সেদিন বিকেলে, শহরের এক কোণের নীরবতায় বসেছিলাম,চায়ের কাপের ভাপ ধীরে ধীরে আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আশেপাশে দু’একজন পরিচিত মুখ, কথাবার্তা ছিল খুব সাধারণ। ঠিক তখনই এক জনৈক ব্যক্তি একটু ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন এমন প্রশ্ন, যা সাধারণ কৌতূহলের আড়ালে লুকিয়ে রাখে বিজ্ঞানের গভীরতম জিজ্ঞাসা।
তিনি বললেন, মানুষ তো অণু-পরমাণু জড়ো করে নানা পদার্থ তৈরি করতে পারে। তাহলে যদি অনেকগুলো জীবন্ত কোষ একত্র করা যায়, তবে কি আরেকটি পূর্ণাঙ্গ দেহ তৈরি করা সম্ভব নয়? আর যদি মানুষের শরীরেই শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি হয়, তবে সেই “প্রাণের সূচনা” তা কি মানুষ নিজেই দিচ্ছে না? কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়াই যদি শক্তির উৎস হয়, তবে শেষ পর্যন্ত কি মানুষই এক ধরনের “প্রাণ সৃষ্টি” করছে না?
প্রশ্নটি শোনার পর প্রথম যে অনুভূতিটি জাগে, তা হলো, এটি কেবল একটি জৈবিক প্রশ্ন নয়; বরং এটি অস্তিত্বের মৌলিক গঠন, জীবন ও অজীবনের সীমানা, এবং মানুষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক গভীর অনুসন্ধান।
মানুষ অণু-পরমাণুকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে অনেক আগেই। আমরা জানি কীভাবে নির্দিষ্ট উপাদানকে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে নতুন পদার্থ তৈরি করতে হয়। একটি টেবিল, একটি ওষুধ, কিংবা একটি জটিল যন্ত্র সবই মূলত পদার্থের বিন্যাসের ফল। এই পর্যায়ে মানুষ প্রকৃতির নিয়মকে বুঝে তার মধ্যে কাজ করে। কিন্তু এই দক্ষতাকে যদি জীবনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাই, তখনই বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে।

জীবন কেবল উপাদানের সমষ্টি নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট বিন্যাস, একটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ও স্বনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। একটি কোষের ভেতরে হাজারো রাসায়নিক বিক্রিয়া একইসঙ্গে সংঘটিত হচ্ছে, এবং প্রতিটি বিক্রিয়া অন্যটির সাথে সূক্ষ্মভাবে সমন্বিত। এই সমন্বয় ভেঙে গেলে কোষ আর “জীবিত” থাকে না, যদিও তার উপাদানগুলো তখনো উপস্থিত থাকতে পারে। এখানেই বোঝা যায় জীবন মানে শুধু “কি আছে” তা নয়, বরং “কিভাবে সবকিছু একসাথে কাজ করছে”।
তাহলে যদি আমরা অনেকগুলো জীবন্ত কোষ একত্র করি, কেন একটি পূর্ণাঙ্গ দেহ তৈরি হয় না?
কারণ একটি দেহ কেবল কোষের সমষ্টি নয়; এটি একটি সংগঠিত কাঠামো, যেখানে প্রতিটি কোষ জানে তার অবস্থান, ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ। একটি ভ্রূণের বিকাশের সময় কোষগুলো শুধু বিভাজিত হয় না, তারা ধীরে ধীরে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় গ্রহণ করে কেউ স্নায়ুকোষ হয়, কেউ পেশীকোষ, কেউ রক্তকোষ। এই পার্থক্য তৈরি হয় জেনেটিক তথ্য, কোষ-সংকেত, এবং পরিবেশগত প্রভাবের জটিল সমন্বয়ে। মানুষ এই প্রক্রিয়ার অনেক অংশ বুঝতে পেরেছে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এখনো পারেনি।
আধুনিক বিজ্ঞানে ক্লোনিং, স্টেম সেল গবেষণা, এমনকি ল্যাবে টিস্যু বা অঙ্গ তৈরি করার মতো অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন একটি মানুষ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃত্রিমভাবে তৈরি করা এখনো আমাদের নাগালের বাইরে। কারণ আমরা উপাদান জানি, আংশিক প্রক্রিয়াও জানি, কিন্তু সেই সামগ্রিক “নকশা” ও তার গতিশীলতা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারিনি।
শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর প্রসঙ্গে প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। এই দুইটি কোষ আলাদাভাবে সম্পূর্ণ জীবন নয়, কিন্তু তাদের মিলনের মাধ্যমে একটি নতুন জীবনের সূচনা ঘটে। এই মিলনের মুহূর্তে একটি জাইগোট তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ জীব হয়ে ওঠে। এখানে মানুষ প্রজননের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, কিন্তু “জীবনের সূচনা” ঠিক কীভাবে ঘটে, তার ব্যাখ্যা এখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়।

