মানুষ অদ্ভুত এক প্রাণী। সে জানে কোনটা তার জন্য ক্ষতিকর, তবুও সেই পথেই আবার হাঁটে। সে প্রতিজ্ঞা করে এইবার বদলাবে, এইবার আর আগের মতো হবে না। কিন্তু সময় একটু পেরোতেই দেখা যায়, সে আবার সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, একই ভুলের সামনে, একই দুর্বলতার ভেতরে।
আমরা সাধারণত এটাকে ইচ্ছাশক্তির ব্যর্থতা বলে ভাবি। মনে করি মানুষ চাইলেই পারে, শুধু চায় না। কিন্তু বিষয়টা এত সরল না। মানুষের ব্রেইন এমনভাবে তৈরি, যেখানে সত্য আর ভালো এই দুইটা জিনিস সবসময় এক হয় না। ব্রেইন সবসময় সঠিকটাকে বেছে নেয় না, সে বেছে নেয় সহজটাকে, দ্রুত যেটা স্বস্তি দেয় সেটাকে।
ধরুন, একঘেয়েমি লাগছে। আপনি জানেন এখন পড়াশোনা করা উচিত, বা কোনো প্রোডাক্টিভ কাজ করা উচিত। কিন্তু হাত নিজে থেকেই ফোনের দিকে চলে যায়। স্ক্রল শুরু হয়, মিনিট থেকে ঘণ্টা হয়ে যায়। কাজটা আপনি করতে চাননি, কিন্তু করলেন। এখানে সমস্যা আপনার চরিত্র না, সমস্যা হচ্ছে আপনার ব্রেইনের ভেতরে তৈরি হয়ে যাওয়া এক অদৃশ্য চক্র, যেটা আপনাকে বারবার একই আচরণের দিকে ঠেলে দেয়।
এই চক্রটা খুব নিঃশব্দে কাজ করে। একটা ছোট trigger আসে, একটু বিরক্তি, একটু একাকিত্ব, একটু চাপ। তারপর আচরণ, আপনি এমন কিছু করেন যেটা আপনাকে ওই মুহূর্তে ভালো লাগায়। আর শেষে আসে reward, একটা সাময়িক স্বস্তি, একটু হালকা লাগা। এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ ব্রেইন এটা মনে রাখে। সে শিখে নেয়, এই কাজটা করলে ভালো লাগে। তারপর পরেরবার একই পরিস্থিতি আসলে, সে আর আপনাকে জিজ্ঞেস করে না, সে সরাসরি সেই কাজটাই করিয়ে ফেলে।
এইভাবে একটা পথ তৈরি হয়। প্রথমে সেটা সরু থাকে, অচেনা থাকে। কিন্তু বারবার ব্যবহার করতে করতে সেটা একসময় প্রশস্ত হয়ে যায়, সহজ হয়ে যায়। তখন আপনি নতুন কোনো পথ নিতে গেলেই সেটা কঠিন লাগে, আর পুরনো ভুলটা করা সহজ হয়ে যায়। আপনি জানেন এটা ভুল, তবুও করেন। কারণ আপনার ব্রেইন আপনাকে ঠকাচ্ছে না, সে শুধু শর্টকাট নিচ্ছে।
এর সাথে জড়িয়ে থাকে অনুভূতি। আমরা অনেক সময় কাজটা করি না কাজের জন্য, করি অনুভূতির জন্য। একা লাগলে আমরা এমন মানুষের কাছে যাই, যাদের কাছে যাওয়া উচিত না। চাপ লাগলে আমরা কাজটা এড়িয়ে যাই। খারাপ লাগলে আমরা এমন কিছুতে ডুবে যাই, যেটা আমাদের আরও খারাপ করে দেয়। অর্থাৎ, আমরা ভুল করি না কারণ আমরা ভুলকে ভালোবাসি, আমরা ভুল করি কারণ আমরা সেই অনুভূতিটা এড়াতে চাই যেটা আমাদের অস্বস্তি দেয়।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি। আমরা ভাবি, সমস্যা আমাদের মধ্যে। আমরা নিজেদের দোষ দেই, নিজেদের অযোগ্য ভাবি। কিন্তু বাস্তবে, সমস্যা হচ্ছে আমাদের অভ্যাসের কাঠামো, আমাদের পরিবেশ, আমাদের চারপাশের ছোট ছোট trigger, যেগুলো প্রতিদিন আমাদের একই জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
আপনি যদি একই জায়গায় থাকেন, একই মানুষদের সাথে মিশেন, একই trigger-এর মধ্যে থাকেন, তাহলে আপনি নতুন সিদ্ধান্ত নিলেও, পুরনো আচরণই ফিরে আসবে। কারণ ব্রেইন নতুন কিছু শেখার আগে পুরনো জিনিসটা repeat করতে চায়। সেটাই তার জন্য সহজ, সেটাই তার জন্য নিরাপদ।
তাই মানুষ বোকা বলে বারবার একই ভুল করে না। সে করে কারণ তার ভেতরের সিস্টেমটা তাকে সেই ভুলের দিকেই ঠেলে দেয়। আপনি যদি শুধু সিদ্ধান্ত বদলান, কিন্তু সেই সিস্টেম না বদলান, তাহলে ফলাফলও বদলাবে না।
একই মানুষ, একই ইচ্ছা, একই প্রতিজ্ঞা, সবকিছু থাকা সত্ত্বেও, ফলাফল একই থাকবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত, আমরা যা ভাবি তার চেয়ে বেশি আমরা আমাদের অভ্যাসের ফল। আর যতদিন পর্যন্ত সেই অভ্যাসের ভিতটা না বদলানো যায়, ততদিন পর্যন্ত এইবার শেষ এই কথাটা শুধু একটা বাক্য হয়েই থেকে যাবে।
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ | আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment