্সর সেট পাওয়া যায়, যা দিয়ে যেকোনো স্নাতক বর্ষের ছাত্রও সহজেই একটি সাধারণ IoT ডিভাইস বানাতে পারে। পেটেন্টের প্রয়োজন নেই, মিডিয়ার আলো ঝলমলও নয়। এ কারণেই সিঙ্গাপুরে ২০১২ সালের স্টার্টআপ প্রদর্শনীতে আমি এমন অসংখ্য সমাধান দেখেছি, যেগুলোর দিকে আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যম তাকিয়ে “অভূতপূর্ব আবিষ্কার” বলে বর্ণনা করছে।
গত দশকে মালয়েশিয়া, ভারত, ভিয়েতনামে IoT ভিত্তিক ৪০০টিরও বেশি স্টার্টআপ বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছে। ভারতে ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে IoT বাজারের আকার ১৩.৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার IoT বাজার বার্ষিক প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। অথচ আমরা এখনও মিডিয়ায় এমনভাবে এই প্রযুক্তিগুলিকে উপস্থাপন করি যেন এটি এক বিরাট বিপ্লব, যা গোটা বিশ্বকে বদলে দেবে।
বাংলাদেশে প্রযুক্তি–খবরের আরেকটি সমস্যা হলো—উত্তেজনা, অতিরঞ্জন, এবং যাচাইয়ের অভাব। ২০২১ সালে শাহজালাল বিমানবন্দরে “পাঁচ মিনিটে ক্যান্সার শনাক্ত” সম্ভব বলে যে হৈচৈ উঠেছিল, তার একটিও তথ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যাচাই হয়নি। অথচ অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পর্যন্ত অনেকেই সেই দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। এটি শুধু সাংবাদিকতার ব্যর্থতা নয়—বরং আমাদের বৈজ্ঞানিক চর্চার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
এখানে একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট। আমাদের দেশে “আবিষ্কার” সাধারণত এক–দুজন ছাত্র বা অধ্যাপককে কেন্দ্র করে তৈরি হয়, যাদের ইন্ডাস্ট্রি এক্সপোজার খুব সীমিত। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একটি সংবাদ সম্মেলন ডেকে ঘোষণা করেন যে “বিশ্বকে বদলে দেওয়ার মতো আবিষ্কার করে ফেলেছেন।” এরপর মিডিয়া সেই বক্তব্যকে বাড়িয়ে তা “ঐতিহাসিক সাফল্য” হিসেবে প্রকাশ করে। কোনো আন্তর্জাতিক জার্নাল—যার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর দিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মান পরিমাপ করা যায়—সেগুলোতে প্রকাশ হয় না। ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞদের রিভিউ তো দূরের কথা, বরং বিজ্ঞানের পরিবর্তে আমাদের রাজনীতিবিদদের আমন্ত্রণ করা হয়, যাতে সংবাদটি আরও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষণা ফল যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্যাটেন্টের অবস্থাও বেশ অস্পষ্ট। যে কেউ নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে তুচ্ছ বিষয়েও পেটেন্ট জমা দিতে পারেন। দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন পেটেন্ট আবেদন করা হলেও মাত্র ১ শতাংশের কম বাস্তব বাণিজ্যিক প্রভাব সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে এই হার আরও কম—প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
প্রযুক্তিগত গবেষণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে একটি আবিষ্কার যখন সত্যিকারের মূল্যবান প্রমাণিত হয়, তখন তা বহু ধাপ যাচাই অতিক্রম করে—ল্যাব টেস্ট, ডেটা ভেরিফিকেশন, পাইলট ইমপ্লিমেন্টেশন, রিয়েল-ওয়ার্ল্ড স্কেলিং, এবং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডপশন। অথচ বাংলাদেশের প্রযুক্তি–আবিষ্কার সংবাদগুলোতে এই কোনো ধাপই থাকে না।
আমাদের গণমাধ্যমে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তার স্থায়িত্বও সামান্য। সাধারণত তিন মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সেই “বিপ্লবী” আবিষ্কার সম্পর্কে আর কোনো খবর পাওয়া যায় না। এগুলো যেন আতশবাজির মতো—এক মুহূর্তের ঝলক, তারপর নিঃশব্দ অন্ধকার।
অবাক করার মতো বিষয় হলো—আমরা বারবার একই ভুল করি, একই আনন্দে বিভোর হই, একই হতাশায় পড়ি। তাই এখন আর আমি বিস্মিত হই না। বরং মনে হয়—আমরা এখনও প্রকৃত বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতিতে পৌঁছাতে পারিনি। গবেষণার মান, ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়া সহযোগিতা, সত্যিকারের উদ্ভাবনী চর্চা—এসবের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে এই ৮ বছরের ব্যবধান কখনো কমবে না।
বিশ্বে যখন AI–চালিত IoT ডিভাইসের বাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলারের দিকে এগোচ্ছে, তখন আমাদের উচিত মিডিয়া–উত্তেজনার বদলে গবেষণা মানোন্নয়ন, ডাটা–ভেরিফিকেশন, এবং ইন্ডাস্ট্রি–ভিত্তিক গবেষণা সংস্কৃতির দিকে মনোযোগ দেওয়া। কারণ ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে “৮ বছরের তত্ত্ব” ভেঙে এগিয়ে যেতে হবে আরও দ্রুতগতিতে, আরও পরিমিত বুদ্ধি নিয়ে।
মূল লেখাটি ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে লিখিত। কিছু তথ্য সংযুক্ত করে পুনরায় বিজ্ঞানী অর্গ এর সম্পাদকীয় এর জন্য লিখিত হইলো।

Leave a comment