গবেষণায় হাতে খড়ি

একটি গবেষককে কেন স্ট্যাটিসটিক্স জানতেই হবে

Share
Share

রাত দুইটা। একটি একরাশ ডেটা ল্যাপটপের স্ক্রিনে ঝলমল করছে। পরীক্ষার গ্রাফ ঠিকঠাক, চার্টগুলো সুন্দর, লেখাও পরিপাটি। তবুও তরুণ গবেষকটির বুকের ভেতর কেমন এক শূন্যতা। কারণ একটি প্রশ্ন সে উত্তর দিতে পারছে না, এই গবেষণা সত্যি প্রমাণ, নাকি কেবল সাজানো এক গল্প? ঠিক তখন চোখে পড়ে একটি ভীতিকর সংখ্যা, p-value ০.২৩। সে বুঝে যায়, তার শ্রম মূল্যহীন নয়, কিন্তু প্রমাণ হয়ে ওঠেনি। এই দৃশ্য শুধু একজনের নয়, এটি বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী ও নবীন গবেষকের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

আমরা দেশে গবেষণা করি, কিন্তু প্রমাণ তৈরি করি কম। আমাদের পেপার হয়, কিন্তু কনফিডেন্স ইন্টারভ্যাল কম থাকে। আমরা ফলাফল লিখি, কিন্তু বিশ্লেষণ ভাসা ভাসা। এর একটাই কারণ, আমরা স্ট্যাটিসটিক্সকে এখনও গবেষণার ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে শিখিনি। অথচ বিশ্বে গবেষণা আর গল্প নয়, এটি পরিসংখ্যানের আদালত, যেখানে অনুমান নয়, চলে প্রমাণ।

Nature Index-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার ৯২ শতাংশে অন্তত একটি স্ট্যাটিসটিক্যাল মডেল ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। IEEE, Springer ও Elsevier-এর ডেটাবেস ঘেঁটে দেখা যায়, “Statistical modeling” ও “Data-driven research” শব্দযুক্ত গবেষণাপত্র গত এক দশকে ৩ দশমিক ৫ গুণ বেড়েছে। বিজ্ঞান এখন আর “মনে হয়”-এর ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে probability distribution, regression model আর inferential statistics-এর ওপর।

এর বিপরীতে বাংলাদেশের বাস্তবতা একটু অস্বস্তিকর। প্রতি বছর স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী মাস্টার্স ও পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে বাংলাদেশের অবদান মোট বৈশ্বিক গবেষণার মাত্র শূন্য দশমিক চার শতাংশ। গবেষকসংখ্যা যত, প্রভাব তত কম। কারণ—স্ট্যাটিসটিক্সে দুর্বলতা। গবেষণা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নয়, প্রশ্নের ঘাটতি নয়, মূল ঘাটতিটা বিশ্লেষণের ভিতরে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এশিয়ার দ্রুততম ডেটা উৎপাদক দেশগুলোর একটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রতি বছর পাঁচ শতাধিক ডেটাসেট প্রকাশ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক মাসে শতাধিক অর্থনৈতিক সূচক ছাপে। ICDDR,B বছরে তৈরি করে এক কোটিরও বেশি স্বাস্থ্য রেকর্ড। BRAC গবেষণা করে শিক্ষা, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু সংক্রান্ত নানা বিষয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত তথ্য কে বোঝে? কে বিশ্লেষণ করে? কে ব্যাখ্যা করে? উত্তর কঠিন, আমরা খুব কম জন।

আধুনিক বিশ্বে ডেটা মানে শক্তি। Statista-এর রিপোর্ট বলছে, প্রতিদিন বিশ্বে তৈরি হচ্ছে ৩২৮ মিলিয়ন টেরাবাইট ডেটা। শুধু ডেটা বিশ্লেষণ খাতে বিশ্ব অর্থনীতি বছরে ব্যয় করছে প্রায় ২৭৪ বিলিয়ন ডলার। LinkedIn-এর চাকরির পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০২৪ সালে শীর্ষ ১০টি স্কিলের মধ্যে অন্তত ৭টিই ছিল ডেটা অ্যানালিটিক্স ও স্ট্যাটিসটিক্স-সম্পর্কিত। পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান মেশিন এখন ল্যাব যন্ত্র নয়, এটি পরিসংখ্যানভিত্তিক অ্যালগরিদম।

