প্লাস্টিকের বোতল হাতে নিলে আমরা সাধারণত একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার কথাই ভাবি। কিন্তু সেই ফেলে দেওয়া বোতল যদি আবার নতুন রূপে কাজে লাগে—আরও শক্ত, আরও টেকসই হয়ে—তবে বর্জ্যের পাহাড় কি কিছুটা হলেও ছোট হতো না? এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর খুঁজতেই কাজ করছেন বাংলাদেশি উপাদান বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সাগর হোসেন। নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবুরি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় শিল্পভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়নের পরিবেশে টেকসই পলিমার উপাদান তৈরির কাজে যুক্ত। তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে—প্লাস্টিককে দায়িত্বশীলভাবে পুনর্ব্যবহার করা, আধুনিক থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকরণকে “দ্বিতীয় জীবন” দেওয়া, এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ উপাদান উন্নয়ন।
মেটেরিয়ালস সায়েন্স কী—সহজ ভাষায়
মেটেরিয়ালস সায়েন্স বা “উপাদান বিজ্ঞান” বলতে আমরা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত সব উপকরণের ভেতরের গঠন ও আচরণ বোঝার বিজ্ঞানকে বুঝি। একটি লোহার রড কেন শক্ত, কাচ কেন ভঙ্গুর, প্লাস্টিক কেন হালকা—এসব প্রশ্নের উত্তর আসে উপাদান বিজ্ঞানের ভেতর দিয়ে। ড. সাগর বলেন, কোনো উপকরণ কীভাবে বানানো হলো (প্রসেসিং), তার ভেতরের অণুগুলো কীভাবে সাজানো (স্ট্রাকচার), আর শেষ পর্যন্ত উপকরণটি কীভাবে কাজ করে (প্রপার্টি)—এই তিনটির পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাই আধুনিক উপাদান বিজ্ঞানের মূল। যেমন—একই প্লাস্টিককে দ্রুত ঠান্ডা করলে স্বচ্ছতা বাড়ে, ধীরে ঠান্ডা করলে ভেতরের গঠন বদলে গিয়ে রং ধোঁয়াটে হতে পারে। অর্থাৎ, তৈরির পদ্ধতি বদলালেই বৈশিষ্ট্য বদলায়।
থ্রিডি প্রিন্টিং ও রিসাইক্লিং: “বর্জ্য থেকে সম্পদ”
ড. সাগরের পিএইচডি গবেষণার বড় অংশ ছিল পিইটি (PET) প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করা—বিশেষ করে থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মতো অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং পদ্ধতিতে বারবার রিসাইকেল করলে উপকরণের ভেতরের গঠন কতটা বদলায়। সাধারণভাবে আমরা ভাবি, একবার রিসাইকেল করলেই প্লাস্টিক দুর্বল হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। বারবার গলানো ও নতুন করে আকার দেওয়ার সময় প্লাস্টিকের অণুগুলোর দৈর্ঘ্য ও বিন্যাসে পরিবর্তন আসে; ফলে শক্তি, নমনীয়তা, তাপ সহ্য করার ক্ষমতা—সবই ধীরে ধীরে বদলায়। এই পরিবর্তনগুলোকে পরিমাপ করে “কোন পর্যায়ে রিসাইকেল করলে কোন কাজে উপকরণটি উপযুক্ত থাকবে”—এমন নির্দেশিকা তৈরিই তাঁর গবেষণার লক্ষ্য। এতে শিল্পকারখানা জানতে পারে—কোন পণ্যে কতবার রিসাইকেল করা প্লাস্টিক ব্যবহার করলে নিরাপদ ও কার্যকর হবে।
কোভিড সময়ে গবেষণার সামাজিক দায়িত্ব
গবেষণাগারের কাজ যে কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ নয়—কোভিড-১৯ মহামারির সময় ড. সাগরের কাজ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট দেখা দিলে গবেষকরা ভাবেন—ঘরোয়া উপায়ে নির্দিষ্ট তাপে গরম করে জীবাণুমুক্ত করলে কি সীমিত সময়ের জন্য সেগুলো পুনর্ব্যবহার করা যায়? এই প্রক্রিয়ায় বড় প্রশ্ন ছিল—উচ্চ তাপে মাস্কের তন্তু ও ফিল্টার স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না। উপাদান বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব ছিল—যান্ত্রিক শক্তি, বাতাস ছাঁকন ক্ষমতা ও তরল প্রতিরোধের মতো বৈশিষ্ট্যগুলো পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা যে জীবাণুমুক্ত করার পরও সুরক্ষা মান বজায় আছে। এই অভিজ্ঞতা ড. সাগরকে মনে করিয়ে দেয়—জরুরি সময়ে বিজ্ঞানীর ভূমিকা কেবল নতুন জ্ঞান সৃষ্টি নয়, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: কেন মেটেরিয়ালস সায়েন্সে আগ্রহ কম
বাংলাদেশে উপাদান বিজ্ঞান তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত একটি ক্ষেত্র। ড. সাগরের পর্যবেক্ষণ—দেশে এই বিষয়ের স্বতন্ত্র বিভাগ ও শিল্পভিত্তিক গবেষণার সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বেছে নিতে দ্বিধায় পড়ে। অথচ বাস্তবে শিল্পের প্রতিটি স্তরে—প্যাকেজিং, নির্মাণ, পোশাক, ইলেকট্রনিক্স—সঠিক উপকরণ নির্বাচনই পণ্যের মান ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে। যেমন, বিমান বা গাড়িতে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয়ের একেক গ্রেডের একেক রকম বৈশিষ্ট্য; ভুল উপকরণ বেছে নিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহও বাড়বে, কারণ তারা বাস্তব প্রয়োগ দেখতে পাবে।
