বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে নিত্য নতুন তথ্য এবং আপনার লেখা জমা দিতে মেইল করুন editor@biggani.org অথবা biggani.org@gmail.com।

Home / সাক্ষাৎকার / মাশরুম গবেষক ড. ইকবাল হোসেন এর সাক্ষাৎকার

মাশরুম গবেষক ড. ইকবাল হোসেন এর সাক্ষাৎকার

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ বিজ্ঞানী.অর্গ এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আমাদেরকে সাক্ষাতকার দেবার জন্য ধন্যবাদ। প্রথমেই আপনার সম্বন্ধে আমাদের একটু বলুন।

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ আসসালামুয়ালাইকুম। আপনাকে এবং আপনার প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞানী.অর্গ কে শুভেচ্ছা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি ঠাকুরগাঁও জেলার সদর উপজেলার আখানগর গ্রামের খালিফাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করি। বর্তমানে আমি চীনের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুয়াংডং ইন্সটিটিউট অব মাইক্রোবায়োলজি-তে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সহযোগী অধ্যাপক (গবেষণা) হিসেবে কর্মরত আছি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো হিসেবে (প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে) একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। ২০১৪ সালে কুনমিং ইন্সটিটিউট অব বোটানি যা ইউনিভার্সিটি অব চাইনীজ একাডেমি অব সাইন্সেস এর অন্তর্ভুক্ত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে ডিএসসি/পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করি। ২০০৪ সালে (অনুষ্ঠিত ২০০৬ সালে) কৃষিতে অনার্স এবং ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে প্লান্ট প্যাথলজি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্জন করি। চীনে আসার পূর্বে বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা-তে প্রায় এক বছর (অগাস্ট ২০০৯ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১০) শিক্ষকতা করেছি। ২০০০ সালে সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৯৮ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি-তে উত্তীর্ণ হয়। এর আগে স্থানীয় গ্রামের স্কুল ভেলার হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার শিক্ষার হাতেখড়ি অর্থাৎ ৫ম শ্রেণী সম্পন্ন করি।

বিজ্ঞানী.অর্গঃ কে আপনাকে বিজ্ঞানী হতে উদ্বুদ্ধ করল?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ আজকের আমি হয়ে উঠা প্রকৃতপক্ষে অনেক মানুষের অবদান রয়েছে। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকার অবদান রয়েছে। কৃষি বিষয়ে পড়াশুনা করেছি বলে স্বাভাবিকভাবেই NARS-এর অধীনে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (BARI, BRRI প্রভৃতি) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কাজ করা মনের মধ্যে প্রবলভাবে একটা আকুতি ছিল এবং সেই সাথে উচ্চতর ডিগ্রি। ২০১০ সালের দিকে চীন থেকে একটা অফার পেয়ে যাই উচ্চতর শিক্ষা তথা পিএইচডি করার জন্য এবং আমার গবেষণার কাজটি সম্পন্ন করি চীনের প্রফেসর ড. চু লিয়াং ইয়াং এর তত্ত্বাবধানে । পরবর্তী সময়ে আমার পোস্টডক্টরাল কাজ করি চীনের আরেক প্রফেসর ড. থাই হুই লি। প্রফেসর ইয়াং এবং প্রফেসর লি-র অনেক ভূমিকা রয়েছে আজকে আমাকে এ জায়গায় নিয়ে আসার জন্য। তাছাড়া আরও কিছু মানুষের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ অবদান রয়েছে যেমন- শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এফ এম আমিনুজ্জামান, প্রফেসর নাসিমা আকতার, প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম, প্রফেসর ড. নাজনীন সুলতানা, প্রফেসর ড. সালাউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরীসহ প্রমুখ এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফ উদ্দিন আহমদ উল্লেখযোগ্য। আমার বাবা (মোঃ আব্বাস আলী) এবং আমার মামা (আব্দুস সামাদ) বাংলাদেশ থেকে মাশরুম সংগ্রহে অনেক সহায়তা করেছেন যা পরবর্তীতে আমার পিএইচডি গবেষণায় অনেক কাজে লেগেছে। নতুন কিছু জানার আগ্রহে এবং মনের প্রবল ইচ্ছা আর সেই সাথে তাদের অবদানের সমন্বয়ে আজকের আমি হয়ে উঠা।

