সম্পাদকীয়

সোশ্যাল মিডিয়ার ভুলগুলো আমাদের গবেষণা-জগতেও প্রতিধ্বনিত হয়

Share
Share

ড. মশিউর রহমান

ডিজিটাল যুগে আমরা যারা গবেষণা করি, নীতি-বিশ্লেষণ করি, স্টার্টআপ তৈরি করি বা বিজ্ঞানের যোগাযোগে কাজ করি—তাদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া আর কখনোই কেবল বিনোদনের জায়গা নয়। এটি এখন গবেষণার ফলাফল ছড়িয়ে দেওয়ার, স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের, এমনকি অর্থায়ন ও সহযোগী খোঁজার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমাদের অধিকাংশই এখনো সেই প্ল্যাটফর্মকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি না। এমিলির গল্পটি উদ্যোক্তা জগতের হলেও, এর ভুলগুলো আমাদের বিজ্ঞান ও গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রায় একইভাবে ফিরে আসে।

এমিলি নামের তরুণ উদ্যোক্তা নিজের অনলাইন পোশাকের ব্র্যান্ড বিকাশে পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর করেছিলেন। শুরুটা ভালো হওয়ার পরও কিছুদিনের মধ্যে ফলোয়ার কমতে থাকে, এনগেজমেন্ট কমতে থাকে, এবং তার সঙ্গে কমে যায় বিক্রি। গবেষণা বলছে, যেকোনো প্ল্যাটফর্মে প্রথম তিন মাসে এনগেজমেন্ট যদি ৩০ শতাংশ কমে, তাহলে অ্যালগরিদম পোস্টগুলোকে তুলনামূলক কম মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এমিলির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল প্ল্যাটফর্ম নয়; সমস্যা ছিল ব্যবহারে।

এমিলির প্রথম ভুল—হ্যাশট্যাগকে গুরুত্ব না দেওয়া। আমরা গবেষকেরাও প্রায়শই একই ভুল করি। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা দেখায়, সঠিক কীওয়ার্ড বা বৈজ্ঞানিক হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করলে গবেষণা-সম্পর্কিত পোস্টের রিচ ২.৫ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত বাড়ে। অথচ অধিকাংশ গবেষক তাঁদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, প্রিপ্রিন্ট বা কনফারেন্স পোস্টার শেয়ার করার সময় সেই হ্যাশট্যাগ যোগ করতে ভুলে যান। ফলে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানটি অদৃশ্য থেকে যায়। ঠিক এমিলির মতো—একটি ভালো বই লিখে তাকের অন্ধকার কোণে রেখে দেওয়ার মতো।

দ্বিতীয় সমস্যা—অনিয়মিততা। এমিলি কখনও সপ্তাহের পর সপ্তাহ নীরব থাকতেন, আবার কোনোদিন হঠাৎ করে ধারাবাহিক দশটি পোস্ট করে ফেলতেন। গবেষণা দেখায়, অনিয়মিত পোস্টিং অ্যালগরিদমিক রিচ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। একই ভুল আমাদের গবেষণা-জগতেও ঘটে। আমরা প্রায়শই দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকি, আবার হঠাৎ কোনো প্রকাশনা বের হলে একসাথে সব শেয়ার করি। অথচ জ্ঞান-শেয়ারের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতা মানুষের মনে বিশ্বাস সৃষ্টি করে—আপনার কনটেন্ট নির্ভরযোগ্য, আপনার উপস্থিতি স্থায়ী।

তৃতীয় ভুল—নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া। এমিলি মন্তব্য এড়িয়ে চলতেন, আর গবেষকরা প্রায়ই কঠিন প্রশ্ন, সমালোচনা বা সংশোধনী নিয়ে নীরব থাকেন। অথচ পিয়ার রিভিউ থেকে ওপেন মন্তব্য—সবকিছুর উদ্দেশ্যই তো জ্ঞানকে আরও শক্তিশালী করা। আন্তর্জাতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, যারা প্রশ্ন বা সমালোচনার দ্রুত উত্তর দেন, তাঁদের গবেষণার কনটেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে ৪০ শতাংশ বেশি। অস্বস্তি থেকে পালিয়ে থাকা শুধু ভুলকে স্থায়ী করে; সংলাপ ভুলকে সংশোধন করে।

