সম্পাদকীয়

রিসার্চ গ্যাপ কি? এবং কিভাবে রিসার্চ গ্যাপ খুঁজে বের করা যায়?

Share
Share

বিজ্ঞানকে আমরা প্রায়ই সম্পূর্ণতার জগৎ হিসেবে দেখি—যেন সব প্রশ্নের উত্তর কোথাও না কোথাও জমা হয়ে আছে, আর গবেষক কেবল সেই উত্তরগুলো খুঁজে বের করেন। বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্ঞানভাণ্ডারগুলোতে—নেচার, সায়েন্স, ল্যানসেট কিংবা আইইইই—যে হাজার হাজার গবেষণা জমা হয়, তার প্রতিটিই জন্ম নেয় এমন একটি জায়গা থেকে, যেখানে এখনো স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। সেই অজানা জায়গাটিই গবেষণার ভাষায় রিসার্চ গ্যাপ

বৈজ্ঞানিক ম্যাগাজিন নেচারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দশকে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের ৭৪ শতাংশই শুরু হয় পূর্ববর্তী জ্ঞানের কোনো সীমাবদ্ধতা বা অনালোচিত প্রশ্ন থেকে। অর্থাৎ বিজ্ঞান এগোয় অজানাকে ধরে, জানা অংশকে নয়। তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে দাঁড়িয়ে একজন নতুন গবেষক প্রথম যে প্রশ্নটি করেন, সেটি হলো—”রিসার্চ গ্যাপটা খুঁজে পাব কোথায়?”

এই প্রশ্নটি যতটা সাধারণ, ততটাই গভীর। গবেষণা গ্যাপ আসলে অনুপস্থিতির একটি গল্প—যে জায়গায় বিজ্ঞান এখনো পৌঁছায়নি, কিংবা ভুল পথে গিয়ে আবার নতুনভাবে ফিরে আসতে হবে। এটি এমন একটি অন্ধকার কক্ষ, যেখানে আলো ফেললেই নতুন জগত দেখা যায়।

রিসার্চ গ্যাপ শুধু একটা ‘ফাঁক’ নয়; এটি গবেষণা-চিন্তার হৃৎপিণ্ড। কিন্তু এই গ্যাপ আসলে কী? সমাজবিজ্ঞান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং—সব ক্ষেত্রেই রিসার্চ গ্যাপ তিনটি জায়গা থেকে জন্ম নেয়: অপূর্ণ প্রশ্ন, পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, এবং নতুন বাস্তবতা

এখন যদি উদাহরণ ধরা হয় জলবায়ু পরিবর্তনের বিজ্ঞানকে। ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে জলবায়ু নিয়ে যে ১,৪০,০০০ গবেষণা হয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশ শুরু হয় এমন প্রশ্ন থেকে, যেগুলো আগে কেউ ঠিকভাবে বোঝেনি—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কত দ্রুত বাড়ছে, বরফ সত্যিই কত গতিতে গলে যাচ্ছে, কিংবা বৈশ্বিক কার্বন বাজেটের প্রকৃত হিসাব কী। এগুলো সব রিসার্চ গ্যাপের ফল।

এই সত্যটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে আরও স্পষ্ট। ‘দ্য ল্যানসেট’-এ থাকা একটি প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বজুড়ে মেডিকেল গবেষণার ৮০ শতাংশ তথ্যই পশ্চিমা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে তৈরি। ফলে এশিয়া, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রকৃত প্রশ্ন—রোগের আচরণ, জেনেটিক বৈচিত্র্য, চিকিৎসার ফলাফল—ব্যাপকভাবে অনালোচিত। অর্থাৎ এক ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের ভুল ‘সাধারণীকরণ’ই নতুন রিসার্চ গ্যাপ তৈরি করে।

এখান থেকেই বোঝা যায়, রিসার্চ গ্যাপ কোনো লুকানো গুপ্তধন নয়, যার মানচিত্র কোথাও রক্ষিত আছে। এটি তৈরি হয় সমাজের পরিবর্তনে, বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে, এবং গবেষকের চোখ খোলা রাখায়। একজন কৌতূহলী গবেষক, যে প্রতিটি প্রবন্ধ পড়তে পড়তে জিজ্ঞেস করেন—“এখানে কী বাদ পড়েছে?”—সেই মানুষই গ্যাপ খুঁজে পান।

তবুও প্রশ্ন থাকে—গ্যাপ খোঁজা কি সত্যিই এত সহজ? অবশ্যই নয়। কারণ গবেষণার বড় একটি অংশ হলো বিদ্যমান জ্ঞান সম্পর্কে সচেতন থাকা। গবেষণা পদ্ধতি চর্চাকারীরা বলেন, একটি শক্তিশালী লিটারেচার রিভিউ মানে শুধু প্রবন্ধ পড়া নয়; এটি একটি গোয়েন্দা তদন্তের মতো। প্রবন্ধের প্রতিটি অনুচ্ছেদ, প্রতিটি টেবিল, প্রতিটি সীমাবদ্ধতা—সব জায়গা থেকেই নতুন গ্যাপ জন্ম নিতে পারে।