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ আপনি কোথায় ও কি বিষয়ের উপর পিএইচডি করেছেন?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ আমি ২০১৪ সালের জুন মাসে কুনমিং ইন্সটিটিউট অব বোটানি যা ইউনিভার্সিটি অব চাইনীজ একাডেমি অব সাইন্সেস-এর অন্তর্ভুক্ত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে ডিএসসি/পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করি। যদিও আমার মাস্টার্সের গবেষণার কাজ ছিল মাইক্রো ফাংগাস নিয়ে এবং আমি শস্যডাল ছোলার রোগ সৃষ্টিকারী গ্রে মোল্ড অব বট্রাইটিসের প্যাথোজেন Botrytis cinerea-র কিছু শারীরবৃত্তীয় এবং দমন ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোঃ রফিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ এর অধীনে। পরবর্তীতে পিএইচডি-তে আমি কাজ করেছি ম্যাক্রোফাংগাস নিয়ে যাকে আমরা সাধারণ কথায় “মাশরুম” বলে থাকি । পিএইচডি-তে আমি বাংলাদেশের মাশরুমের উপর কাজ করে থাকি। আমার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল দুইটি মাশরুম ফ্যামিলির ট্যাক্সনমি এবং মলিকুলার ফাইলোজেনি নিয়ে কাজ করা তার মধ্যে একটি হল বোলেটাসেয়ী এবং অন্যটি হল আমানিটাসেয়ী। আমার এ গবেষণায় এই দুই ফ্যামিলির মোট ৩৪ টি প্রজাতির মাশরুম বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো আবিষ্কার তথা শনাক্ত করতে সক্ষম হই। এর মধ্যে একটি নতুন জেনাস/গণ (Borofutus) এবং ১৭ টি নতুন প্রজাতির মাশরুম ছিল। নতুন জেনাসের মাশরুমটি সহ মোট ৫ টি নতুন প্রজাতির মাশরুম (Borofutus dhakanus, Phylloporus catenulatus, Phylloporus gajari, Phylloporus attenuatus এবং Amanita cinereovelata) ইতিমধ্যে বিভিন্ন মাইকোলজিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আবিষ্কৃত হওয়া প্রথম মাশরুম এবং বাকিগুলো প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। 

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ আপনি বর্তমানে চীনের Guangdong Institute of Microbiology Guangdong Academy of Sciences এ গবেষণা করছেন। এই প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে বলুন। এখন আপনি কি গবেষণা করছেন?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ এটি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেটি গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজো শহরে অবস্থিত। প্রথমে এটি চাইনীজ একাডেমি অব সাইন্সেস (CAS) এর অধীনস্থ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছিল। পরে এটি ১৯৭২ সালে গুয়াংডং একাডেমি অব সাইন্সেস (GDAS) এর অধীনে চলে আসে। গুয়াংডং একাডেমি অফ সাইন্সের ২৪ টি গবেষণা ইন্সটিটিউট রয়েছে তার মধ্যে গুয়াংডং ইন্সটিটিউট অব মাইক্রোবায়োলজি হল মাদার গবেষণা ইন্সটিটিউট। এই ইন্সটিটিউটে প্রায় ২৫০ জনের মত স্টাফ রয়েছে। এখানে যারা প্রথমে গবেষণায় (এন্ট্রি লেভেল- রিসার্চ/সহকারী অধ্যাপক) প্রবেশ করে তাদের পিএইচডি ডিগ্রি থাকা আবশ্যক এবং সেই সাথে ভাল মানের জার্নালে (SCI) কয়েকটি প্রকাশনা। এই এন্ট্রি লেভেল শেষ করতে সময় লাগে তিন বছর এবং কিছু শর্ত দেওয়া থাকে (মোট ১০-১৫ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর এবং একটি NSFC ফান্ড পেতে হবে এবং তা শেষ করতে হবে)। এসব শর্ত পূরণ করার উপর তার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি নির্ভর করে নতুবা নয়। এসব শর্ত পূরণ হলে পরে সে সহযোগী অধ্যাপক পদে আবেদন করতে পারে এবং তাকে আবারও নতুন এবং বেশ কঠিন শর্ত তিন বছরের জন্য জুড়ে দেওয়া হয়ে থাকে। কাজেই এখানে চাকরি একটি মেয়াদ এবং শর্ত ভিত্তিক। এরা মূলত মাইক্রো-অর্গানিজম এবং তাদের প্রয়োগ নিয়ে কাজ করে থাকে। ছোট একটি প্রতিষ্ঠান কিন্তু বছর শেষে দেখা যায় এরা ১০০ টির উপরে SCI/SCIE প্রকাশনা করে থাকে।
আমি বর্তমানে বেশ কয়েকটি মাশরুম জেনাসের (যেমন- Rossbeevera, Xanthagaricus, Pluteus, Tricholomopsis প্রভৃতি) ট্যাক্সনমি এবং ফাইলোজেনি নিয়ে কাজ করছি যেগুলো চীন থেকে সংগৃহীত।

বিজ্ঞানী.অর্গঃ আপনি অনেক গবেষণাতে ডিএনএ সিকুয়েন্স ব্যবহার করে অনেক কিছু জানার চেষ্টা করছেন। এই প্রযুক্তি সম্বন্ধে আমাদের বলুন। এটি কিভাবে বৈজ্ঞানিকদের সাহায্য করে?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ উদ্ভিদ অথবা প্রাণী যাই বলুন না কেন আণবিক গঠনের দিক দিকে সবকিছু মূলত চারটি ক্ষারকের (A, T, G এবং C) সমন্বয়ে গঠিত কিন্তু ক্রোমোজোমে এদের বিন্যাস ভিন্নতার কারণেই প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আমরা মূলত ডিএনএ সিকুয়েন্স ব্যবহার করি প্রজাতি থেকে প্রজাতি, গণ/জেনাস থেকে গণ অথবা পরিবার/ফ্যামিলি থেকে পরিবার এমনকি আরো উচ্চ র‍্যাঙ্কিং (প্রজাতি থেকে পর্ব) এর মাঝে সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য। আপনার গবেষণা কাজের উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে থাকে র‍্যাঙ্কিং এর নির্বাচনগুলি। যাকে আমরা সহজ কথায় বলে থাকি এভোলুশনারি/ফাইলোজেনেটিক রিলেশনশিপ অর্থাৎ প্রজাতি/গণ ইত্যাদির মাঝে বিবর্তনের যে সম্পর্ক। এটি আসলে খুব যে একটা নব্য প্রযুক্তি তা কিন্তু নয়। হয়তবা ২ দশক আগে এর তেমন ব্যবহার ছিলনা কিন্তু বর্তমান সময়ে এর ব্যবহার অনস্বীকার্য। কেননা- বর্তমান সময়ে আপনি যদি কোন নতুন প্রজাতির সন্ধান পান এবং তা প্রকাশ করতে চান ভাল মানের কোন জার্নালে তাহলে ডিএনএ সিকুয়েন্স ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। আমরা মাশরুম গবেষণা কাজের জন্য স্বল্প দৈর্ঘ্যের অর্থাৎ ৬০০-১২০০ বেসের সিকুয়েন্স (ITS, LSU, tef1, rpb1, rpb2 প্রভৃতি) ব্যবহার করে থাকি। মাশরুম যেহেতু একটি স্বল্প আয়ুষ্কাল (২-৫ দিন) ফসল এবং সহজেই এদের দেহাবশেষ মাটির সাথে মিশে যায় সেকারনে কয়েকশত বছর আগের এদের জীবাশ্ম প্রকৃতিতে খুঁজে পাওয়া বেশ দুরূহ। এক্ষেত্রে ডিএনএ সিকুয়েন্স ব্যবহার করে তাদের বিবর্তনের বয়স নির্ধারণ করতে বৈজ্ঞানিকদের সাহায্য করে থাকে। 

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ আপনি এখন কি নিয়ে গবেষণা করছেন?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ মুলত আমি মাশরুমের ট্যাক্সনমি এবং মলিকুলার ফাইলোজেনি নিয়ে কাজ করি । বর্তমানে আমার নিজস্ব কিছু চাইনীজ প্রজেক্ট রয়েছে মাশরুমের উপরে সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। সেই ২০০৯ সাল থেকে শুরু আজ অবধি এসব নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ এই গবেষণাগুলি গুরুত্বপূর্ণ কেন? 

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ অজানাকে জানা মানুষের আজন্ম স্বভাব। এটা বলা হয়ে থাকে যে উদ্ভিদ এবং ফাংগাসের অনুপাত ১:৬ অর্থাৎ এক ভাগ উদ্ভিদ থাকলে সেখানে ৬ ভাগ ফাংগাসের উপস্থিতি থাকার কথা। যেখানে পৃথিবীতে ৯৫-৯৮% উদ্ভিদের নাম জানা হয়ে গেছে সেখানে মাত্র ৫-৭% ফাংগাস আবিষ্কৃত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই অনুমেয় যে এখনও ৯৩-৯৫ ভাগ ফাংগাস অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে । এরা প্রকৃতিতে মৃতজীবি, মিথোজিবি এবং পরজীবি হিসেবে কাজ করে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে এটির বেশ গুরুত্ব রয়ে গেছে। অন্যদিকে বলতে গেলে কিছু কিছু মাশরুম ভক্ষনযোগ্য যা অনেক প্রোটিন সমৃদ্ধ, কম চর্বিযুক্ত এবং আঁশযুক্ত খাবার যা ওজন কমাতে সাহায্য করে অর্থাৎ এক কথায় একে আমরা “সুপারফুড” বলতে পারি। বর্তমানে অনেক প্রজাতির মাশরুম বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের আওতায় চলে এসেছে। আপনি জেনে হয়তবা অবাক হবেন কিছু কিছু প্রজাতির মাশরুম (Morchella sp. এবং Cordyceps sinensis) রয়েছে যার প্রতি কেজির দাম বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়াও আরও অনেক প্রজাতির মাশরুম রয়েছে যেগুলো থেকে বিভিন্ন প্রকার মূল্যবান ঔষধের সক্রিয় উপাদান তৈরী করা যায়।
যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলি- এটা একটা অবাক করা বিষয় আমাদের দেশে মোট ৬,০০০ (বাংলাপিডিয়া অনুসারে) প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে কিন্তু মাশরুম প্রজাতির সংখ্যা আমাদের একেবারে অজানাই রয়ে গেছে। উদ্ভিদের সংখ্যা আর মাশরুমের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কাজ করে যা পূর্বে বলেছি। যদিও বাংলাদেশে মাশরুমের চাষাবাদ তিন দশকেরও বেশ পুরনো কিন্তু প্রকৃতি থেকে আহরণ এবং এদের ট্যাক্সনমি এবং ফাইলোজেনি নিয়ে গবেষণা করা আমিই প্রথম শুরু করি- এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাকে অগ্রগামী (Pioneer taxonomist of mushroom in Bangladesh) বলতে পারেন। আমার গবেষণার ফলস্বরূপ আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে একটি নতুন গণের/জেনাসের মাশরুম যাকে আমরা “বড়ফুটুস/Borofutus” নামে চিনি এবং ৮ টি নতুন প্রজাতির মাশরুম আবিষ্কৃত করা হয়েছে। এছাড়া আরও ৩টি প্রজাতির মাশরুম যা বাংলাদেশের জন্য নতুন নথিভুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে যা বিভিন্ন প্রকার SCI মাইকোলজিক্যাল জার্নালে (Fungal Diversity, Mycologia, Mycological Progress, MycoKeys, Mycotaxon, প্রভৃতি) প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান একেবারেই নগণ্য, আমার গবেষণায় দেখা গেছে যে অনেক অনেক প্রজাতির মাশরুম অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে যা একক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। উপযুক্ত গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃতি থেকে আহরণ করে এদের কিছু কিছু মাশরুমকে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা যেতে পারে যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সুপারফুড এবং ঔষধশিল্পে কাঁচামাল হিসেবে কাজ করবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে মাশরুম নিয়ে গবেষণার বেশ গুরুত্ব রয়েছে।  

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ আসলেই এই পরিসংখ্যান একেবারেই নগণ্য- এটার পিছনে আপনি কি কারন বলে মনে করেন? 

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ আমার জানা মতে বাংলাদেশের ইতিহাসে মাশরুমের ট্যাক্সনমি নিয়ে গবেষণার মাত্র ১০ বছরেরও কম আর অন্যদিকে চীনের ১৫০ বছরেরও পুরনো ইতিহাস। বর্তমানে পৃথিবীর ৭০ ভাগ মাশরুম নিয়ে গবেষণার কাজ চীনে হয়ে থাকে। চীনের ইতিহাসে মাশরুমের ব্যবহার কয়েকশত বছরেরও বেশি পুরনো। এই দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে হয়তবা আরও অনেক প্রজাতির মাশরুম উন্মোচন করা সম্ভব হতে পারত কিন্তু আমি যেহেতু চাইনীজ প্রতিষ্ঠানে কাজ করি সেজন্য চাইনীজ মাশরুম নিয়েই আমাকে এখানে কাজ করতে হয়। উপযুক্ত প্রশিক্ষকের অভাব এবং যারা এই বিষয়ে গবেষণা করতে চান তাদের সুযোগ না পাওয়া অথবা যারা শুরু করেছেন তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা না পাওয়া আমার কাছে এই মুহূর্তে প্রধান কারণ বলে মনে হচ্ছে। আশার কথা হল আমার এই কাজে অনেকেই উৎসাহী হয়ে এখন মাশরুম নিয়ে গবেষণার কাজ কিছুটা হলেও শুরু করেছেন যেমন- শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এফ এম আমিনুজ্জামান, প্রফেসর ড. সালাহউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রফেসর ড. তোফাজ্জল ইসলাম তাদের মধ্যে অন্যতম। কাজেই বর্তমান পরিসংখ্যান ছোট হলেও কয়েক বছর পরে হয়তবা আমরা এর সংখ্যা আরো বহুগুণে দেখতে পাব।

