সম্পাদকীয়

আমরা ল্যাব বানাইনি, আমরা বাসা বানিয়েছি

Share
Share

একদিকে কানাডার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে বসে একজন তরুণ শিক্ষার্থী হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল গাড়ির দক্ষতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে কাজ করছে, কারণ আগামী এক থেকে দেড় দশকের মধ্যেই উন্নত দেশগুলো পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনতে চাইছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নাসা রিসার্চ সেন্টারে বসে আরেকজন ছাত্র দূর গ্রহে পাঠানো রোবটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ন্যাভিগেশন সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করছে, যে রোবট এখন প্রতিদিন মঙ্গলগ্রহের মাটি, বাতাস এবং আলো সম্পর্কিত বিপুল তথ্য পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে। রাশিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সার্ভিস রোবট তৈরি করছে যা ভবিষ্যতে হাসপাতাল, কল সেন্টার ও গৃহসেবা খাতে মানুষের নির্ভরতা কমাবে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে কোনো শিক্ষার্থী মানব কোষ ব্যবহার করে নতুন ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা করছে, যেখানে একটি নতুন কার্যকর ওষুধ বাজারে আনতে গড়ে দশ থেকে পনেরো বছর সময় লাগে এবং কয়েকশ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে থিম পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে দেখাচ্ছে কীভাবে বিনোদন শিল্পও গবেষণার পরীক্ষাগার হতে পারে। জার্মানির মিউনিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চালকবিহীন গাড়ির সফটওয়্যার ও সেন্সর ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে, যেখানে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার ডেটা বিশ্লেষণ করে গাড়ি নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

একই সময়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বাস করে অমানবিক গণরুমে, যেখানে পড়াশোনার চেয়ে টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে গবেষণার কোনো স্বপ্ন জন্মায় না, জন্মায় কেবল একটি চাকরির ফর্ম পূরণের আকুতি। এখানেই জন্ম নেয় দূরত্বটি। মেধায় নয়, ব্যবস্থায়।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র তার মোট অর্থনীতির প্রায় তিন শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করে, জার্মানি ও জাপান প্রায় সমান হারে বিনিয়োগ করে, আর চীন ইতিমধ্যেই বছরে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার গবেষণায় ব্যয় করে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে শূন্য দশমিক চার শতাংশের কাছাকাছি বিনিয়োগ নিয়ে। অর্থাৎ আমরা গবেষণাকে মূলধারা হিসেবে মানতে এখনও রাজি হইনি। অথচ যে দেশ গবেষণায় অর্থ ব্যয় করে, সে দেশ পরবর্তী দশকে প্রযুক্তির মালিক হয়, আর যে দেশ ব্যয় করে না, সে দেশ কেবল ব্যবহারকারী হয়ে থাকে।

প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যায়। সংখ্যাটি গত এক দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর একটি বড় অংশ পড়াশোনা শেষে আর দেশে ফেরে না। কারণ তারা যেই ল্যাব, যেই প্রযুক্তি, যেই গবেষণা সহায়তা বিদেশে পায়, দেশে তার ছায়াও দেখা যায় না। ফলাফল হচ্ছে মেধাপাচার, যেখানে একটি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বিনিয়োগ, অর্থাৎ মানুষ, ধীরে ধীরে বাইরে চলে যায়।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু গবেষক বাড়ছে না সেই হারে। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাত পঁয়ত্রিশের একের বেশি। উন্নত বিশ্বে এই অনুপাত থাকে গড়ে পনেরো থেকে কুড়ির মধ্যে। সেখানে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে হাতে ধরে গবেষণার পথে নিয়ে যেতে পারেন, এখানে শিক্ষক নিজেই ব্যস্ত থাকেন পরীক্ষার খাতা আর প্রশাসনিক চাপে।

গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কম হবার অর্থ কেবল যন্ত্রপাতির অভাব নয়, বরং মানসিকতার অভাব। আমাদের অধিকাংশ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী গবেষণাকে সময় নষ্ট মনে করে, কারণ ব্যবস্থায় গবেষণার কোনো আর্থিক, সামাজিক বা পেশাগত মর্যাদা নেই। চাকরির পরীক্ষায় গবেষণার নম্বর নেই, ব্যাংকের ফর্মে প্রকাশনার ঘর নেই। ফলে তরুণেরা প্রশ্ন করে না, কী নতুন জানতে পারবো, প্রশ্ন করে কীভাবে দ্রুত চাকরি পাবো।

এদিকে যেসব দেশে গবেষণায় জোর দেওয়া হয়, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পখাতের সরাসরি সম্পর্ক থাকে। জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গাড়ি শিল্প একসঙ্গে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রে সিলিকন ভ্যালির জন্ম হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে। জাপানে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ ল্যাব পরিচালনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাত দুইটি আলাদা গ্রহে বসবাস করে।

আমরা নিজেদের শিক্ষার্থীকে দোষ দিতে ভালোবাসি, বলি তারা অলস, তারা উদ্যোগী নয়। কিন্তু উদ্যোগ জন্মায় পরিবেশে, শূন্যতায় নয়। যখন একজন শিক্ষার্থী দেখে তার গবেষণা কোনো কাজে লাগবে না, তখন সে স্বপ্ন দেখাও বন্ধ করে দেয়। আর যখন একটি সমাজ স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়, তখন তার ভবিষ্যৎ অন্যেরা লিখে দেয়।

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমে স্বীকার করতে হবে যে উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তা, সেতু কিংবা উঁচু দালান নয়। উন্নয়ন মানে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী কিছু মুখস্থ করে নয়, কিছু আবিষ্কার করে পাশ করবে। উন্নয়ন মানে এমন একটি রাষ্ট্র, যা প্রশ্নকে ভয় পায় না।

আমরা যদি সত্যিই চাই একদিন আমাদের শিক্ষার্থীরা নাসার ল্যাবে কাজ করুক, ফুয়েল সেল তৈরি করুক, ক্যানসারের ওষুধ আবিষ্কার করুক, তবে তাকে আগে গবেষণার সুযোগ দিতে হবে। ল্যাব বানাতে হবে, শিক্ষক তৈরি করতে হবে, অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে, এবং সবচেয়ে জরুরি, গবেষণাকে সম্মান করতে হবে।

নইলে এই ব্যবধান আরও বাড়বে। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নতুন সভ্যতার নকশা আঁকবে, আমরা তখন গণরুমে বসে শুধু চাকরির স্বপ্ন দেখব। আর একদিন অবাক হয়ে প্রশ্ন করব, আমরা কোথায় পিছিয়ে পড়লাম।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org