বিজ্ঞান সবসময়ই প্রশ্ন করার ওপর নির্ভর করে। এটি শুধু জানার চেষ্টা নয়, বরং বুঝে ওঠারও একটি প্রচেষ্টা। যখন আমরা পৃথিবীর জটিলতাগুলোর দিকে তাকাই, তখন সে সবের পিছনে গোপন কোনো নিয়ম, কারণ কিংবা বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে আমরা জানতে চাই। সৃষ্টির মূল রহস্য উদঘাটনে আমরা কীভাবে এগিয়ে যাই, কিংবা কিভাবে একে অপরের থেকে আমাদের জ্ঞানকে আলাদা করি—এটাই হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মূল ভিত্তি। স্টিভেন গিম্বল তাঁর ‘Introduction to the Scientific Method’ বইতে এই পদ্ধতির প্রতিটি স্তরের একটি মৌলিক দর্শন তুলে ধরেছেন, যা বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার ভিত্তি গড়ে তোলে। এই প্রবন্ধে, আমি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সেই দর্শনটি খুলে দেখব এবং এর প্রতিটি ধাপের গুরুত্ব বোঝাবো।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি শুধু কোনো প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি মননশীলতায় রূপান্তরিত হওয়া। এটি আমাদেরকে কোনো ঘটনার ঘটনার কারণ জানার জন্য অনুধাবন করা, প্রমাণ অনুসন্ধান করা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে আমাদের বিশ্বকে জানতে সহায়তা করে। স্টিভেন গিম্বল এখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার নীতির মাধ্যমে বিজ্ঞানী হওয়ার প্রাথমিক পাথেয় স্থাপন করেছেন। কীভাবে একটি তত্ত্বের ভিত্তিতে আমরা একটি পরীক্ষা চালিয়ে যাচাই করতে পারি, কীভাবে ওই পরীক্ষার ফলাফলকে আমাদের ধারনাগুলির সাথে মিলিয়ে দেখতে পারি—এই সবই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্তর্গত।
বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য এক পাথেয় হলো প্রশ্ন করা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রথম ধাপ হলো প্রশ্ন তোলা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ্য স্থির করা। তবে এখানে একটা জটিল বিষয় রয়েছে—প্রশ্ন শুধুমাত্র প্রতিদিনের জীবনের সাধারণ প্রশ্ন নয়। এটি এমন কিছু যা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করা উচিত, যেখানে একে অন্যান্য প্রেক্ষিত এবং তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত করে দেখা যায়। এই গভীরতাই বিজ্ঞানীকে সৃষ্টি এবং আবিষ্কারের পথে নিয়ে যায়। যেমন, গিম্বল তার বইয়ে বলেন, ‘‘জিজ্ঞাসা করা যতটা সহজ, উত্তর খোঁজা ততটাই কঠিন’’—এবং এটাই বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার মূল চ্যালেঞ্জ।
এরপর আসে পরিসংখ্যান, অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে একটি তত্ত্ব গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পরীক্ষার মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা। যে তত্ত্ব বা ধারণা বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রথমে সামনে আসে, তা একমাত্র সঠিক হতে পারে না। প্রতিটি তত্ত্বের মাপকাঠি হয় পরীক্ষায়, যেখানে বাস্তবিকভাবে ফলাফল প্রমাণিত হয়। প্রতিটি পরীক্ষা বা অনুসন্ধান একটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে এবং এর ফলস্বরূপ ঐতিহাসিক বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেয়, যা ভবিষ্যতে অন্য বিজ্ঞানীদের জন্য দিশা দেখায়।
এছাড়া, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলোতে যে একাগ্রতা ও ধৈর্যের প্রয়োজন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তত্ত্ব বা গবেষণা সফল হবে কিনা, তা পুরোপুরি নির্ভর করে ফলাফলের ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখতে এবং একে খোলামেলা রাখতে হবে। কোনো বিজ্ঞানী যখন একটি নতুন ধারণা বা আবিষ্কার নিয়ে কাজ করেন, তখন তার জন্য প্রাথমিকভাবে যে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস থাকে, তা ধীরে ধীরে বিভিন্ন পরীক্ষা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ভুলতা প্রমাণিত হতে থাকে। এই একই ভাবে, গিম্বল তাঁর বইয়ে জানিয়েছেন যে বিজ্ঞানীরা যেভাবে নিজেদের বিশ্বাসের পরীক্ষা করেন, তা সঠিক প্রমাণের সন্ধান করে।
পরিশেষে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেটি আমাদেরকে শিক্ষা দেয় তা হলো তত্ত্বের অমীমাংসিততার মধ্যে একজন বিজ্ঞানীর আত্মবিশ্বাসের বিষয়। এমন কিছু ধারণা থাকতে পারে যা আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতে তা পর্যালোচনা এবং পরীক্ষার মাধ্যমে পুরানো হয়ে যেতে পারে। গিম্বল তাঁর বইয়ে এই সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘বিজ্ঞান কখনও স্থিতিশীল থাকে না’’—এটি নিজে থেকেই পরিবর্তিত হতে থাকে, যখন নতুন আবিষ্কার বা ফলাফল একে চ্যালেঞ্জ করে।
বিজ্ঞান একটি চলমান অভিযাত্রা, যেখানে জ্ঞান কেবল আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে চলে। কোনো তত্ত্ব বা পরীক্ষা যখন নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, তখন সেটি নতুন দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করে, যার দ্বারা ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনা জন্ম নেয়। এই ধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক বিশ্বে নিজেদের চিন্তাধারা এবং জীবনযাত্রার প্রতিফলন ঘটান, যা মানবজাতির কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি নয়, এটি একটি উন্মুক্ত মনোভাবের প্রতীক, যেখানে সংশয়, স্বীকৃতি, পরিবর্তন এবং আধুনিকতার প্রতি আকাঙ্ক্ষা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একে মেনে চললে আমরা শুধুমাত্র নতুন তথ্য সংগ্রহ করতে পারি না, বরং একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে আমাদের চারপাশের বিশ্বকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি।

Leave a comment