নাক খোঁটার মতো আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ একটি অভ্যাস যে আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে—এমন কথা শুনলে অবিশ্বাস্যই মনে হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির একটি সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় এনেছে। গবেষণাটি মানুষের নয়, ইঁদুরের ওপর পরিচালিত, তবুও এতে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, Chlamydia pneumoniae নামের একটি ব্যাকটেরিয়া নাকের টিস্যুতে ক্ষত তৈরি হলে ঘ্রাণ-স্নায়ুর মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যেতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত অনেক মানুষের মস্তিষ্কেও আগে থেকেই এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ইঁদুরের শরীরে নাকের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে—মাত্র ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাকটেরিয়াটি মস্তিষ্কে পৌঁছে আলঝেইমারের মতো লক্ষণ তৈরি করে।
সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইঁদুরের মস্তিষ্কে নিঃসৃত হয় অ্যামিলয়েড-বিটা প্রোটিন, যা দলা পাকিয়ে জমাট বাঁধে। মানুষের আলঝেইমার রোগেও এই প্রোটিনের অস্বাভাবিক সঞ্চয়কে দীর্ঘদিন ধরে রোগের মূল চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। তবে এখনো প্রশ্ন—এটি কি রোগের কারণ, নাকি সংক্রমণ ঠেকানোর স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা?
গবেষণা দলের প্রধান স্নায়ুবিজ্ঞানী জেমস সেন্ট জন জানান, এটি প্রথম প্রমাণ যা দেখায় যে নাকের পথ ধরে ব্যাকটেরিয়া সরাসরি মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে এবং সম্ভাব্যভাবে আলঝেইমারের সূচনা ঘটাতে সক্ষম। তাদের সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল সংক্রমণের গতি—খুব অল্প সময়ে ব্যাকটেরিয়া কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, নাকই হতে পারে মস্তিষ্কে জীবাণুর প্রবেশের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর পথ।
তবে সতর্ক হওয়া জরুরি। এখনো পর্যন্ত এই প্রমাণ শুধুই ইঁদুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ—মানুষের শরীরেও একই প্রক্রিয়া ঘটে কিনা তা নিশ্চিত নয়। একইভাবে, অ্যামিলয়েড-বিটা জমাট রোগের কারণ, নাকি প্রতিক্রিয়া—এ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
আমাদের সমাজে নাক খোঁটা নিয়ে প্রচুর রসিকতা আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১০ জনের মধ্যে ৯ জন মানুষই জীবনে কোনো না কোনো সময়ে এই অভ্যাসে লিপ্ত হন। এমনকি অনেক প্রাণীর মধ্যেও এটি দেখা যায়। কেন এই আচরণ এত সাধারণ—এখনো জানা যায়নি। তবে যদি বিজ্ঞান বলে যে এই অভ্যাসের সঙ্গে গুরুতর স্নায়ুবিক ঝুঁকি থাকতে পারে, তবে বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
বিজ্ঞানীরা এখন মানুষের ওপর একই ধরনের গবেষণা চালানোর পরিকল্পনা করছেন। এর আগে তারা পরামর্শ দিচ্ছেন—নাক খোঁটা বা নাকের লোম উপড়ে ফেলা এড়িয়ে চলতে, কারণ এগুলো নাকের ভেতরের আবরণে ক্ষত সৃষ্টি করে, যা জীবাণুর প্রবেশপথ সহজ করে দিতে পারে।
আলঝেইমার একটি অত্যন্ত জটিল রোগ। শুধু বয়স নয়—পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া—সবই এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও ৬৫ বছরের পর ঝুঁকি বাড়ে, বিজ্ঞানীরা যুক্তি দেন যে সংক্রমণজনিত কারণগুলোকে উপেক্ষা করা যাবে না।
সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুবই সূক্ষ্ম—একটি ছোট ক্ষত বা সাধারণ অভ্যাস কখনো কখনো বড় সমস্যার সূচনা করতে পারে। তাই নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য সামনে এলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে স্নায়ুবিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সীমিত, এই ধরনের গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হতে পারে। জীবনধারার ছোট পরিবর্তনই বড় বিপদ এড়াতে সাহায্য করতে পারে। আলঝেইমারের এখনো চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় ভরসা। আর এই গবেষণা দেখায়—নাক খোঁটার মতো সাধারণ অভ্যাসও স্নায়ুবিক রোগের আলোচনায় উঠে আসতে পারে।

Leave a comment