উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগসাধারণ বিজ্ঞান

“বিজ্ঞান মানে বড় বড় যন্ত্র নয়—ভাবনার স্বাধীনতা” — ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদ

Share
Share

অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকের কাছে বিজ্ঞানচর্চা মানেই বিশাল ল্যাবরেটরি, দামী যন্ত্রপাতি আর উন্নত দেশের গবেষণাগারের ছবি। ফলে নিজেদের চারপাশের বাস্তবতা দেখে তারা ভাবতে শুরু করে—এত সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আদৌ কি গবেষণা করা সম্ভব? ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের কথায়, “বিজ্ঞান মানে বড় বড় যন্ত্র নয়—ভাবনার স্বাধীনতা।” এই বক্তব্য বিজ্ঞানচর্চার একটি মৌলিক দিককে সামনে আনে।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাকালেই দেখা যায়, অনেক বড় আবিষ্কারের শুরু হয়েছে খুব সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে। নিউটনের আপেলের গল্প যেমন প্রতীকী উদাহরণ হয়ে আছে—একটি সাধারণ ঘটনা থেকে প্রশ্ন জাগে, কেন আপেল মাটিতে পড়ে? এর পেছনের নিয়ম কী? আধুনিক যুগে যদিও গবেষণা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, তবু মৌলিক ভাবনাটি একই—প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। ড. আশরাফউদ্দিনের গবেষণাজীবনের বড় অংশ কেটেছে অত্যন্ত উন্নত যন্ত্রপাতি থাকা গবেষণাগারে। কিন্তু তিনি বারবার উল্লেখ করেন, এসব যন্ত্র কেবল একটি মাধ্যম; গবেষণার চালিকাশক্তি হলো মানুষের চিন্তা ও কৌতূহল।

বাংলাদেশের মতো দেশে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, ভালো গবেষণা করতে হলে বিদেশে যেতে হবে, উন্নত ল্যাব পেতে হবে। এই ধারণা তরুণদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে। ড. আশরাফউদ্দিন মনে করেন, এই মানসিকতা বদলানো জরুরি। অবশ্যই উন্নত যন্ত্রপাতি গবেষণাকে সহজ করে, কিন্তু গবেষণার সূচনা হয় প্রশ্ন থেকে। সীমিত উপকরণের মধ্যেও পর্যবেক্ষণ, তুলনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষণার বীজ বপন করা সম্ভব।

ভাবনার স্বাধীনতা বলতে তিনি কেবল ব্যক্তিগত কৌতূহলকেই বোঝান না; এর সঙ্গে যুক্ত আছে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশও। একটি শিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যদি প্রশ্ন করা নিরুৎসাহিত হয়, ভিন্নমত প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়, তবে সেখানে প্রকৃত বিজ্ঞানচর্চা বিকশিত হয় না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কেও এই স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যদি ভয়ে প্রশ্ন না করে, যদি ভুল করলে লজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ড. আশরাফউদ্দিনের মতে, বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ হতে হবে এমন—যেখানে প্রশ্ন করা স্বাভাবিক, ভুল করা শেখার অংশ।

এই দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি দিক হলো—গবেষণার বিষয় নির্বাচন। অনেক সময় গবেষকেরা “ট্রেন্ডিং টপিক” বেছে নিতে গিয়ে নিজেদের আগ্রহ বা সমাজের বাস্তব প্রয়োজন উপেক্ষা করেন। ড. আশরাফউদ্দিন মনে করেন, ভাবনার স্বাধীনতা মানে নিজের কৌতূহলকে গুরুত্ব দেওয়া, একই সঙ্গে সমাজের প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেওয়া। গবেষণার বিষয় যদি গবেষকের নিজের কাছে অর্থবহ না হয়, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে সেই গবেষণায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

সবশেষে, এই বক্তব্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—বিজ্ঞানচর্চাকে কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল করে দেখলে আমরা অনেক সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করি। প্রকৃত বিজ্ঞানচর্চার শক্তি লুকিয়ে আছে মানুষের চিন্তায়, প্রশ্নে ও সৃজনশীলতায়। বড় যন্ত্রপাতি ছাড়া হয়তো অনেক পরীক্ষা করা যাবে না, কিন্তু বড় প্রশ্ন তোলার জন্য কোনো দামী যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের কথায়, এই ভাবনার স্বাধীনতাই বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org