আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা কাজ করে—ভালো ফল মানেই ভালো শেখা। পরীক্ষায় নম্বর বেশি পেলেই ধরে নেওয়া হয়, শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝেছে। কিন্তু ড. কাজী হোসেনের অভিজ্ঞতা এই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। তার মতে, শেখা মানে শুধু তথ্য মুখস্থ করা নয়; শেখা মানে ধারণা বোঝা, প্রশ্ন করা এবং বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারা।
বাংলাদেশে পড়াশোনার সময় তিনি নিজেই এই মুখস্থনির্ভর শিক্ষার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি স্বীকার করেন, তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করা তার জন্য সহজ ছিল না। বরং যুক্তি দিয়ে বিষয় বোঝার প্রবণতা ছিল তার শক্তি। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভরতা প্রাধান্য পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার জায়গাটি চাপা পড়ে যায়। ড. কাজী হোসেন মনে করেন, একজন শিক্ষার্থী যদি কেবল বইয়ের তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, কিন্তু সেই তথ্যের অর্থ ও প্রয়োগ বুঝতে না পারে, তাহলে সেই শেখা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে তিনি নতুন এক ধরনের শেখার পরিবেশের মুখোমুখি হন। সেখানে শিক্ষকের ভূমিকা কেবল তথ্য দেওয়া নয়; বরং শিক্ষার্থীকে ভাবতে শেখানো। ক্লাসে প্রশ্ন করা, শিক্ষকের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করা এবং নিজের মত প্রকাশ করা—এসব বিষয় শেখার অংশ হিসেবে দেখা হয়। এতে শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং শেখার প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে অংশগ্রহণমূলক। ড. কাজী হোসেনের মতে, এই পরিবেশে শেখার মূল চাবিকাঠি হলো “বোঝা”—কেন কোনো বিষয় এমন হলো, কীভাবে হলো, এবং বাস্তবে এর প্রভাব কী।
তিনি শেখাকে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। কেউ যদি কেবল রাস্তার নাম মুখস্থ করে, তবে সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু যদি সে মানচিত্র দেখে রাস্তার দিকনির্দেশ বুঝে নেয়, তবে নতুন শহরেও পথ খুঁজে নিতে পারবে। ঠিক তেমনি, বিজ্ঞানের কোনো সূত্র বা ধারণা মুখস্থ করলে পরীক্ষায় কাজে লাগতে পারে, কিন্তু ধারণার পেছনের যুক্তি বুঝলে সেই জ্ঞান নতুন সমস্যার সমাধানেও কাজে আসে।
ড. কাজী হোসেন আরও বলেন, শেখার ক্ষেত্রে ভুল করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মুখস্থনির্ভর শিক্ষায় ভুলকে প্রায়ই ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। অথচ ধারণাভিত্তিক শেখায় ভুল মানে নতুন কিছু শেখার সুযোগ। বিদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় তিনি দেখেছেন, শিক্ষকরা ভুলকে শেখার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখেন। এতে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে ভয় পায় না, বরং ভুলের মধ্য দিয়েই গভীরভাবে বোঝার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তার বার্তা স্পষ্ট—শেখাকে পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বইয়ের পাতায় থাকা তথ্যের পেছনের অর্থ খুঁজতে হবে, প্রয়োগের ক্ষেত্র খুঁজতে হবে। মুখস্থের চেয়ে বোঝার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে কেবল পরীক্ষায় নয়, বাস্তব জীবনেও সেই জ্ঞান কাজে লাগবে।
ড. কাজী হোসেনের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত শিক্ষা নম্বরের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা হলো চিন্তা করার ক্ষমতা, প্রশ্ন করার সাহস এবং শেখাকে জীবনের অংশ করে নেওয়ার মানসিকতা। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারলে আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিন্তাশীল গবেষক ও নাগরিক হয়ে উঠতে পারে।
এই আলোচনার বিস্তারিত জানতে পাঠকরা biggani.org–এ প্রকাশিত ড. কাজী হোসেনের পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখতে পারেন।:

Leave a comment