অনেকে মনে করেন, কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়াই যেহেতু শক্তি উৎপাদন করে, তাই সেখান থেকেই জীবন আসে। কিন্তু শক্তি এবং জীবন এক জিনিস নয়। মাইটোকন্ড্রিয়া কোষকে শক্তি জোগায়, কিন্তু সেই শক্তি তখনই অর্থপূর্ণ হয়, যখন কোষটি একটি সুশৃঙ্খল জীবন্ত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। একটি মৃত কোষেও কিছু সময়ের জন্য শক্তি-উৎপাদন প্রক্রিয়া আংশিকভাবে চলতে পারে, কিন্তু তাকে আমরা জীবিত বলি না। জীবন হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে শক্তি, তথ্য, এবং সংগঠন একসাথে মিলে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রতিক্রিয়াশীল ও বিকাশমান সিস্টেম তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে “প্রাণ দেওয়া” কথাটি বৈজ্ঞানিকভাবে একটি রূপক অর্থ বহন করে। মানুষ কোষ তৈরি করতে পারে, জিন সম্পাদনা করতে পারে, এমনকি ভ্রূণের বিকাশে সহায়তা করতে পারে; কিন্তু সম্পূর্ণ শূন্য থেকে একটি জীবন্ত সত্তা তৈরি করা যেখানে আগে কোনো জীবন্ত ব্যবস্থা ছিল না এখনো সম্ভব হয়নি। একে বলা হয় abiogenesis, এবং এটি এখনো গবেষণার এক অমীমাংসিত ক্ষেত্র।
তবু প্রশ্নটি এখানেই থেমে থাকে না। ভবিষ্যতে কি মানুষ এই সীমা অতিক্রম করতে পারবে?
বিজ্ঞান ক্রমাগত এগোচ্ছে synthetic biology, artificial cell, lab-grown embryo সবই ইঙ্গিত দেয় যে আমরা জীবনের কাঠামো অনুকরণ করতে ক্রমশ দক্ষ হয়ে উঠছি। কিন্তু অনুকরণ এবং সৃষ্টি এক জিনিস নয়। একটি সিস্টেমকে পুনর্গঠন করা এবং একেবারে নতুনভাবে “চালু” করা এই দুইয়ের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য রয়েছে।
সন্ধ্যার আলো যখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এলো, সেই মানুষটি আর কিছু বললেন না। তার চোখে কৌতূহল ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এক ধরনের নীরব উপলব্ধি। হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মানুষ প্রকৃতির অনেক নিয়ম আবিষ্কার করেছে, অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণও করতে শিখেছে, কিন্তু জীবনের গভীরতম রহস্য এখনো পুরোপুরি তার আয়ত্তে আসেনি।
এই উপলব্ধিটুকুই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-
যে জীবনকে আমরা প্রতিদিন স্পর্শ করি, তা কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফল নয়; এটি এক জটিল, সুনিয়ন্ত্রিত, এবং এখনো আংশিকভাবে অজানা এক বিস্ময়।
মো. ইফতেখার হোসেন
এমবিবিএস ২য় বর্ষ , কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ
আগ্রহের ক্ষেত্র মূলত আচরণবিজ্ঞান,
স্নায়ুবিজ্ঞান ও অভ্যাসবিজ্ঞান।

Leave a comment