বিজ্ঞান জগতের ইতিহাসে এমন কিছু যন্ত্র রয়েছে, যেগুলো নিছক একটি প্রযুক্তি নয়—এগুলো মানুষের জ্ঞানের পরিধি প্রসারিত করার একেকটি দরজা। Spectroscopy বা বাংলায় বর্ণালীবীক্ষণ ঠিক তেমনই একটি উপকরণ। নাম শুনে প্রথমেই মনে হতে পারে, এটি হয়তো কেবল রঙ দেখা বা আলোর সাথে কাজ করা কোনো যন্ত্র। কিন্তু এর প্রকৃত ক্ষমতা অনেক গভীর—এটি আলো ও পদার্থের অন্তঃস্থ সম্পর্ক উন্মোচন করে, যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি কোনো বস্তু বা গ্যাসে কী কী উপাদান রয়েছে, অণু বা পরমাণুর গঠন কেমন, এমনকি তারা কতদূরে বা কত গরম।
বিজ্ঞানীরা একে প্রায়ই বলেন—পদার্থের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পড়ার যন্ত্র। কারণ, যেমন মানুষের আঙুলের ছাপ প্রতিটি মানুষের জন্য অনন্য, তেমনি প্রতিটি উপাদান বা যৌগ যখন আলো শোষণ বা নির্গমন করে, তখন একটি নির্দিষ্ট বর্ণালীর প্যাটার্ন তৈরি করে। এই প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করাই বর্ণালীবীক্ষণের কাজ।
উদ্ভাবন ও ইতিহাস
বর্ণালীবীক্ষণের যাত্রা শুরু হয় উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে, যখন বিজ্ঞানীরা সূর্যালোককে একটি কাঁচের প্রিজম দিয়ে বিভক্ত করে রঙধনুর মতো সাত রঙে দেখতে পান। 1802 সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী William Hyde Wollaston প্রথম সূর্যালোকের বর্ণালীতে কিছু কালো রেখা লক্ষ্য করেন। কিন্তু 1814 সালে জার্মান বিজ্ঞানী Joseph von Fraunhofer এ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা শুরু করেন এবং শত শত কালো রেখার অবস্থান নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করেন। এই রেখাগুলো আজও Fraunhofer lines নামে পরিচিত।
পরে, 1859 সালে Gustav Kirchhoff ও Robert Bunsen যৌথভাবে দেখান যে এই রেখাগুলো আসলে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে থাকা উপাদানগুলোর কারণে তৈরি হয়। এভাবেই জন্ম নেয় আধুনিক বর্ণালীবীক্ষণ—যা কেবল পদার্থবিদ্যার নয়, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়।
বৈজ্ঞানিক নীতি: কীভাবে কাজ করে বর্ণালীবীক্ষণ
বর্ণালীবীক্ষণের মূলনীতি সহজ, কিন্তু এর কার্যকারিতা গভীর। যখন আলো কোনো পদার্থের মধ্য দিয়ে যায় বা কোনো উত্তপ্ত বস্তু থেকে নির্গত হয়, তখন সেই আলো একেকটি তরঙ্গদৈর্ঘ্যে (বা রঙে) বিভক্ত হয়। বিভিন্ন উপাদান ও অণুর ইলেকট্রন নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে অবস্থান করে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি শোষণ বা নির্গমন করে।
এই শক্তি ঠিক একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর সাথে মিলে যায়। ফলে, যদি আলোকে প্রিজম বা ডিফ্র্যাকশন গ্রেটিং দিয়ে ভেঙে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে—কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুপস্থিত (শোষণ বর্ণালী) বা কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিরিক্ত উজ্জ্বল (নির্গমন বর্ণালী)। এগুলোর ধরন ও অবস্থান বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা পদার্থের রাসায়নিক গঠন, তাপমাত্রা, চাপ, এমনকি গতি পর্যন্ত নির্ণয় করতে পারেন।
কী কী ধরনের পরীক্ষা করা যায়
বর্ণালীবীক্ষণ আজ প্রায় প্রতিটি বৈজ্ঞানিক শাখায় ব্যবহৃত হয়।
পদার্থবিদ্যায়—গ্যাসের বর্ণালী দেখে তার গঠন ও তাপমাত্রা জানা যায়। উদাহরণস্বরূপ, হাইড্রোজেনের বালমার সিরিজ বিশ্লেষণ করে তার ইলেকট্রনিক গঠন নির্ধারণ করা হয়।
রসায়নে—বিভিন্ন উপাদানের বর্ণালী দেখে অপরিচিত পদার্থের রাসায়নিক গঠন জানা যায়। যেমন, ফরেনসিক পরীক্ষায় কোনো নমুনায় বিষাক্ত ধাতু যেমন সীসা বা আর্সেনিক আছে কি না, তা শনাক্ত করা যায়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে—দূরবর্তী নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির আলো বিশ্লেষণ করে জানা যায় সেখানে কী কী উপাদান আছে, তারা কত গতিতে চলছে, এমনকি মহাবিশ্বের প্রসারণের হারও (Hubble’s law) নির্ণয় করা যায়। বিখ্যাত হাবল টেলিস্কোপের প্রধান গবেষণা পদ্ধতিগুলোর একটি হলো বর্ণালীবীক্ষণ।
