আপনি যদি একজন তরুণ গবেষক, ডেটা অ্যানালিস্ট, অথবা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হতে চান, তবে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই চলবে না—তথ্য বিশ্লেষণের পেছনের ‘চালাকির খেলা’ চিনতে শিখতে হবে। আজকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি এমন একটি বইয়ের সঙ্গে, যা মজার ভাষায় এবং ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে আমাদের শেখায়—পরিসংখ্যান দিয়ে কীভাবে মিথ্যা বলা যায়। বইটির নাম ‘How to Lie with Statistics’, লেখক ড্যারেল হাফ (Darrell Huff)।
‘How to Lie with Statistics’ শুধু একটি পরিসংখ্যানের বই নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা। লেখক দেখান কিভাবে সচেতনভাবে বা অসচেতনভাবে পরিসংখ্যান ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। বাজার গবেষণা, বিজ্ঞাপন, রাজনীতি কিংবা সংবাদ—সব জায়গায় পরিসংখ্যানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সত্যকে আড়াল করা হয়। এই বইটি একজন বিজ্ঞানীকে শেখায় সন্দেহ করতে, প্রশ্ন করতে এবং প্রমাণ খুঁজতে।
চলুন একটু লেখক সমন্ধে পরিচিত হওয়া যাক। ড্যারেল হাফ ছিলেন একজন সাংবাদিক এবং লেখক। তিনি নিজে পরিসংখ্যানবিদ না হলেও, গণমাধ্যমে কাজ করতে করতে বুঝে যান—সংখ্যার খেলা কীভাবে সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে পারে। তিনি এই বইটি লিখেছিলেন ১৯৫৪ সালে, কিন্তু এর কথাগুলো আজকের ‘বিগ ডেটা’র যুগেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আমাদের দেশেও পত্রিকায়, বিজ্ঞাপনে, এমনকি গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা প্রায়ই দেখি—”৯০% মানুষ এতে সন্তুষ্ট”, “৩ গুণ বেশি কার্যকর”, “৩০ দিনে রেজাল্ট” ইত্যাদি দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শতকরা হিসাবগুলো কী সত্যি? কী ধরনের নমুনা নেওয়া হয়েছে? প্রশ্নগুলো কেমন ছিল? এই বইটি সেইসব প্রশ্ন তুলতে শেখায়। একজন গবেষক বা বিজ্ঞানমনস্ক তরুণের জন্য এটি জরুরি, কারণ গবেষণা মানেই শুধু সংখ্যার পেছনে দৌড়ানো নয়—বরং সংখ্যার অর্থ খুঁজে বের করা, এবং ভুল ব্যাখ্যা এড়িয়ে সত্য উদঘাটন করা।
📚 বইয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও বিষয়বস্তু
১. The Sample with the Built-In Bias
👉 কিভাবে একপেশে বা পক্ষপাতদুষ্ট নমুনা (sample) থেকে ভুল ফলাফল পাওয়া যায়।
২. The Well-Chosen Average
👉 ‘মধ্যমা’ (median), ‘গড়’ (mean), ও ‘মোড’—এই তিন ধরনের গড় ব্যবহারের খেলা। কোনটা বেছে নিলে তথ্যটা বেশি সুবিধাজনক দেখায়?
৩. The Little Figures That Are Not There
👉 তথ্য গোপন করে কীভাবে ‘ভালো ফলাফল’ দেখানো যায়। অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাই ‘উল্লেখ করা হয় না’।
৪. Much Ado About Practically Nothing
👉 তুলনামূলক তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করে কীভাবে সাধারণ পার্থক্যকে বিশাল করে দেখানো হয়।
৫. How to Talk Back to a Statistic
👉 বইটির শেষ অধ্যায়—সাবধানতা ও বিশ্লেষণী মনোভাব গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনা। কীভাবে যে-কোনো পরিসংখ্যানকে প্রশ্ন করা উচিত।
চলুন কিছু বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক:
📌 এক কোম্পানি বলে, “আমাদের পণ্য ৫০% বেশি কার্যকর।” প্রশ্ন হলো, কিসের তুলনায়? আগে কতটা কার্যকর ছিল?
📌 এক গবেষণায় বলা হয়, “৯ জনের মধ্যে ৮ জন রেজাল্ট পেয়েছেন।” কিন্তু নমুনার আকার কত ছিল? কাদের উপর পরীক্ষা করা হয়েছিল?
📌 একটি ওষুধ কোম্পানি বলে, “চিকিৎসকেরা এটি সুপারিশ করেন।” কিন্তু কতজন চিকিৎসক? কোথা থেকে তথ্য এসেছে?
এই সব প্রশ্ন করতেই এই বইটি শেখায়, যা তরুণ গবেষকদের জন্য একটি আত্মরক্ষার হাতিয়ার।
আজকের যুগে গবেষণা মানেই শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়—তথ্যের ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ এবং গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করাও জরুরি। এই বইটি আপনাকে শেখাবে: পরিসংখ্যানিক ভুল চিনতে, ডেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে, তথ্যের পেছনের বাস্তবতা বুঝতে। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে আপনি যদি সত্যিকারের তথ্য নির্ভর গবেষণা করতে চান, তাহলে এই বইটি আপনার জন্য এক অনন্য সহচর। ‘How to Lie with Statistics’ বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংখ্যা কখনো নিরপেক্ষ নয়। যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তার ওপর নির্ভর করে আমরা কী বুঝবো। তাই আপনি যদি বিজ্ঞানী হতে চান, আপনাকে শুধু সংখ্যাগুলো দেখতে নয়—সংখ্যার নেপথ্য দেখতে শিখতে হবে। এই বইটি সেই চক্ষু খুলে দেয়। কার্ল সাগান যেমন বলেছিলেন, “বিজ্ঞান মানে হলো চিন্তা করার উপায়”—আর ড্যারেল হাফ আমাদের দেখান, কীভাবে না চিন্তা করলে সংখ্যার ভেল্কিতে পড়ে যাই।
অনলাইনে বইটির পিডিএফ সংস্করণটি পাবেন এইখানে:
https://mronline.org/wp-content/uploads/2019/05/HowToLieWithStatistics.pdf

Leave a comment