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ ভবিষ্যতে কি নিয়ে কাজ করতে চান?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ মাশরুম নিয়েই কাজ করে যেতে যাই। এক্ষেত্রে আমি এটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করতে চাই।

১। ফাংগাল ট্যাক্সনমিস্ট তৈরী করা।
আমাদের দেশে প্লান্ট ট্যাক্সনমিস্ট থাকলেও ফাংগাল তথা মাশরুম ট্যাক্সনমি এবং ফাইলোজেনি নিয়ে ইতিপূর্বে কেউ কাজ করেছেন বলে আমার খুব একটা জানা নেই। আমাদের দেশে তেমন কোন ফাংগাল ট্যাক্সনমিস্ট নেই বলে বাংলাদেশে কোন প্রজাতির কতটি মাশরুম রয়েছে তা একেবারেই অজানা রয়ে গেছে। যতটুকু জানি বাংলাদেশের মাশরুম ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট যেটি সাভারে অবস্থিত মূলত মাশরুমের চাষাবাদ এবং ভ্যারাইটি/প্রজাতির উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে থাকে। কিছু কিছু মাশরুম আছে যা ভৌগোলিকভাবে অনেক দেশের সাথে মিল পাওয়া যায় অর্থাৎ একই প্রজাতির মাশরুম অনেক দেশেই পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে প্রথম যে দেশ থেকে এটিকে শনাক্ত তথা আবিষ্কার করা হয়েছে এবং নামকরণ করা হয়েছে সেই নামের প্রাধান্য থাকে। পরবর্তী সময়ে অন্য কোন দেশ থেকে কিছুদিন পর কিংবা কয়েক দশক পরে একই জিনিসের সন্ধান পেলে পূর্বের নামটিই ব্যবহার করতে হয় । আমি আমার গবেষণায় দেখেছি যে বাংলাদেশের কিছু কিছু প্রজাতির মাশরুম রয়েছে যা ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা কিংবা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সাথে মিলে যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি যে- “বড়ফুটুস” নামে একটি নতুন জেনাসের মাশরুম বাংলাদেশ থেকে আবিষ্কৃত যা প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালে। পরবর্তী সময়ে ইন্ডিয়া, নেপাল এবং থাইল্যান্ড থেকেও এর অনুসন্ধান পাওয়া গেল এবং এটি বড়ফুটুস নামেই পরিচিত রয়ে গেল এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভৌগোলিক অঞ্চল বিস্তৃত হল। এছাড়া আরও বেশ কয়েক প্রজাতির নতুন মাশরুম ছিল যেগুলো আমি আমার পিএইচডি গবেষণায় পেয়েছিলাম এবং নামকরণ করেছিলাম (অপ্রকাশিত) কিন্তু দেখা গেল আমার ভ্যালিড প্রকাশনার আগেই ইন্ডিয়ার মাইকোলজিস্টরা সেগুলো প্রকাশ করে ফেলল এবং আমার দেওয়া নামটি আর প্রতিষ্ঠা পেল না অর্থাৎ বাতিল হয়ে গেল। বাংলাদেশ থেকে এখনো অনেক প্রজাতির মাশরুম অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে সেগুলো সম্পর্কে জানতে হলে এবং উন্মুক্ত করতে হলে আমাদের ফাংগাল ট্যাক্সনমিস্টের অতীব প্রয়োজন।

