রাতে ঘুম থেকে উঠে হয়তো আপনারও মনে হয়েছে—স্বপ্নটা কত অদ্ভুত ছিল, কত স্পষ্ট ছিল, অথচ সকালের নাশতার টেবিলে বসতেই তা যেন ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। আপনি একা নন। মানুষের বেশিরভাগ স্বপ্নই কয়েক মিনিটের মধ্যেই হারিয়ে যায়। কিন্তু কেন এমনটা হয়?
স্বপ্নের আসল সময় হল REM ঘুম। আমাদের ঘুমের একটি বিশেষ পর্যায় আছে, যাকে বলে Rapid Eye Movement (REM) Sleep। এই সময় মস্তিষ্ক প্রায় জেগে থাকার মতো সক্রিয় থাকে। কিন্তু পার্থক্য হলো—যে অংশ দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি ধরে রাখে, সেটি এই পর্যায়ে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ফলে স্বপ্ন চোখের সামনে ভেসে উঠলেও তা স্থায়ী স্মৃতিতে সেভ হয় না।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের স্বপ্নগুলো সাধারণত অস্থায়ী স্মৃতিতে আটকে থাকে, যা মাত্র ৩০ সেকেন্ডের জন্য তথ্য ধরে রাখতে পারে। তাই স্বপ্ন মনে রাখতে চাইলে ওই মুহূর্তে ঘুম থেকে ওঠা জরুরি। যদি সরাসরি পরের ঘুমের ধাপে চলে যাই, স্বপ্নও হারিয়ে যাবে।
শেষ প্রহরের স্বপ্ন কেন বেশি মনে থাকে? ঘুমের মধ্যে প্রায় প্রতি ৯০ মিনিট পরপর REM ঘুম আসে। রাত যত বাড়ে, এই সময়ও তত লম্বা হয়। প্রথমদিকে কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী না হলেও, ভোরের দিকে তা প্রায় ২০ মিনিট পর্যন্ত চলে। এ কারণেই শেষ প্রহরের স্বপ্নটাই আমরা বেশি মনে রাখতে পারি। অন্যদিকে, যারা মাত্র ৬ ঘণ্টা ঘুমান তারা স্বপ্ন দেখার সময় পান অর্ধেকেরও কম। তাই পুরোপুরি ৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে স্বপ্ন মনে রাখার সুযোগও কমে যায়।
স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে বয়স, লিঙ্গ ও ব্যক্তিত্বের কি ভূমিকা আছে? গবেষণা বলছে, মহিলারা গড়ে পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশি স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন। আবার ছোটরা স্বপ্ন বেশি মনে রাখে, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষমতা কমতে থাকে।
এছাড়া অন্তর্মুখী, কল্পনাপ্রবণ ও নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি খোলা মন তুলনামূলকভাবে বেশি স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন। ২০১৭ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, যারা সৃজনশীল এবং কল্পনাশক্তিতে ভরপুর, তারা সাধারণত অন্যদের তুলনায় স্বপ্নের খুঁটিনাটি বেশি মনে রাখে।
স্বপ্ন মনে রাখার উপায় কি? মনোবিজ্ঞানী লেসলি এলিস পরামর্শ দেন—ঘুম থেকে জাগার পর সঙ্গে সঙ্গে শরীর না নেড়ে কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে স্বপ্নের টুকরোগুলো মনে করার চেষ্টা করুন। তারপর দ্রুত লিখে ফেলুন। কারণ লিখে না রাখলে কয়েক মিনিটেই সব মিলিয়ে যাবে।
মজার বিষয় হলো, স্বপ্ন সম্পর্কে বেশি পড়াশোনা বা আলোচনা করলেও স্বপ্ন মনে রাখার প্রবণতা বাড়ে। অর্থাৎ আপনি যদি নিয়মিত স্বপ্ন নিয়ে চিন্তা করেন, বই পড়েন বা ক্লাস করেন, স্বপ্ন মনে রাখার ক্ষমতাও বাড়বে।
স্বপ্নের মধ্যে কি কোন লুকানো বার্তা থাকে? পশ্চিমা সংস্কৃতিতে স্বপ্নকে প্রায়ই অর্থহীন ধরা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বপ্ন আসলে আমাদের লুকানো আবেগের প্রতিফলন। দিনের বেলা যেসব চিন্তা বা দুঃশ্চিন্তা আমরা চেপে রাখি, রাতের স্বপ্নে সেগুলোই প্রকাশ পায়। তাই অনেক সময় স্বপ্ন আমাদের মনের দর্পণ হিসেবেও কাজ করে।
চলুন কিছু মজার তথ্য জানা যাক,
- গড়ে একজন মানুষ জীবনে প্রায় ৬ বছর সময় স্বপ্ন দেখেই কাটান।
- ইতিহাসের বহু আবিষ্কার ও শিল্পকর্ম স্বপ্ন থেকে অনুপ্রাণিত। যেমন—রাসায়নিক কাঠামো বেনজিন প্রথম বিজ্ঞানী ফ্রিডরিখ কেকুলে স্বপ্নে সাপকে নিজের লেজ কামড়াতে দেখে কল্পনা করেছিলেন।
- লুসিড ড্রিমিং বা সচেতনভাবে স্বপ্ন দেখা অনেককে সৃজনশীলতার নতুন জগৎও দিয়েছে।
পরিশেষে বলবো, স্বপ্ন আমাদের জীবনের এক রহস্যময় অধ্যায়। আমরা সবটা মনে রাখতে না পারলেও, স্বপ্নের মধ্যেই আমাদের চিন্তা, ভয়, আনন্দ আর অচেতন আবেগের খেলা লুকিয়ে থাকে। আর যদি একটু মনোযোগ দিই, সেই হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোও আমাদের সঙ্গী হতে পারে, হয়তো সৃজনশীলতার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। তাহলে আজ রাতে শোবার আগে খাতা-কলমটা পাশে রাখুন। কে জানে, আপনার স্বপ্নেই হয়তো লুকিয়ে আছে পরের দিনের কোনো বড়ো আবিষ্কারের ইঙ্গিত।

Leave a comment