চিকিৎসা বিদ্যাস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

নিভে যাওয়ার আগের ভাবনা

Share
Share

হৃদযন্ত্র থেমে যাওয়ার শব্দটা খুব ছোট। একটা যন্ত্রে সোজা হয়ে যাওয়া লাইন। চারপাশে হঠাৎ নীরবতা। সবাই ধরে নেয় এখানেই শেষ। কিন্তু ভেতরে, মাথার অন্ধকার ঘরে, সবকিছু তখনো থামে না।

মস্তিষ্ক প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না। এত বছর যে শরীর তার আদেশ মেনে চলেছে, হঠাৎ কেন সে কথা শুনছে না এই প্রশ্নটা যেন বিদ্যুৎ হয়ে ছুটে বেড়ায় নিউরনের ভেতর। অক্সিজেন কমে আসছে, রক্ত আর উঠছে না, তবু নিউরনগুলো মরার আগে শেষবারের মতো জ্বলে ওঠে। অন্ধকার নামার আগে যেমন চোখ হঠাৎ আলো খুঁজে পায়, তেমনি ব্রেইনও শেষ মুহূর্তে কিছু একটা ধরতে চায়।

সময় তখন অদ্ভুতভাবে বিকৃত হয়ে যায়। সেকেন্ড আর মিনিটের পার্থক্য মুছে যায়। একটা মুহূর্তে মনে হয় সব কিছু থেমে আছে, আরেক মুহূর্তে মনে হয় হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। স্মৃতির দরজাগুলো একে একে খুলে যায় শৈশবের ঘর, কোনো এক সন্ধ্যায় বলা কথা, কাউকে বলা হয়নি এমন সত্য। প্রশ্ন জাগে, এগুলো কি বিদায় নেয়ার আগে শেষবারের মতো দেখা, নাকি মস্তিষ্কের আতঙ্কিত কল্পনা?

হঠাৎ মনে হয় নিজের শরীরটা দূরে পড়ে আছে। ঠান্ডা, স্থির, অচেনা। কেউ একজন বুকে চাপ দিচ্ছে, কেউ নাম ধরে ডাকছে, কেউ বলছে সে আর নেই। এই “আর নেই” কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ ভেতরে তখনো কেউ একজন আছে সে শুনছে, বুঝছে, কিন্তু চিৎকার করতে পারছে না। যেন জীবন্ত কবর।

অক্সিজেনের অভাবে রাসায়নিক ঝড় শুরু হয়। এন্ডোরফিন ঢুকে পড়ে যন্ত্রণার জায়গায়, ভয়কে ঢেকে দেয় অদ্ভুত শান্তি দিয়ে। কেউ আলো দেখে, কেউ গভীর অন্ধকার। কিন্তু শান্তির আড়ালেও একটা প্রশ্ন কিলবিল করে এটাই কি শেষ? নাকি এটা শেষের আগে অপেক্ষা?

সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তটা আসে তখন, যখন মস্তিষ্ক বুঝে ফেলে যে শরীর আর ফিরবে না। এই বোঝাপড়াটা হঠাৎ আসে না। এটা ধীরে ধীরে নামা এক উপলব্ধি। নিউরনগুলো একে একে নিভতে থাকে, কিন্তু নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সাক্ষী হয়ে থাকে নিজেদের মৃত্যুর। শেষ সচেতন ভাবনাটা হয়তো খুব সাধারণ একটা নাম, একটা মুখ, অথবা অসমাপ্ত কোনো আফসোস।

বাইরে সবাই ধরে নেয়, সে চলে গেছে। ভেতরে তখনো কেউ একজন আটকে থাকে সময়ের শেষ কোণে, যেখানে আর সামনে এগোনোর রাস্তা নেই, পেছনে ফেরারও না। এই ফাঁকা জায়গাটাই সবচেয়ে ভয়ানক; মৃত্যুর মধ্যবর্তী মুহূর্ত।

শেষ নিউরনটাও যখন নিভে যায়, তখন আর কিছু থাকে না। কোনো আলো, কোনো শব্দ, কোনো চিন্তা নয়। কিন্তু প্রশ্নটা তখনো বাতাসে ঝুলে থাকে মৃত্যু কি সত্যিই তৎক্ষণাৎ আসে, নাকি মানুষ শেষ কয়েক সেকেন্ড নিজের মৃত্যুকে খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করে?

হয়তো আমরা জানব না। কারণ যারা জানে, তারা আর ফিরে আসে না। আর যারা ফিরে আসে, তারা সব বলতে পারে না।


মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ |
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org