২। ফাংগারিয়াম স্থাপন করা ।
বাংলাদশে সরকারি পর্যায়ে প্ল্যান্ট/উদ্ভিদ হারবেরিয়াম থাকলেও ফাংগাস সংরক্ষণের জন্য কোন প্রকার হারবেরিয়াম তথা ফাংগারিয়াম নেই। দেশের ফাংগাল রিসোর্সকে সংরক্ষণ করা এবং গবেষণা কাজে ব্যবহার করার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদের যেহেতু আয়ুষ্কাল অতি স্বল্প সেহেতু প্রকৃতি থেকে সহজেই এদের বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। আপনি যখন মাশরুম সংগ্রহে মাঠে যাবেন তখন পরবর্তী সময়ে যে একই প্রকারের মাশরুম পাবেন ব্যাপারটি কিন্তু তেমন নয়। আমার গবেষণায় দেখেছি কিছু কিছু মাশরুম আমি শুধু একবার পেয়েছি এবং সেগুলি খুঁজে পাবার জন্য বাংলাদেশের একই স্থানে বারবার গিয়েছি কিন্তু সেগুলার দেখা আর পাইনি তবে হ্যাঁ কিছু নতুন মাশরুম হয়তবা পেয়েছি। এথেকে বুঝা যায় আমাদের গবেষণার অভাবে অনেক প্রকারের মাশরুম প্রকৃতি থেকে আহরণ করার বা নাম না জানার আগেই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। তাছাড়া আপনি যখন কোন একটা নতুন প্রজাতির/জেনাসের মাশরুমের সন্ধান পাবেন এবং সেটা সবাইকে জানাতে চান কোন জার্নালে প্রকাশনার মাধ্যমে তখন সেটার জন্য আপনাকে হলোটাইপ নির্বাচন করতে হয় এবং সেটি অবশ্যই কোন স্বীকৃত হারবেরিয়াম তথা ফাংগারিয়ামে সংরক্ষণ করতে হয় যাতে করে অদূর ভবিষ্যতে সেটি নিয়ে কেউ আরও অন্যকিছু জানতে চাইলে সহজেই সেই ফাংগারিয়াম থেকে লোন হিসেবে নিতে পারে কিংবা কেউ সেদেশে যেতে পারে তার গবেষণা কাজের জন্য। আমার গবেষণায় যতগুলি নতুন প্রজাতির মাশরুম বাংলাদেশ থেকে আবিষ্কার করেছি তার প্রত্যেকটির জন্য হলোটাইপ নির্বাচন করতে হয়েছে এবং সেগুলো চীনে আমাকে জমা রাখতে হয়েছে যদিও এদের অধিকাংশই আমার কাছে আইসোটাইপ হিসেবে নমুনা রয়েছে। এসব দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়েই হোক আমাদের ফাংগাল রিসোর্সকে সংরক্ষণ করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

৩। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মাশরুম তথা মাইকোলজিকে অন্তর্ভুক্ত করা ।
এখানে আমি দেখেছি যে প্রাইমারী স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় কিংবা তারও উপরের পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদেরকে বিজ্ঞানমনস্ক করার এক অভিনব পন্থা। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি- সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (শনিবার এবং রবিবার) বিভিন্ন স্কুল, কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা আমাদের ল্যাবে এসে মাশরুম (বিষাক্ত কিংবা ভক্ষনযোগ্য প্রভৃতি) সম্পর্কে হাতে কলমে কিছু শিখে যাচ্ছে যা তাদেরকে বিজ্ঞান মুখী হতে আগ্রহী করে তুলছে। সুপারফুড মাশরুম কিংবা মাইকোলজি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেবার জন্য মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এর কিঞ্চিৎ সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত করা। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠুক এবং আমাদের বর্তমান প্রজন্ম দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাক এই প্রত্যাশা করি। 

বিজ্ঞানী.অর্গঃ বাংলাদেশের অনেক বিজ্ঞানীরা এখন পশ্চিমা দেশ থেকে চীনে প্রচুর পরিমাণে শিক্ষকতা ও গবেষণাতে যুক্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কারণ কি বলে মনে হয়? চীনের গবেষণার পরিবেশ সম্বন্ধে বলুন। চীনে সরকারী না বেসরকারি বিনিয়োগ বেশী। ফান্ড সম্বন্ধে বলুন।