বহুমুখী পড়াশোনা: গভীরতা ও পরিধির ভারসাম্য
ড. সাগরের শিক্ষাজীবন শুরু অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে; পরে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিবেশে মেটেরিয়ালস সায়েন্সে বিশেষায়িত হন। তাঁর মতে, একদিকে কোনো বিষয়ে গভীরতা দরকার—তাতে দক্ষতা তৈরি হয়; অন্যদিকে বিভিন্ন বিষয়ের সংযোগস্থলে কাজ করার ক্ষমতা দরকার—তাতে নতুন ধরনের গবেষণা সম্ভব হয়। আজকের দিনে কেমিস্ট্রি ও পরিবেশবিজ্ঞান, কম্পিউটার সায়েন্স ও বায়োলজি—এমন সংযোগস্থলেই নতুন প্রযুক্তির জন্ম হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর বার্তা—শুধু একটি বিষয় মুখস্থ না করে পার্শ্ববর্তী জ্ঞানক্ষেত্রের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করো।
গবেষণা সংস্কৃতির পার্থক্য: স্বাধীনতা শেখার গল্প
বাংলাদেশ ও কোরিয়ায় গবেষণার সময় ড. সাগর দেখেছেন—অনেক সিদ্ধান্ত সুপারভাইজারকেন্দ্রিক। কিন্তু নিউজিল্যান্ডে এসে তিনি এমন এক গবেষণা সংস্কৃতির মুখোমুখি হন, যেখানে গবেষক-ছাত্রকেই প্রশ্ন নির্ধারণ, পদ্ধতি বাছাই ও কাজের কাঠামো দাঁড় করাতে হয়। শুরুতে এই স্বাধীনতা তাঁকে দ্বিধায় ফেলেছিল। ধীরে ধীরে তিনি বুঝেছেন—নিজের প্রশ্ন নিজে দাঁড় করাতে পারাই একজন পূর্ণাঙ্গ গবেষকের পরিচয়। এই রূপান্তর তাঁর পেশাগত আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
অনুপ্রেরণার উৎস: পরিবার, শিক্ষক ও একটি ডাক
ড. সাগরের অনুপ্রেরণার গল্প খুবই মানবিক। শিক্ষাজীবনের এক পর্যায়ে মা তাঁকে গবেষণার পথে এগোতে উৎসাহ দেন। শিক্ষকেরা পথ দেখান। আর ঢাকায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এক সিনিয়র গবেষকের মুখে “জুনিয়র সায়েন্টিস্ট” ডাক শুনে তাঁর মনে গেঁথে যায়—এই পরিচয়টিই হয়তো তাঁর ভবিষ্যৎ। কখনো কখনো একটি শব্দই মানুষের ভেতরের আত্মপরিচয়কে জাগিয়ে তোলে।
বর্তমান কাজ: কম্পোস্টযোগ্য ও খাদ্য-নিরাপদ নতুন পলিমার
বর্তমানে শিল্পভিত্তিক গবেষণায় ড. সাগরের লক্ষ্য—এমন পলিমার তৈরি করা, যা ঘরে কম্পোস্ট করা যায়, খাদ্যের সংস্পর্শে নিরাপদ, আবার প্রয়োজনে ল্যাটেক্সের মতো নমনীয়। খাদ্য প্যাকেজিং ও চিকিৎসা সরঞ্জামে পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরিতে এই ধরনের উপকরণ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ল্যাবের পরীক্ষার পাশাপাশি পাইলট-স্কেল উৎপাদনের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে তাঁর কাজ গবেষণাকে বাস্তব শিল্পে রূপ দেওয়ার এক অনুশীলন।
তরুণদের জন্য বার্তা: কঠিনতাই শেখায় ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের তরুণদের উদ্দেশে তাঁর সবচেয়ে সরল কিন্তু শক্তিশালী বার্তা—কাজ মানেই কঠিন। কঠিন বলে ভয় পেলে শেখা হয় না। ধারাবাহিকতা থাকলে গবেষণার পথ নিজেই তৈরি হয়। কেবল চাকরির সুযোগ দেখে বিষয় বেছে নেওয়ার বদলে সমাজ ও পরিবেশের প্রয়োজনকে সামনে রেখে বিজ্ঞানকে মূল্য দিলে ভবিষ্যতে দেশও উপকৃত হবে।
ড. মোহাম্মদ সাগর হোসেনের যাত্রা তাই কেবল একজন গবেষকের সাফল্যগাথা নয়—এটি একটি দৃষ্টান্ত। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের স্বপ্ন যেমন তাঁর গবেষণায় আছে, তেমনি আছে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নীরব আহ্বান—নিজের ভেতরের “জুনিয়র সায়েন্টিস্ট”-কে জাগিয়ে তুলতে। এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বৈশ্বিক গবেষণার মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করার পথটি শুরু হয় ব্যক্তিগত কৌতূহল ও দায়িত্বশীলতার ছোট ছোট পদক্ষেপ থেকে।
সাক্ষাৎকারটি বিজ্ঞানী অর্গের আয়োজনে ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ এ অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থাপক ছিলেন তাহসিন আহমেদ সুপ্তি এবং হাসনা বানু মুমু।
নবীন প্রজন্মের কাছে বিজ্ঞানীদের জীবনের গল্পগুলি তুলে ধরার এই “সাক্ষাৎকার প্রোজেক্ট” – এ সময় দেবার জন্য বিজ্ঞানী অর্গ এর পক্ষ থেকে ড. মোহাম্মদ সাগর কে ধন্যবাদ জানাই।

Leave a comment