সাক্ষাৎকার

সবুজ শক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্মার্ট বায়োকম্পোজিট গবেষণা: ড. মোঃ রেজাউর রহমানের গল্প

Share
Share

লেখা: ড. মশিউর রহমান

বিজ্ঞানী অর্গ (biggani.org)-এর ইন্টারভিউ প্রজেক্ট একটি ধারাবাহিক বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে দেশ–বিদেশে কর্মরত বিজ্ঞানী, গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে গভীর আলাপচারিতা আয়োজন করা হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো গবেষণার পেছনের গল্প, অনুপ্রেরণা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সহজ ও প্রমিত বাংলায় সাধারণ পাঠক এবং শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরা। বিশেষ করে বাংলাদেশি তরুণদের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা এবং বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ দেখানোই এই ইন্টারভিউ প্রজেক্টের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানী অর্গ এর এই সাক্ষাৎকার প্রোজেক্টে আজ অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোঃ রেজাউর রহমান। প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক এই কৃতি বিজ্ঞানীর সমন্ধে।

ড. মোঃ রেজাউর রহমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার গ্রামীণ পটভূমি থেকে উঠে আসা একজন উদীয়মান বিজ্ঞানী। তিনি প্রথমে কুষ্টিয়ার খোকসা জানিপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়নিক বিষয়ের অনার্স ও মাস্টার্স (প্রথম শ্রেণির তৃতীয় অবস্থানে) সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে বুয়েটে এমফিল লাভ করেন। মাস্টার্সের পর তিনি মালয়েশিয়ায় গিয়েও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সারাওয়াকের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এনার্জি সাসটেইনিবিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং জাপানের টোকুশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ড. রেজাউর রহমানের গবেষণা ক্ষেত্র স্মার্ট বায়োকম্পোজিট, গ্রিন পলিমার, প্রাকৃতিক ফাইবার, ন্যানোম্যাটেরিয়াল, গ্রাফিন অক্সাইড, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ন্যানো-সারের মতো অত্যাধুনিক বিষয় নিয়ে গবেষণা আচ্ছন্ন। এ পর্যন্ত তিনি ২০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত করেছেন এবং সাতটি বইসহ বিশাধিক বইয়ের অধ্যায়ের সম্পাদনায় যুক্ত হয়েছেন। তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ২% তথ্যসূত্রে অন্তর্ভুক্ত বিজ্ঞানীর একজন। তাঁর বিস্তৃত গবেষণামূলক অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকর্মের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিজ্ঞানী অর্গ এ ড. মোঃ রেজাউর রহমান এর সাক্ষাৎকার থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি নিম্নে বর্ণনা করা হল:

প্রশ্নোত্তর পর্ব

প্রশ্ন: স্মার্ট বায়োকম্পোজিট বলতে আপনি কী বোঝান? এটি সাধারণ বায়োকম্পোজিট থেকে কিভাবে আলাদা?

উত্তর: স্মার্ট বায়োকম্পোজিট হলো এমন একটি বায়োপদার্থভিত্তিক যৌগ যা নিজস্ব সেন্সিং বা স্ব-প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা ধারণ করে। সাধারণ বায়োকম্পোজিটগুলোতে দুই বা ততোধিক ভিন্ন উপাদান মিশ্রিত হয়ে একটি নতুন বস্তু তৈরি হয় এবং এগুলো সাধারণ প্লাস্টিকের তুলনায় পরিবেশবান্ধব কারণ এগুলো বায়োডিগ্রেডেবল। ‘স্মার্ট’ শব্দটি যুক্ত হলে বোঝায় যে এই কম্পোজিটের ভেতরে অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য আছে; উদাহরণস্বরূপ, তাপমাত্রা বাড়লে নিজে থেকেই প্রসারিত বা সংকুচিত হয়ে যাবে, মানে এতে সেন্সর বা স্মৃতি ক্ষমতা থাকে।

প্রশ্ন: স্মার্ট বায়োকম্পোজিট ও তার সহায়ক উপাদান পরিবেশের জন্য কী উপকারী? এই প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব কী?

উত্তর: এই বায়োকম্পোজিট এবং সংশ্লিষ্ট সবুজ পলিমার সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এগুলো মাটিতে বা পানিতে ফেলে দিলে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে পচে গিয়ে সার হয়ে যায়। ফলে প্রচলিত পেট্রোলিয়ামভিত্তিক প্লাস্টিক বা উচ্চ কার্বন নির্গমনকারী সিমেন্টের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিরোধে সহায়তা করে। চুল্লির জ্বালানিতে এবং প্লাস্টিক উৎপাদনের সময় যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়, স্মার্ট বায়োকম্পোজিট তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে আমাদের দেশের সিমেন্ট শিল্পে ১ টন সিমেন্ট তৈরিতে প্রায় ২ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়; সবুজ বায়োকম্পোজিট এই নির্গমন হ্রাসে অবদান রাখে।

প্রশ্ন: আপনার গবেষণায় গ্রাফিন অক্সাইড ব্যবহার করে তৈরি সোলার সেলের উদ্ভাবনের কথা এসেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলুন।