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ চীন গবেষণাতে প্রচুর পরিমানে ফান্ডিং করে থাকে। ফলস্বরূপ এদের গবেষণার ফলাফল পৃথিবীর নামিদামী জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে। একটা বিষয় আপনি খেয়াল করে থাকবেন হয়তবা- বর্তমানে পৃথিবীর এমন কোন SCI/SCIE অন্তর্ভুক্ত জার্নালের ইস্যু বা ভলিউম পাবেন না যেটাতে চাইনীজদের প্রকাশনা নেই । এটা হয়তবা বিগত দেড় থেকে দুই দশক আগেও চোখে পড়ার মতো ছিলনা। চীনে শুধু যে এশিয়ানরা গবেষণা কিংবা শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হচ্ছে তা কিন্তু নয় বরং অনেক আমেরিকান এবং ইউরোপিয়ানরাও যুক্ত হচ্ছে।
গবেষণা খাতে এরা শুধু বিভিন্ন দেশের গবেষকদেরকেই আকৃষ্ট করছে তা কিন্তু নয় অপরদিকে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত নিজেদের মেধাবী সন্তানদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম যেমন- thousand talents program রয়েছে। এই প্রোগ্রামগুলির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে বিদেশে অবস্থানরত চীনা গবেষকদের চীন সরকার দেশে ফিরে নিয়ে আসছে। সরকারি পর্যায়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশন যার মাধ্যমে এরা পিএইচডিতে অধ্যয়নরত কিংবা গবেষণায় নিযুক্ত নিজেদের শিক্ষার্থীদের আমেরিকা কিংবা ইউরোপে পাঠাচ্ছে সেখানকার প্রযুক্তি রপ্ত করতে। এদের কঠোর পরিশ্রম এবং সুদূর প্রসারী চিন্তাভাবনা এবং তা সময়মত সঠিকভাবে প্রয়োগের কারণে আজকের এই পরিবর্তন। এরা ৮ থেকে ৬ টা অফিস ছাড়াও রাত অবধি গবেষকরা/প্রফেসররা অফিসে কাজ করে থাকেন। আর যারা মাস্টার্স কিংবা পিএইচডিতে গবেষণারত তারা তো অফিস তথা গবেষণাগারটাকেই বাসা বানিয়ে ফেলেছে অর্থাৎ এরা রাত ৯-১০ টা অবধি কাজ করে থাকে। তাছাড়া যোগ্যতা অনুসারে তার মূল্যায়ন পাওয়া এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি না থাকাও এই পরিবর্তনের একটি অন্যতম কারণও হতে পারে। এরা গবেষণালব্ধ ফলাফলকে অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানকে বিশ্বকে জানান দিচ্ছে।
এখানে গবেষণার পরিবেশ অত্যন্ত অনুকূল। গবেষণার ক্ষেত্রে যে বাধাগুলি হয়ে দাঁড়ায় এই যেমন ফান্ডিং এবং গবেষণা কাজে ব্যবহৃত আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের যোগান সেগুলো এখানে অনেক সহজলভ্য। কাজেই আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে চীনের গবেষণার পরিবেশ কেমন। এখানে গবেষণার কাজে মূলত সরকারী ফান্ডই বেশি যা আমার কাছে মনে হয়েছে। তাছাড়া চীনের প্রদেশগুলোও গবেষণা কাজের জন্য ফান্ড দিয়ে থাকে। আমার শেষের দু’বছরের পোস্টডক গবেষণা কাজের জন্য ছোট-বড় মিলে ৪ টি ফান্ড পেয়েছি এর মধ্যে ২ টি শেষ হয়েছে ২০১৮ সালে এবং বাকি বড় ২টির একটি ২০১৯ সালে এবং অন্যটি ২০২১ সালে শেষ হবে। তবে হ্যাঁ, ফান্ড নির্ভর করে আপনার প্রস্তাবিত গবেষণার বিষয়বস্তু এবং পূর্বের ভাল মানের প্রকাশনার উপর। 

বিজ্ঞানী.অর্গঃ চীনে যারা গবেষণা কাজে যেতে চায় তাদের জন্য কি উপদেশ দিবেন?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ আমার মনে হয় চীন প্রতি সেকেন্ডে পরিবর্তন হচ্ছে। সময়ের নিরিখে এরা অনেক এগিয়ে গেছে এবং আরও সামনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এক দশক আগেও হয়তবা অনেকেই ভাবত না উচ্চ শিক্ষার জন্য চীনে যাবে। যারা বিজ্ঞানমনস্ক এবং কাজে বেশ মনোযোগী চীনের গবেষকরা তাদেরকে স্বাগতম জানাবে । আমার জানামতে এখানে ২-৩ টি বৃত্তির (CAS, CAS-TWAS প্রেসিডেন্ট ফেলোশিপ এবং বেল্ট এন্ড রোড) চালু আছে উচ্চ শিক্ষার জন্য তবে এখানে মাস্টার্স এর তুলনায় পিএইচডি তে বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ বেশি। দিন দিন এই বৃত্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে। চীনে এখন ভাল মানের প্রকাশনার বেশ কদর। ভাল মানের জার্নালে কিছু প্রকাশনা থাকলে নিঃসন্দেহে আপনাকে এগিয়ে রাখবে বৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে। কাজেই আমি বলব চীনে উচ্চ শিক্ষার জন্য অনার্স কিংবা মাস্টার্স করার সময়ে গবেষণায় বেশ মনোযোগী হওয়া এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল কোন ভাল মানের জার্নালে (SCI জার্নাল) প্রকাশের দিকে নজর দেয়া । 

