পাঁচ বছর আগের কথা মনে করলে এখনো কাঁপুনি লাগে। ২০২০ সালের আগস্টে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে পুরো পৃথিবী যেন থমকে গিয়েছিল। স্কুল বন্ধ, জাতীয় লকডাউন, চারদিকে আতঙ্ক—এবং কেবল সে বছরেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এমন এক অচলাবস্থার মধ্যেই এসেছিল ভ্যাকসিন। ডিসেম্বর ২০২০-এ জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদন পাওয়া প্রথম mRNA ভ্যাকসিন দ্রুত কোটি কোটি মানুষকে দেওয়া হয়। জানুয়ারির শেষে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই একশ মিলিয়নের বেশি ডোজ প্রয়োগ হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন সংখ্যক মানুষ এই টিকা গ্রহণ করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর মাধ্যমে লাখো মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।
এই সাফল্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বড় ভূমিকা ছিল। “অপারেশন ওয়ার্প স্পিড” কর্মসূচির আওতায় ১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটানো হয়েছিল। অথচ আজ, সেই একই সরকারই ধীরে ধীরে mRNA ভ্যাকসিন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তহবিল কমিয়ে আনা হচ্ছে, গবেষণা সহযোগিতা বাতিল হচ্ছে, এমনকি স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারাও টিকার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ-এর বর্তমান পরিচালক পর্যন্ত ইঙ্গিত দিয়েছেন, জনগণের অবিশ্বাসই এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।
তাহলে আসল ঘটনা কী? বিজ্ঞান আমাদের কী বলে?
mRNA মূলত একধরনের অণু, যা কোষে DNA-কে প্রোটিন বানাতে সাহায্য করে। ভ্যাকসিনে একই প্রক্রিয়া কাজে লাগানো হয়—তবে এখানে জিনগত নির্দেশনা দেওয়া হয় ভাইরাসের নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরির জন্য। এই প্রোটিনের উপস্থিতি আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করে তোলে আসল ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। দীর্ঘদিন ধরেই mRNA-ভিত্তিক টিকার ওপর গবেষণা চলছিল, কিন্তু মহামারিই এর প্রয়োগকে অভাবনীয় গতি দেয়। জানুয়ারি ২০২০-এ ভাইরাসের জেনেটিক কোড প্রকাশ হওয়ার পর মাত্র এক বছরের মধ্যে টিকা জনগণের হাতে পৌঁছে যায়—যেখানে সাধারণত একটি ওষুধ বাজারে আসতে দশ বছর সময় লাগে।
প্রথম দিককার পরীক্ষাতেই দেখা গিয়েছিল, ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা প্রায় ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দিতে সক্ষম। যদিও কোনো টিকা শতভাগ কার্যকর নয়, তবু মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ এক মহামারিতে এ সাফল্য ছিল যুগান্তকারী। কিন্তু শুরু থেকেই এই প্রযুক্তিকে ঘিরে আপত্তি ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত অ্যান্টি-ভ্যাকসিন কর্মী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র বারবার টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান। তার নেতৃত্বে সম্প্রতি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের mRNA গবেষণা তহবিল বাতিল করা হয়েছে। কেনেডির যুক্তি—“ডেটা বলছে এই টিকাগুলো শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, যেমন কোভিড বা ফ্লু প্রতিরোধে কার্যকর নয়।”