জীববিজ্ঞানে—বিভিন্ন জৈব অণুর আলোক শোষণ বর্ণালী বিশ্লেষণ করে প্রোটিন বা ডিএনএ-এর ঘনত্ব, গঠন বা পরিবর্তন নির্ধারণ করা হয়।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে—উপাদানের বিশুদ্ধতা ও গঠন নির্ধারণের জন্য ফটো-লুমিনেসেন্স স্পেক্ট্রোস্কপি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
সহজ ব্যবহার ও গুরুত্ব
প্রথম দিকের বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র ছিল বড়, জটিল এবং ব্যয়বহুল। কিন্তু আজকের দিনে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এমন ছোট ও সাশ্রয়ী যন্ত্র তৈরি হয়েছে যা একটি ল্যাপটপ বা এমনকি স্মার্টফোনের সাথেও সংযুক্ত করে চালানো যায়।
শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক ওপেন-সোর্স বা কম খরচের DIY (Do-It-Yourself) স্পেক্ট্রোমিটার পাওয়া যায়, যেগুলো দিয়ে মৌলিক পরীক্ষা করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, একটি সিডি ডিস্ক, কিছু কার্ডবোর্ড ও ওয়েবক্যাম দিয়েও একটি সাধারণ স্পেক্ট্রোমিটার বানানো যায়—যেটি স্কুল পর্যায়ে বর্ণালী দেখা শেখার জন্য যথেষ্ট।
গুরুত্বের দিক থেকে, বর্ণালীবীক্ষণ হলো একধরনের সার্বজনীন ভাষা—যা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পদার্থ ও আলোর মৌলিক সম্পর্ক অনুবাদ করতে পারেন। এটি গবেষণায় নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে দেয় এবং শিল্প-কারখানায় মান নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
বিখ্যাত আবিষ্কার
বর্ণালীবীক্ষণ ব্যবহার করে অনেক যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, 1868 সালে সূর্যের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানী Pierre Janssen ও Norman Lockyer হিলিয়াম নামের একটি নতুন মৌল আবিষ্কার করেন—যেটি পৃথিবীতে আগে কখনও পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, Edwin Hubble দূরবর্তী গ্যালাক্সির বর্ণালীতে রেডশিফট মেপে প্রমাণ করেন যে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। এই আবিষ্কার আজকের কসমোলজির ভিত্তি।
বাংলাদেশি গবেষকদের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
বাংলাদেশে বড় মাপের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স বা পার্টিকেল ফিজিক্স ল্যাব না থাকলেও, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার অনেক ল্যাবেই বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহৃত হয়—বিশেষ করে UV-Vis, IR ও রমন স্পেক্ট্রোস্কপি।
যদি সরাসরি যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকে, তবুও অনলাইনে অসংখ্য সিমুলেটর ও ভার্চুয়াল ল্যাব রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার অনুশীলন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, PhET Interactive Simulations (University of Colorado) বিনামূল্যে ইন্টার্যাকটিভ স্পেক্ট্রোস্কপি সিমুলেশন দেয়।
তাছাড়া, আন্তর্জাতিক গবেষণাগারের সাথে যৌথভাবে কাজ করলে বর্ণালীবীক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত ডেটা বাংলাদেশের গবেষকরাও বিশ্লেষণ করতে পারেন—শুধু যন্ত্র নয়, ডেটা প্রসেসিং দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার: তরুণ গবেষকদের জন্য আহ্বান
বর্ণালীবীক্ষণ কেবল একটি যন্ত্র নয়—এটি এক ধরনের দৃষ্টি, যা আমাদের অদৃশ্য জগৎকে দৃশ্যমান করে। আকাশের দূরতম নক্ষত্র থেকে শুরু করে পরীক্ষাগারের ক্ষুদ্রতম অণু পর্যন্ত—সবকিছুই এর আওতায়। বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীরা যদি এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারেন, তাহলে তারা শুধু নিজস্ব গবেষণার মানই বাড়াতে পারবেন না, বরং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক অঙ্গনেও নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারবেন।
তাই আজই খুঁজে দেখুন—আপনার বিশ্ববিদ্যালয় বা ল্যাবে কোনো স্পেক্ট্রোমিটার আছে কি না, না থাকলে অনলাইনে সিমুলেটর ব্যবহার শুরু করুন। জ্ঞানের দরজা খুলে দেওয়ার এই চাবি আপনার হাতেই রয়েছে—এখন শুধু দরজাটা খোলার পালা।

Leave a comment