বিজ্ঞানী.অর্গঃ তরুণ শিক্ষার্থী যারা বিজ্ঞানে কাজ করতে চায় তাদের জন্য আপনার কোন উপদেশ বা বক্তব্য কি?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ যারা বিজ্ঞানে কাজ করতে চায় তাদেরকে আমি স্বাগত জানাব। যারা বাংলাদেশ থেকে বাহিরের দেশে গবেষণায় কাজ করতেছেন সবাই বেশ সুনামের সহিত কাজ করে যাচ্ছেন। এ থেকে বুঝা যায় যে আমাদের দেশের গবেষকরা/তরুণরা অনেক পরিশ্রমী এবং মেধাবীও বটে শুধুমাত্র সঠিক দিকনির্দেশনা এবং উপযুক্ত সুযোগের অভাবে তারা নিজেদেরকে সঠিক জায়গায় নিজে যেতে পারছে না।
মনে প্রবল ইচ্ছা আর আকাঙ্ক্ষা থাকলে যেকোনো মানুষ তার বুকে লালায়িত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। মেধা একটি আপেক্ষিক বিষয় মাত্র তবে মেধার সাথে কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের সমন্বয় ঘটাতে পারলে লক্ষে পৌঁছাতে আপনাকে অনেকখানিই এগিয়ে রাখবে।

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ আপনার ইন্সটিটিউটে তরুন গবেষকদের মাস্টার্স ও পিএইচডি তে ভর্তি হবার সুযোগ আছে কি? কোথায় যোগাযোগ করবে এবং এর জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে?

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ এক কথায় বলতে গেলে নেই। এটি আর দশটা ইন্সটিটিউট থেকে ভিন্ন অনেকটা বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট অথবা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের মতো। এদের নিজস্ব কোন ছাত্র-ছাত্রী নেই তবে চীনের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এখানে এসে মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি গবেষণার পুরো কাজটি করে থাকে এবং শিক্ষার্থীর গবেষণা খাতের সকল প্রকার খরচ সে যার অধীনে গবেষণা করে থাকে উনি বহন করে থাকেন। তবে এখানে পোস্টডক রিসার্চ ফেলো হিসেবে চাইনীজরা সরাসরি কাজ করতে পারে। আমি এখানে প্রথম বিদেশী পোস্টডক রিসার্চ ফেলো হিসেবে ৪ বছর (প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে) কাজ করেছি । চীন সরকার (www.chinapostdoctor.org.cn) মূলত এই ফান্ডিংটা করে থাকে আর ইন্সটিটিউট গবেষকের জন্য গবেষণা ও থাকার ব্যবস্থা করে থাকে । পোস্টডক যেহেতু একটা স্বল্প মেয়াদী চাকুরী সেক্ষেত্রে চীনের বাইরে থেকে কেউ এলে তাকে কাজ করার (work permit) জন্য চীন সরকার থেকে অনুমতি নিয়ে হয় আর এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে থাকে গবেষকের/চাকুরী দাতার প্রতিষ্ঠান।
এই ইন্সটিটিউটে বিদেশী শিক্ষার্থীদের সরাসরি মাস্টার্স ও পিএইচডি তে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না থাকলেও চীনের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে সেখানে তারা সরাসরি ভর্তি হতে পারে। 

বিজ্ঞানী.অর্গঃ আপনাকে আবারও বিজ্ঞানী.অর্গ-এর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ । 

গবেষক ড. ইকবাল হোসেনঃ আপনাকে এবং বিজ্ঞানী.অর্গ কে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি বিদেশে থাকা বাংলাদেশী গবেষকদের মূল্যবান মতামত এবং তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল সবার মাঝে তুলে ধরার জন্য । পাঠকদেরকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সময়ের নিরিখে এই কামনায় করি।  

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে আরো নতুন নতুন সংবাদ জানতে সাবস্ক্রাইব করুন।

About নিউজডেস্ক

আমরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন খবরাখবর ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাতকার প্রকাশ করি। আপনারা কোন লেখা প্রকাশিত করতে চাইলে যোগাযোগ করুন: editor@biggani.org, biggani.org@gmail.com।

Check Also

সাক্ষাৎকারঃ ড.আবু রশিদ হাসান

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে আরো নতুন নতুন সংবাদ জানতে সাবস্ক্রাইব করুন। সংশ্লিষ্ট লেখা:সাক্ষাৎকারঃ ড.হেমায়েত উল্লাহসাক্ষাৎকারঃ …

ফেসবুক কমেন্ট


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Advertisements

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে নিত্য নতুন তথ্য এবং আপনার লেখা জমা দিতে মেইল করুন editor@biggani.org অথবা biggani.org@gmail.com।