চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

Antibiotic Resistance: নীরব মহামারী ও আমাদের প্রস্তুতি

Share
Share

জয়নুল আবেদীন সাগর
এমবিবিএস (ফাইনাল ইয়ার),
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

একটি সাধারণ গল্প, একটি অপ্রতিরোধ্য সংকট

গত শীতের কথা। ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলাম নাটোরের গুরুদাসপুরে, এক সন্ধ্যায় পাশের বাড়ির হাসান চাচা (ছদ্ম নাম) আমাকে ডাকলেন। তার ছেলেটা কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ‘সিপ্রোফ্লক্সাসিন’ খাওয়াচ্ছিলেন। জ্বর কমেনি, উল্টো পেট ফাঁপা, দুর্বলতা আরও বেড়েছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “চিকিৎসকের কাছে গিয়েছেন?”

উত্তরে বললেন, “কি হবে গিয়ে? আগেরবার এই অ্যান্টিবায়োটিকেই তো ভালো হইছিল।”

এই ঘটনাটা খুব সাধারণ। কিন্তু ভয়ংকর। কারণ এই ছেলেটার মতো হাজারো শিশু, বৃদ্ধ ও যুবক দিনকে দিন এমন ওষুধে অভ্যস্ত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা সংক্রমণের শিকার হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো ওষুধ আর কাজ করে না।

Antibiotic Resistanceবোঝার সহজ ভাষা

Antibiotic Resistance (AR) মানে, অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে আর আগের মতো ইনফেকশন ঠিক হবে না। কারণ, ব্যাকটেরিয়া নিজেদের এমনভাবে বদলে নিয়েছে যে ওষুধগুলো তাদের আর মেরে ফেলতে পারে না।

প্রতিবার যখন আমরা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক খাই বা কাউকে খেতে দিই, তখন সেই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে আমরা শেখাই- “কীভাবে বাঁচতে হয়।”আর এভাবেই জন্ম নেয় সুপারবাগ। (Superbug are germs- like bacteria & fungi- that cause hard-to-treat infections.)

সংখ্যা যা ভয় পাইয়ে দেয়

  • ২০১৯ সালে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সে বিশ্বে মৃত্যু: ১২,৭০,০০০ জন। (The Lancet)
  • অনুমান: ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর মৃত্যু হবে ১ কোটি মানুষের।
  • বাংলাদেশে ৭০% অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয় প্রেসক্রিপশন ছাড়াই।
  • এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বাইরের ক্লিনিকে ৯০% জ্বরের রোগীকেই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়, যেখানে অধিকাংশই ছিল ভাইরাল জ্বর।

গ্রামের হেলথকেয়ার রিয়েলিটি

আমি নিজে দেখেছি, আমাদের গ্রামে প্রত্যেক ওষুধের দোকানদারই যেন ডাক্তার। কেউ স্কুল পাশ করেনি, তবু রোগ দেখে বলে দেয়, “এইটা খাইলেই হইবো।”

একজন দিনমজুর রোগ হলে প্রথমেই যান ফার্মেসিতে — কারণ সেখানে খরচ কম, ডাক্তারের ফি লাগে না। দোকানদার বলেন, “ইক্সিন (Cefixime) খাও, ২ দিনেই ঠিক।”

কিন্তু দিনশেষে যা হয়, তা হলো ব্যাকটেরিয়াকে অর্ধেক মারার চেষ্টা। বাকি অর্ধেক গেঁড়ে বসে শরীরে, ওষুধ চিনে ফেলে, আর পরেরবার সেই ওষুধে কোনো কাজ হয় না।