কিন্তু তথ্য-প্রমাণ বলছে ভিন্ন কথা। কোভিড মহামারির সময় এই টিকাই কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। বিজ্ঞানীরা ফ্লুসহ আরও অনেক রোগের জন্য mRNA-ভিত্তিক টিকা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। প্রচলিত ফ্লু ভ্যাকসিন তৈরি হয় মুরগির ডিমে ভাইরাস চাষ করে, যা সময়সাপেক্ষ এবং ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর নির্ভরশীল। ফলে কার্যকারিতা সবসময় নিশ্চিত নয়। বিপরীতে, mRNA ভ্যাকসিন দ্রুত তৈরি করা সম্ভব এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ভাইরাস ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবহার করা যায়। এমনকি সর্বজনীন ফ্লু ভ্যাকসিন তৈরির দিকেও গবেষণা এগোচ্ছে।
নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক অবশ্যই আছে। টিকা নেওয়ার পর অনেকেই স্বল্পমেয়াদী জ্বর, ক্লান্তি বা ফ্লু-সদৃশ উপসর্গ অনুভব করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে বিরল হলেও স্নায়বিক বা হৃদ্রোগজনিত জটিলতা দেখা গেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকা নেওয়ার পর মায়োকার্ডাইটিসের ঝুঁকি বিশেষ করে তরুণ পুরুষদের মধ্যে কিছুটা বেড়ে যায়। তবে এখানেও একটা তুলনা জরুরি—কোভিড আক্রান্ত হলে এই ঝুঁকি আরও বেশি। সুতরাং, ঝুঁকি থাকলেও এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত এবং টিকার সুফলের তুলনায় নগণ্য।
তবু যুক্তরাষ্ট্র সরকার যে পুরোপুরি এই প্রযুক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তা বিস্ময়ের। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জনসাধারণের আস্থার অভাবই এ সিদ্ধান্তের মূল কারণ। অথচ যারা এখন এ কথা বলছেন, তারাই একসময় কোভিড নীতি ও ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে জোরালো সমালোচনা করেছিলেন। একদিকে জনগণের আস্থা কমে গেছে, অন্যদিকে নীতি নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবই যেন বড় হয়ে উঠছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরকার সব ধরনের ভ্যাকসিন গবেষণা বন্ধ করছে না, শুধু mRNA ভিত্তিক কাজগুলোতে ছাঁটাই চলছে। এরই মধ্যে তহবিলের বড় অংশ স্থানান্তরিত হচ্ছে পুরনো প্রযুক্তির দিকে—যেখানে নিষ্ক্রিয় ভাইরাস ব্যবহার করা হয়। অনেক গবেষকই এ সিদ্ধান্তকে “হতাশাজনক” ও “ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে ক্যানসার চিকিৎসায় mRNA-ভিত্তিক নতুন থেরাপি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে, যদিও তাকে “ভ্যাকসিন” না বলে অন্য নামে অভিহিত করা হচ্ছে।
এই সব কিছুর মধ্যে প্রশ্ন থেকে যায়—এ কি বিজ্ঞানের পথ থেকে রাজনৈতিক পথচ্যুতি নয়? কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো যে প্রযুক্তি, সেটিকে হঠাৎ করে অকার্যকর বা অনিরাপদ বলে রায় দেওয়া সহজ নয়। বরং জনআস্থা পুনর্গঠন, সঠিক তথ্য প্রচার এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় বিনিয়োগই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। কারণ বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, নতুন প্রযুক্তি কখনোই নিখুঁত নয়—কিন্তু তা অগ্রগতির চাবিকাঠি।
আমরা ভুলে গেলে চলবে না, mRNA ভ্যাকসিনই প্রমাণ করেছে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসঙ্কটে কীভাবে দ্রুত বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন মানবজাতিকে রক্ষা করতে পারে। এখন যদি রাজনৈতিক কারণে এ গবেষণা থেমে যায়, তবে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ মহামারির মোকাবিলায় আমাদের হাতে কার্যকর হাতিয়ার কমে আসবে। বিজ্ঞানকে যদি আমরা ভয় বা অবিশ্বাসের কারণে থামিয়ে দিই, তবে তার খেসারত দেবে পুরো মানবসভ্যতা। তাই আজকের প্রশ্ন—আমেরিকা কি সত্যিই বিজ্ঞানের পথ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, নাকি এক রাজনৈতিক জটিলতার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে, যার মাশুল একদিন গোটা বিশ্বকেই গুনতে হবে?

Leave a comment