বাংলাদেশে আজকাল “ইনোভেশন” শব্দটি যেন জাদুমন্ত্র হয়ে উঠেছে। যে কোনো নতুন যন্ত্র, অ্যাপ, বা প্রযুক্তির আইডিয়া সামনে এলেই আমরা দ্রুত তাকে যুগান্তকারী আবিষ্কার বলে মেনে নিতে চাই। হয়তো আমরা খুব বেশি করে কিছু আশা করছি, কিংবা খুব দ্রুত সাফল্যের গল্প শুনতে চাইছি। কিন্তু ক্ষতিটা হয় তখনই, যখন আবিষ্কারক নিজেই জানে না—সে যা বানিয়েছে, তা আদৌ ইনোভেশন কি না, আর যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেই আইডিয়ার ওপর টাকা ঢালছে, সেও বুঝে না কীভাবে যাচাই করতে হয়। ফলে “হাবিজাবি” কাজ বিশাল স্বপ্নের রঙে মোড়া হয়ে রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত অর্থের ঢেউয়ে ভেসে যায়, কিন্তু বাস্তবে তার ফল হয় শূন্য।
গত এক দশকে দেশের প্রযুক্তিতে নিবিড়ভাবে কাজ করতে গিয়ে এবং বাইরে শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়ে আমি বারবার দেখেছি, কীভাবে কিছু প্রকল্প কেবল গ্ল্যামার আর শক্ত কথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বড় পর্দায় প্রেজেন্টেশন ঝলমল করে, স্লোগান ঝাঁ-চকচকে, বক্তব্যে শতভাগ দক্ষতার গল্প—কিন্তু কাছ থেকে দেখলে থাকে না নির্ভরযোগ্য ডেটা, পরীক্ষার রিপোর্ট, কিংবা সেই সহজ প্রশ্নগুলোর উত্তর—কীভাবে এটি কাজ করছে, কতটা ভালো কাজ করছে, আর তা অন্য কেউ কি পুনরাবৃত্তি করতে পেরেছে? প্রকৌশল বিজ্ঞানে একটা মৌলিক নিয়ম আছে—যা মাপা যায় না, তা বিশ্বাস করা যায় না। ইনোভেশনের ক্ষেত্রেও সেই কথাই খাটে।
টেক-স্ক্যামের প্রথম লক্ষণই হলো অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস। কেউ যখন বলে “আমরা সম্পূর্ণ নতুন নিয়মে কাজ করছি”, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কোনো পরীক্ষিত পদ্ধতি, মানদণ্ড বা তুলনামূলক তথ্য দিতে পারে না, তখনই সন্দেহের ঘণ্টা বাজা উচিত। প্রকৃত গবেষণা সাধারণত নম্র হয়, কারণ এটি প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়। আর স্ক্যামারের ভাষা শব্দে ভারী, ডেটায় হালকা। আরও বিপদ তখন, যখন বলা হয়—এই মুহূর্তে টাকা না দিলে সুযোগ হাতছাড়া, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো সময়রেখা বা ধাপে ধাপে পরিকল্পনা নেই। দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপ আসলে অনেক সময় দুর্বল ভাবনার শক্ত ঢাল।
ইনোভেশন মানে শুধু নতুন কিছু করা নয়, বরং পুরোনো সমস্যাকে নতুনভাবে সমাধান করা—এমনভাবে, যাতে তা অন্য প্রযুক্তি দিয়ে সহজে করা যেত না। সে কারণেই প্রকৃত উদ্ভাবনের প্রথম পরীক্ষা হলো—প্রমাণ। কাগজে আঁকা নকশা, যন্ত্রাংশের তালিকা, পরীক্ষার বিস্তারিত রিপোর্ট, বাস্তব প্রোটোটাইপের ছবি বা ভিডিও—এসব ছাড়া বড় দাবি করা মানে হলো কথার জাদু দেখানো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুনরাবৃত্তিযোগ্যতা। একটি আবিষ্কার যদি কেবল এক জায়গায় কাজ করে, আর অন্য কোথাও না, তবে তা বিজ্ঞান নয়—ব্যতিক্রম। বিজ্ঞান তখনই বিজ্ঞান, যখন একই সেটআপে একই ফল আসে।
পেটেন্ট নিয়ে আমাদের দেশে একটি ভয়াবহ ভুল ধারণা আছে। মনে করা হয়—পেটেন্ট মানেই বড় আবিষ্কার। আসলে পেটেন্ট হলো কেবল একটি আইনি সনদ, যা বলে দেয় কেউ একটি ধারণা প্রথম দাবি করেছে। কিন্তু সেই ধারণা বাস্তবে কাজ করে কি না, তা পেটেন্ট নিজে বলে না। তাই পেটেন্টের নম্বর দেখালেই মাথা নত করার দরকার নেই; দেখতে হবে—সেটি মঞ্জুর হয়েছে কি না, দাবিগুলো শক্ত কি না, আর আন্তর্জাতিকভাবে তার অবস্থান কী। অনেক সময় খুব সাধারণ কোনো পদ্ধতি নতুন মোড়কে পেশ করে তাকে বিরাট আবিষ্কার বলা হয়, অথচ প্রকৃত ইনোভেশনের মূল শক্তি থাকে মৌলিকতায় এবং প্রয়োগযোগ্যতায়।
