মহাকাশসাধারণ বিজ্ঞান

অদেখা মহাবিশ্ব: আমরা যে বাস্তবতার সামান্য অংশ দেখি

Share
Share

আমাদের জীবনের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে—যে বাস্তবতায় আমরা বাস করি, তার প্রায় পুরোটা আমাদের চোখের আড়ালে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ আমরা সরাসরি দেখতে বা স্পর্শ করতে পারি। বাকি ৯৫ শতাংশ গঠিত রহস্যময় অদৃশ্য পদার্থ—ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি—যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না, এমনকি কোনও সাধারণ দূরবীনেও ধরা পড়ে না।

ডার্ক ম্যাটার মহাকর্ষীয় শক্তির মাধ্যমে গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে বেঁধে রাখে, কিন্তু আলো শোষণ বা বিকিরণ করে না। আর ডার্ক এনার্জি হলো সেই রহস্যময় শক্তি, যা মহাবিশ্বের প্রসারণ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। প্ল্যাঙ্কWMAP স্যাটেলাইটের মাপজোখে এই হিসাবই উঠে এসেছে—আমরা যে মহাবিশ্ব দেখি, তা যেন এক বিশাল বরফখণ্ডের পানির ওপরে থাকা ছোট্ট অংশ, বাকিটা অদেখা গভীরে লুকিয়ে।

কিন্তু এই অদৃশ্য বাস্তবতা শুধু “ওপরে” মহাকাশেই নয়, আমাদের চারপাশেও বিরাজ করছে। মানুষের চোখ আলোর এক ক্ষুদ্র অংশমাত্র দেখতে পারে—৩৮০ থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য। এর বাইরে আছে অতিবেগুনি রশ্মি, ইনফ্রারেড, এক্স-রে, গামা রশ্মি ও রেডিও তরঙ্গ, যেগুলো প্রতিনিয়ত পৃথিবীজুড়ে চলাফেরা করছে, কিন্তু আমরা সেগুলো অনুভবই করি না। একইভাবে আমাদের কান ২০ হার্জ থেকে ২০ হাজার হার্জ পর্যন্ত শব্দ শুনতে পারে, অথচ হাতি, বাদুড় বা ডলফিন এমন শব্দ শুনতে ও ব্যবহার করতে পারে, যা আমাদের শ্রবণ ক্ষমতার সীমার বাইরে।

বিজ্ঞানীরা যখন এই সীমাবদ্ধ ইন্দ্রিয়শক্তির বাইরে যেতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, তখন সামনে আসে এক অবিশ্বাস্য জগৎ। গভীর সমুদ্রের তিমির দীর্ঘ-তরঙ্গ শব্দ, যা হাজার কিলোমিটার দূরেও পৌঁছায়; নিউট্রিনো নামে ভূতুড়ে কণিকা, যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে; অথবা আকাশগঙ্গার প্রান্ত থেকে আসা রেডিও সংকেত—এসব একসময় ছিল কল্পনার বাইরে।

ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি যত উন্নত হয়, ততই আমাদের দৃষ্টির সীমা বাড়ে। গ্যালিলিওর দূরবীন আমাদের চাঁদের গহ্বর দেখিয়েছিল, মাইক্রোস্কোপ প্রথমবারের মতো জীবাণুর অস্তিত্ব প্রকাশ করেছিল, আর আধুনিক কণিকা-ত্বরক ডার্ক ম্যাটারের খোঁজে পথ দেখাচ্ছে। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার প্রমাণ করে, বাস্তবতা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও জটিল।

প্রশ্ন হলো—এখনও কতটুকু অদেখা রয়ে গেছে? হয়তো এমন অনেক কণিকা, শক্তি বা প্রাকৃতিক নিয়ম আছে, যা আজও আমাদের যন্ত্রের সীমার বাইরে। কয়েক শতাব্দী পরের বিজ্ঞানীরা হয়তো হাসিমুখে বলবেন—একুশ শতকের মানুষ আসলে কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে ছিল।

তবে এই অদৃশ্য বাস্তবতার ধারণা কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, দার্শনিক ভাবনাকেও গভীর করে। আমরা যতই উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করি, শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে হয়—আমাদের ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও যন্ত্রের সীমা আছে। তবুও এই সীমাকে ভেদ করার তাগিদই বিজ্ঞানের প্রাণশক্তি। অদেখাকে দেখার এই প্রচেষ্টাই মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

হয়তো সেই দিন খুব দূরে নয়, যেদিন আমরা মহাবিশ্বের এই লুকানো ৯৫ শতাংশের রহস্য উন্মোচন করব। আর ততদিন পর্যন্ত, অদেখার সন্ধানে আমাদের যাত্রা অব্যাহত থাকবে—কারণ মানুষের স্বভাবই হলো জানার তৃষ্ণা থামিয়ে না রাখা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

গবেষণার তথ্য ও বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে, বিজ্ঞানী.অর্গ নবীন প্রজন্মকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org