ডিজিটাল যুগে এই প্রক্রিয়া আরও জটিল। গুগল স্কলার জানাচ্ছে, প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৩০ লাখের বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এত বিশাল তথ্যের ঢিবির ভিতরে দাঁড়িয়ে একজন নবীন গবেষকের পক্ষে নিজের ক্ষেত্রের সব গবেষণা এক জীবনেও পড়া সম্ভব নয়। তবুও চমকপ্রদ বিষয় হলো—হার্ভার্ডের এক সমীক্ষা বলছে, ৬৫ শতাংশ সফল গবেষণা শুরু হয় ৩০টি প্রবন্ধ গভীরভাবে পড়ার মাধ্যমেই। অর্থাৎ গ্যাপ ধরা পড়ে অল্প তথ্য থেকেই, যদি গবেষকের প্রশ্ন করার ক্ষমতা থাকে।

অন্যদিকে রিসার্চ গ্যাপ শুধু অনালোচিত প্রশ্ন নয়; অনেকসময় এটি পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার গল্প। জীববিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, নেচার মেথডস-এর তথ্য অনুযায়ী ৫৮ শতাংশ প্রকল্পই পূর্ববর্তী পদ্ধতির ভুল বা সীমাবদ্ধতা সংশোধনের উদ্দেশ্যে শুরু হয়। ছোট নমুনা, ভুল পরিমাপ, অসম্পূর্ণ ভ্যারিয়েবল, অপর্যাপ্ত মডেল—এসবই পরবর্তী গবেষককে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে।

কিন্তু গ্যাপ শুধু বিজ্ঞানের ভিতর থেকে জন্ম নেয় না; সমাজ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, নীতি—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ধরা যায়, ২০১৫ সালের পর থেকে AI–নির্ভর সামাজিক সমস্যাগুলোর ওপর গবেষণার সংখ্যা ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যালগরিদম কতটা পক্ষপাতহীন, ডেটা গোপনীয়তা কতটা নিশ্চিত, চিকিৎসা সিদ্ধান্তে AI কতটা নৈতিক—এসব প্রশ্ন কোনো গবেষণা নিবন্ধ থেকে নয়; জন্ম নিয়েছে বাস্তব জীবনের পরিবর্তন থেকে।

তবে এতদূর আসার পরও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—কীভাবে বুঝবেন যে আপনি যেটিকে রিসার্চ গ্যাপ ভাবছেন, সেটি সত্যিই গ্যাপ? নেচারের সম্পাদকদের মতে, যেসব প্রবন্ধে গ্যাপ স্পষ্ট ও শক্তিশালীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেগুলোর গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা দেড় গুণ বেশি। এর মানে দাঁড়ায়—একটি গ্যাপ তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন সেটি তিনটি মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়: প্রাসঙ্গিক, নতুন এবং গবেষণাযোগ্য।

একটি বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। আপনি যদি বাংলাদেশের পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণা করেন, তখন গ্যাপটি হতে পারে—“বাংলাদেশের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে ঠিক কোন আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়”। কারণ আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখায়, দক্ষিণ এশিয়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ওপর প্রকাশিত প্রবন্ধের ৬০ শতাংশই ভারত বা শ্রীলংকা ভিত্তিক, বাংলাদেশ প্রায় অনালোচিত। এখানে ভৌগোলিক শূন্যতাই গ্যাপ।

অথবা সামাজিক বিজ্ঞানে—বাংলাদেশে AI–নির্ভর কর্মসংস্থানের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধ প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪৭ শতাংশ চাকরি আগামী দুই দশকে স্বয়ংক্রিয়তার ঝুঁকিতে রয়েছে। এখানে গ্যাপ তৈরি হয়েছে সমাজের দ্রুত পরিবর্তনে।

এভাবে দেখলে বোঝা যায়, রিসার্চ গ্যাপ বাস্তবে কোথাও লুকানো নয়; এটি প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে, সমাজের প্রতিটি পরিবর্তনেই। গবেষকের ভূমিকা শুধু সেই পরিবর্তনের ভেতর প্রশ্নটি চিনে নেওয়া।

বিজ্ঞান আসলে একটি আলো-খোঁজা যাত্রা। শতাব্দী ধরে আমরা দেখেছি, নোবেলজয়ী গবেষণাগুলো প্রায়ই এসেছে এমন জায়গা থেকে, যাকে আগে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ১৯৭০ থেকে ২০২০—এই পঞ্চাশ বছরে প্রকাশিত নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর ৬০ শতাংশ আবিষ্কারই এসেছে এমন ‘অন্তর্বিষয়ক’ জায়গা থেকে, যেখানে দুই ক্ষেত্রের সংযোগ ছিল দুর্বল এবং সেই দুর্বলতাই ছিল প্রকৃত গ্যাপ।

এ কারণেই রিসার্চ গ্যাপ আসলে কোনো শূন্যতা নয়; এটি একটি দরজা। সেই দরজার ওপারে যে অন্ধকার, সেটিকে আলোকিত করাই গবেষকের দায়িত্ব। আর এই দায়বদ্ধতাই বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যায়—একটি উত্তর থেকে আরেকটি প্রশ্নের দিকে।

আপনি যদি একজন উদীয়মান গবেষক হন, তবে আজকের পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রশ্ন করার ক্ষমতা। যা জানা আছে, তার ভেতরে উত্তর নেই। উত্তর লুকিয়ে আছে অজানায়। আর সেই অজানা শুরু হয় একটি সহজ বাক্য দিয়ে—”এখানে কি কেউ এখনো দেখেনি কিছু?”

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org