এই জায়গায় তরুণদের একটি বড় দায়িত্ব তৈরি হয়। যারা নতুন কিছু বানাতে চায়, তাদের উচিত নিজেদের কাজের কঠোর সমালোচক হওয়া। প্রশ্ন করতে হবে—আমার কাজ কি সত্যিই আগের চেয়ে ভালো কিছু দিচ্ছে? সংখ্যায় তা বোঝাতে পারছি তো? আর যারা বিনিয়োগ করে, কিংবা সিদ্ধান্ত নেয়, তাদেরও প্রশ্ন করার সাহস থাকতে হবে। কাঁচা আবেগে “দেশের জন্য কিছু করবে”—এই বিশ্বাসে টাকা ঢালা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অন্ধ সন্দেহও ক্ষতিকর। মধ্যপন্থাই একমাত্র সমাধান—তথ্য, পরীক্ষা এবং তৃতীয় পক্ষের যাচাই।
বিশ্বের বড় বড় উদ্ভাবনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কীভাবে প্রমাণের পাহাড় জমিয়েই তারা স্বীকৃতি পেয়েছে। একটি নতুন ওষুধ বাজারে আসার আগে হাজার হাজার পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। একটি নতুন বিমান ডানা কেবল আঁকার টেবিলে তৈরি হয় না, বাতাসের টান ঠেলে তার সক্ষমতা যাচাই হয় বছরের পর বছর। সেই তুলনায় যদি কোনো বাংলাদেশি প্রকল্প হঠাৎ দাবি করে—আমরা সব সমস্যার সমাধান করেছি, কিন্তু একটি সঠিক পরীক্ষার রিপোর্ট দেখাতে পারে না—তাহলে সেটিকে বিশ্বাস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
এখানে আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—স্বচ্ছতা। প্রকৃত গবেষক সাধারণত নিজের কাজ নিয়ে লুকোচুরি করেন না। তিনি তথ্য দেখাতে আগ্রহী, প্রশ্নে বিরক্ত নন, বরং প্রশ্নকে স্বাগত জানান। কারণ তার জানা থাকে—তার হাতে প্রমাণ আছে। বিপরীতে, যে লুকোতে চায়, সে কথার আড়াল নেয়। জনগণের টাকা যেখানে জড়িত, সেখানে এই স্বচ্ছতা আরও বেশি দরকার। কারণ সে টাকা কারও একার নয়, আমাদের সবার।
যদি কোথাও স্ক্যামের আভাস আসে, তখন উত্তেজনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই। প্রয়োজন শান্ত মাথায় তৃতীয় পক্ষের যাচাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ল্যাব, স্বাধীন কোনো সংস্থা, কিংবা সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ কেউ—এসব জায়গায় তথ্য পাঠিয়ে সত্যতা যাচাই করা যায়। ভুল প্রমাণ হলে আইনগত পথও খোলা আছে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে জনতার সামনে দাঁড় করানোও ন্যায্য নয়। সত্যিকারের লড়াই হলো ভাঁওতাবাজির বিরুদ্ধে, মানুষ বা স্বপ্নের বিরুদ্ধে নয়।
বাংলাদেশে ইনোভেশন দরকার—ভীষণ দরকার। আমাদের তরুণেরা মেধাবী, সাহসী, এবং কল্পনায় শক্তিশালী। কিন্তু সেই কল্পনার সঙ্গে যদি যুক্ত না হয় প্রমাণ, তবে স্বপ্ন ধোঁয়ায় পরিণত হয়। আজ যারা স্কুলে পড়ে, কাল তারাই হবে গবেষক, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক। তাদের হাতেই থাকবে দেশের প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ। তাই এখন থেকেই যদি তারা শিখে নেয়—কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে যাচাই করতে হয়, আর কীভাবে আবেগের বদলে তথ্যকে স্থান দিতে হয়—তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের ইনোভেশনের দেশ, কেবল স্লোগানের নয়।
শেষ কথা একটাই—দাবির আগে প্রমাণ চাই। তথ্যের আলোতেই আলোকিত হোক আমাদের প্রযুক্তির পথ। শো-অফে নয়, শক্ত কাজে বিনিয়োগ করাই হোক আমাদের জাতীয় অভ্যাস। কারণ ইনোভেশন মানে শুধু নতুন বলে চিৎকার করা নয়, ইনোভেশন মানে নতুনকে সত্য করে তোলা।

Leave a comment