উত্তর: আমাদের ইউনিমাস গবেষণাগারে মালয়েশিয়ার বিশেষ বন ও মাটি অনুসারে একটি বুননবিহীন বাঁশ প্রজাতি বেছে নিয়ে তৎক্ষণাৎ তৎক্ষণাৎ গ্রাফিন অক্সাইড প্রস্তুত করছি। আংশিক প্রস্তুত গ্রাফিন অক্সাইড (RGO) ব্যবহার করে আমরা একটি নতুন প্রজন্মের সোলার সেল তৈরি করছি। আশা করছি এর দক্ষতা (efficiency) বর্তমানে প্রচলিত সোলার সেলের (প্রায় ২২–২৫%) তুলনায় অনেক বেশি, আশানুরূপ হলে ৩০–৩৫% পর্যন্ত যাবে। সফল পরীক্ষার পর এটি সালে মধ্যে শেষ করে পেটেন্ট করব এবং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করব বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। এ ধরনের সোলার সেল প্রযুক্তি দেশে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে গেলে বিদ্যুৎ জোগানে ‘অফ-গ্রিড’ বিপ্লব ঘটতে পারে।

প্রশ্ন: আপনি ন্যানো সারের উন্নয়নে কাজ করছেন বলে শুনেছি। এটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তর: আমরা বাংলাদেশের কৃষির জন্য একটি ন্যানো-সার ডিজাইন ও উন্নয়নের শেষ পর্যায়ে রয়েছি। ইতিমধ্যে বাগানে বেগুনের গাছে পরীক্ষামূলক প্রয়োগে অত্যন্ত ইতিবাচক ফল পেয়েছি। আশা করি ইনশাআল্লাহ এটি সফল হবে, এরপর প্যাটেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরবরাহের উদ্যোগ নেব। এ ন্যানো-সার প্রয়োগে ফসল উর্বরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশা করছি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের গ্রিন এনার্জি (নবায়নযোগ্য শক্তি) প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতা কী বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: বাংলাদেশের জন্য এখন যে সবুজ শক্তি সম্ভব, তার মধ্যে সোলার শক্তি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। ঢাকায় শক্তি সংকট মেটাতে সরকার এখনও কয়লা ও ফসিল জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে, আর সোলার প্যানেলের কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বায়ু-শক্তি (উইন্ড) বাংলাদেশে এতটা কাজে আসে না কারণ আমাদের দেশে অনুকূল বায়ু প্রবাহ নেই। বৃহৎ পরিসরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প করতে পারাও সম্ভব নয়: পদ্মা-যমুনা শুষ্কপ্রবাহ ও ছোট পরিসরের জলবিদ্যুৎই প্রচলিত। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের ভূগোল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সবুজ শক্তিতে বড় ধরনের রূপান্তরে দীর্ঘকাল দরকার।

প্রশ্ন: উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার শুরুতে শিক্ষার্থীদের আপনার পরামর্শ কী? গবেষণা প্রকাশনার ক্ষেত্রে তরুণদের কি উপদেশ দেবেন?

উত্তর: আমি সবসময় বলি, যেখানেই পড়ো না কেন, সেখান থেকেই ভালো মানের গবেষণা প্রজেক্ট করে ১–২টি আন্তর্জাতিক পেপার প্রকাশ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, স্নাতক প্রথম বর্ষের গবেষণামূলক প্রজেক্ট যদি ভালো মানের হয় এবং তা থেকে দুইটি আন্তর্জাতিক নিবন্ধে প্রকাশ করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপের সুযোগ সহজেই মেলে। এর জন্য পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি কাজ এবং সুপারভাইজরের সহযোগিতা নিতে হবে। কাজটি করার সময় অর্থাৎ গবেষণার ফলাফলকে পেপারে রূপান্তর করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের গবেষণা-পরিবেশ এবং সিস্টেমের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আপনার মতামত কী?

উত্তর: বাংলাদেশের গবেষণায় অনেক সামাজিক ও প্রশাসনিক বাধা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেশন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে বাধা দেয়, যার ফলে উদ্ভাবনী গবেষণাকে সিন্ডিকেট-ভিত্তিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এতে অনেক প্রতিভাবান গবেষকই বিদেশে গবেষণা চালিয়ে যেতে পছন্দ করছেন। উপরন্তু দুর্নীতির সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে গবেষণায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। ড. রহমান নিজে বলছেন যে দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে অনেক মেধাবী ব্রেক ছাড়াই কাজে নেমে গেলেও ভালো ফল পাচ্ছে না, তাই অনেকে দেশে না থেকে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

ড. মোঃ রেজাউর রহমানের এই সাক্ষাৎকারটি ২৯ জানুয়ারী ২০২৬ তারিখে অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞানী অর্গ এর পক্ষ থেকে তাহসিন আহমেদ সুপ্তি সাক্ষাৎকারটি পরিচালনা করেন। ইভেন্টটিতে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানী অর্গ এর সম্পাদক ড. মশিউর রহমান এবং বিজ্ঞানী অর্গ এর ভলেন্টায়ার এবং পাঠকরা।

ড. রেজাউর রহমানের নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় বাংলাদেশি বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিনি দেশীয় প্রাকৃতিক উপাদান থেকে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। বিশেষ করে তাঁর স্মার্ট বায়োকম্পোজিট ও সোলার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা প্রমাণ করে তিনি বিজ্ঞানের পরিবেশবান্ধব প্রয়োগে অগ্রসর হচ্ছেন। biggani.org-এর টিম তাঁর এই অক্লান্ত প্রচেষ্টাকে অভিবাদন জানায় এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অঙ্গনে তাঁর অবদানের প্রশংসা করে। আমরা আশা করি ভবিষ্যতেও ড. রেজাউর রহমান আরও মহান গবেষণা ও উদ্ভাবনায় সফল হোন এবং দেশের বিজ্ঞানের মান উন্নয়নে অবিরাম ভূমিকা রাখুন।

ড. মোঃ রেজাউর রহমানের সাক্ষাৎকারের ভিডিওটি ইউটিউবে নিম্নের লিংক এ দেখুন: 👇👇👇

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org