অথচ আমরা এখনও স্ট্যাটিসটিক্স শুনলে ভয় পাই। ভাবি—এটা অংক, কঠিন, শুষ্ক। আমরা ভুলে যাই, স্ট্যাটিসটিক্স আসলে চিন্তার বিজ্ঞান। এটি শেখায় সন্দেহ করতে, যাচাই করতে, প্রশ্ন করতে। OECD-এর এক শিক্ষা সমীক্ষা বলছে, যারা স্ট্যাটিসটিক্স বা ডেটা বিশ্লেষণ শেখে, তাদের critical thinking ক্ষমতা গড়ে ৪৫ শতাংশ বেশি উন্নত হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা জানিয়েছে, পরিসংখ্যান প্রশিক্ষণ পাওয়া শিক্ষার্থীরা গবেষণায় যুক্তি প্রয়োগে ৬০ শতাংশ বেশি দক্ষ এবং ভুল তথ্য শনাক্তে ৪২ শতাংশ বেশি সক্ষম।

এই পরিসংখ্যান কেবল নম্বর নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কথা ভাবুন। একজন নার্স হয়েও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুহার কমিয়েছিলেন ৪০ শতাংশ, নিছক তথ্য বিশ্লেষণ করে। রোনাল্ড ফিশারের তৈরি স্ট্যাটিসটিক্স পদ্ধতি আজ বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন তিনগুণ বাড়িয়েছে। অ্যালান টিউরিং পরিসংখ্যান ছাড়া যুদ্ধ জিততেন না। তিনি সংখ্যাই ব্যবহার করেছিলেন অস্ত্র হিসেবে।

বাংলাদেশে আজ অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা ২ দশমিক ৮ কোটি। ডেঙ্গুতে ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছে ১,৭০০ জনেরও বেশি মানুষের। প্রতিবছর বন্যায় ক্ষতি হয় প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার। এগুলো কি কেবল সংখ্যা? না। এগুলো মানুষের কান্না। কিন্তু এই কান্নার শব্দ কে অনুবাদ করবে সিদ্ধান্তে? কে বলবে কোন এলাকায় হাসপাতাল দরকার? কারা বলবে কোন নদী বিপজ্জনক? এই উত্তর দেবে স্ট্যাটিসটিক্স।

গবেষক মানে আর কেবল বইয়ে ডুবে থাকা মানুষ নয়। আধুনিক গবেষক হলো বিশ্লেষক, যাচাইকারী, বাস্তবতার আয়না। যে ব্যক্তি কেবল তথ্য সংগ্রহ করে না, সে তথ্য ব্যাখ্যা করে। যে বিশ্বাস করে না, যাচাই করে।

আপনি কি শুধু ডিগ্রি চান, নাকি প্রমাণ তৈরি করতে চান?

আপনি কি অনুমান করেন, নাকি যাচাই করেন?

আপনি কি সংখ্যা দেখেন, নাকি বোঝেন?

আজ যদি আপনি স্ট্যাটিসটিক্স শিখতে শুরু করেন, আপনি কেবল ভালো ছাত্র হবেন না, আপনি হয়ে উঠবেন সমাজের বিবেক। আপনি জানবেন কীভাবে একটি দেশের স্বাস্থ্য নীতি বদলাতে হয়। কীভাবে একটি বন্যার আগাম সতর্কতা দিতে হয়। কীভাবে দারিদ্র্যের প্রকৃত মানচিত্র আঁকতে হয়। এই দেশ তত্ত্ববাদী আর চায় না। এই দেশ ডেটাভিত্তিক চিন্তাবিদ চায়। আজই সিদ্ধান্ত নিন। স্ট্যাটিসটিক্সকে ভয় নয়, বন্ধু বানান। কারণ ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী শুধু প্রশ্ন করে না, সে প্রমাণ গড়ে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org