সুপারবাগ- আমাদের তৈরি করা দৈত্য

একবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ার্ডে ক্লিনিক্যাল ক্লাস চলাকালীন আমি একটি কেস দেখি- ২৫ বছর বয়সী এক নারী, যিনি Urinary Tract Infection (UTI) নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। আমাদের স্যার ওষুধ দিচ্ছে একের পর এক। কোনো অ্যান্টিবায়োটিকেই কাজ হচ্ছিল না।ল্যাব রিপোর্টে দেখা গেলো- ব্যাকটেরিয়াটি ESBL positive, এমন একটি রূপ যেটি সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক তো দূরের কথা, ইনজেকশনেও ভালো হয় না।

একজন মায়ের কান্না

আমার রুমমেটের মামা ICDDR,B হাসপাতালে কাজ করেন। তিনি একদিন বলছিলেন- “একজন মা তার বাচ্চাকে নিয়ে ৭ দিন ঘুরেছে এক হাসপাতাল থেকে অন্যটায়। সবাই বলেছে, ইনফেকশন। কিন্তু ওষুধে কাজ হয়নি। শেষে যখন ICU তে ভর্তি হলো, তখন রক্তের কালচারে দেখা গেলো: Carbapenem-Resistant Enterobacteriaceae (CRE)- যেটার জন্য দেশের কোনো হাসপাতালে ওষুধ নেই।”

মায়ের সেই কান্না নাকি সে এখনো ভুলতে পারেনি।

আমরা এমন কোথায় ভুল করছি?

  • ভাইরাল জ্বরেও অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া।
  • ৩ দিন পরেই ‘ভালো লাগছে’ বলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া।
  • পোলট্রি-গরুর খাবারে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো।
  • শিশুদের সামান্য জ্বর হলেই ‘সিপ্রোফ্লক্সাসিন’ ইনজেকশন দেওয়া।
  • হাসপাতালে গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার না করা।

বিশ্ব কী করছে? আমরা কী করছি?

বিশ্ব:

  • WHO চালু করেছে- ‘Global Action Plan on ARM’
  • ইংল্যান্ড ও সুইডেনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ৩০%-এর বেশি কমেছে।
  • MIT ও DeepMind AI দিয়ে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করছে।

বাংলাদেশ:

  • ICDDR,B ও BMRC এন্টিবায়োটিক নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে।
  • কিছু মেডিকেল কলেজে চালু করা হয়েছে- ‘Antibiotic Stewardship Program’
  • DGDA অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রিত বিক্রয় আইনে কাজ শুরু করেছে ।

তবে বাস্তবতা?

গ্রামে এখনও কেউ জানে না ‘Antibiotic Resistance’ কী…!

আমাদের করণীয় কী?

  • রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
  • কোর্স অসম্পূর্ণ রাখবেন না।
  • নিজের ওষুধ অন্যকে দেবেন না।
  • পশু খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করা।
  • নিজের পরিবার ও কমিউনিটিকে সচেতন করুন।

লাস্ট কথাটা আপনাদের জন্য…

মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করে জীবনের জয়গান গেয়েছিল।
আজ আমরা নিজেরাই সেই জীবনরক্ষাকারী অস্ত্রটিকে শেষ করে ফেলছি, শুধুমাত্র অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে।
একসময় সাধারণ ঠান্ডা-জ্বরও ভয়ানক রোগে রূপ নেবে।
আমাদের সন্তানেরা তখন হয়তো ভাববে- “আগে একটা সময় ছিল, যখন ইনফেকশনে মানুষ মারা যেত না…!”
তাহলে কি আমরা সেই অনিশ্চিত ভভিষ্যতের দিকেই ধাবিত হচ্ছি???


তথ্যসূত্র (References)

  1. The Lancet (2022): Global Burden of Bacterial AMR
  2. WHO Fact Sheet on Antimicrobial Resistance
  3. ICDDR,B Bangladesh AMR Data
  4. CDC – Antibiotic Use in South Asia
  5. BMRC Report on Drug Misuse, 2023
  6. UNICEF: Rural Drug Practice in Bangladesh
  7. Review on Antimicrobial Resistance (UK, 2016)

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org