চতুর্থ ভুল—ডেটা বিশ্লেষণ না করা। এমিলি জানতেন না তাঁর কনটেন্ট কে দেখছে, কোন বয়সের মানুষ, কোন অঞ্চল থেকে, কোন পোস্ট কার্যকর। গবেষণা দেখায়, সোশ্যাল মিডিয়ার বিশ্লেষণ লক্ষ্যগোষ্ঠী নির্ধারণে এবং গবেষণা-আউটরিচে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকারিতা বাড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান যোগাযোগে ইউরোপিয়ান রিসার্চ কাউন্সিলের এক সমীক্ষা বলছে—যেসব ল্যাব নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স দেখে, তাদের গবেষণা আউটরিচ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দ্বিগুণ।

পঞ্চম ভুল—দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা। এমিলি পোস্ট করতেন, কিন্তু কারও মন্তব্যের উত্তর দিতেন না। গবেষকদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। আমাদের কনটেন্ট দেখা হলেও, দীর্ঘ আলোচনায় প্রবেশ করার আগ্রহ কম থাকে। অথচ জ্ঞান-শেয়ারিং সবসময় দুইমুখী। প্রশ্নের উত্তর, ছোট ব্যাখ্যা বা উৎসাহ—এসবই তৈরি করে এক শক্তিশালী বিজ্ঞান-সমাজ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের রিপোর্ট বলছে—বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সাধারণ দর্শকের নিয়মিত কথোপকথন ভুল তথ্য প্রতিরোধে ৩০ শতাংশ বেশি কার্যকর।

এমিলির গল্প এখানেই শেষ নয়। ভুলগুলো বুঝে তিনি নতুন কৌশল নিলেন—ধারাবাহিক পোস্ট, সঠিক হ্যাশট্যাগ, মন্তব্যের জবাব, বিশ্লেষণের ব্যবহার। তিন মাসের মধ্যে তাঁর বিক্রি ৬৫ শতাংশ বেড়ে যায়। ডেটা ব্যবহার শুরু করার পর তাঁর পোস্ট রিচও দ্বিগুণ হয়। এই ‘রিস্টার্ট’ আমাদের গবেষণা-জগতেও প্রযোজ্য। ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়; ভুল সংশোধন না করাই বিপজ্জনক।

এখন প্রশ্ন—আমরা কি সোশ্যাল মিডিয়াকে শুধু পোস্ট দেওয়ার জায়গা হিসেবে দেখছি, নাকি গবেষণার আউটরিচের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে? আমরা কি নিয়মিত শেয়ার করি, নাকি খণ্ডকালীনভাবে উপস্থিত হই? আমরা কি প্রশ্নের জবাব দিই, নাকি সেগুলো এড়িয়ে যাই? আমরা কি অ্যানালিটিক্স দেখি, নাকি ডেটাকে অবহেলা করি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করে—আমাদের জ্ঞান কতদূর পৌঁছাবে, কত মানুষ তা পড়বে, কতজন গবেষণায় অনুপ্রাণিত হবে।

সোশ্যাল মিডিয়া একদিকে যেমন দ্রুত বদলে যায়, অন্যদিকে একটি বিষয় স্থির—মানুষ কেয়ারিং, ধারাবাহিক এবং সত্যিকারের যোগাযোগকে সবসময় গুরুত্ব দেয়। গবেষকদের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের কাজের প্রতিটি অংশই সমাজের ওপর প্রভাব ফেলে।

তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনার ডিজিটাল উপস্থিতি কি এলোমেলো, নাকি সচেতনভাবে নির্মিত? আপনার গবেষণা কি তাকের অন্ধকারে লুকিয়ে আছে, নাকি বিশ্বের সামনে আলো হয়ে দাঁড়াতে প্রস্তুত? যদি দ্বিতীয়টি চান, তবে সচেতন ব্যবহারই একমাত্র পথ। সোশ্যাল মিডিয়া তখনই শক্তিশালী, যখন আমরা সেটিকে বিজ্ঞানের সেবায় আনতে পারি।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org