বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে আমরা প্রায়ই কোনো একক ব্যক্তির নাম সামনে এনে সাফল্যের গল্প বলি। নিউটন, আইনস্টাইন কিংবা আধুনিক যুগে বড় বড় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের নাম শুনলেই মনে হয় যেন একজন মানুষের প্রতিভাই সব কিছুর পেছনের চালিকাশক্তি। কিন্তু গবেষণাগারের ভেতরের বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে সাফল্য আসে বহু মানুষের যৌথ প্রচেষ্টায়। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিমের দৃঢ় উপলব্ধি—“দলই শেষ পর্যন্ত সফল হয়—একজন নয়।”
ডক্টর করিমের দীর্ঘ গবেষণা-জীবনে অপটিক্স, ইলেকট্রনিক্স, নাইট ভিশন ডিসপ্লে ও অপটিক্যাল কম্পিউটিংয়ের মতো জটিল ক্ষেত্রে কাজ করতে হয়েছে। এসব প্রকল্পে একজন মানুষের পক্ষে একাই সব দিক সামলানো সম্ভব নয়। পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কম্পিউটার বিজ্ঞানী, এমনকি প্রশাসনিক সহায়তাকারীদের সমন্বয় ছাড়া কোনো বড় প্রকল্প এগোয় না। তাঁর অভিজ্ঞতায়, একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় কাজ হলো সঠিক মানুষদের একত্র করা এবং তাদের দক্ষতাকে একই লক্ষ্যে কাজে লাগানো।
দলগত সাফল্যের পেছনে আস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি গবেষণা দলে যদি সদস্যরা নিজেদের অবদান নিয়ে অনিশ্চিত বোধ করেন বা মনে করেন যে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি মিলবে না, তবে উদ্ভাবনী উদ্যোগ অনেক সময় থেমে যায়। ডক্টর করিম তাঁর নেতৃত্বের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার পরিবেশ তৈরি করলে দলসদস্যরা নিজেদের কাজের প্রতি আরও বেশি দায়বদ্ধ হন। এতে করে ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতিযোগিতার বদলে সমষ্টিগত লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগ বাড়ে।
এই দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বহুমাত্রিক দক্ষতার সমন্বয়। আধুনিক গবেষণা প্রকল্পে শুধু বৈজ্ঞানিক দক্ষতা নয়; প্রয়োজন হয় ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, আইনি কাঠামো বোঝার সক্ষমতা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা। একজন ব্যক্তি এসব সবকিছুতে সমান দক্ষ হতে পারেন না। দলগতভাবে কাজ করলে একে অপরের সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে নেওয়া যায়। ডক্টর করিমের মতে, একজন নেতা হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল এই সমন্বয়কে সহজ করা—যেন প্রতিটি সদস্য নিজের শক্তির জায়গায় অবদান রাখতে পারেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দলগত সাফল্যের এই ধারণা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের সমাজে অনেক সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলাফল হিসেবে দলগত উদ্যোগে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। অথচ শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বড় অর্জন সম্ভব হয় তখনই, যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষক, শিক্ষার্থী ও পৃষ্ঠপোষকেরা একসঙ্গে কাজ করেন। ডক্টর করিমের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, সমষ্টিগত প্রচেষ্টার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে সীমিত সম্পদের মধ্যেও বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত “দলই শেষ পর্যন্ত সফল হয়—একজন নয়”—এই উপলব্ধি বিজ্ঞানচর্চার একটি মৌলিক সত্যকে তুলে ধরে। ব্যক্তিগত প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেই প্রতিভাকে বৃহত্তর প্রভাবের দিকে নিয়ে যেতে প্রয়োজন সহযোগিতা, আস্থা ও সম্মিলিত প্রয়াস। ভবিষ্যতের গবেষণা ও উদ্ভাবনের পথে এই দলগত দর্শনই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment